ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের বন্দর আব্বাসসহ বিভিন্ন বন্দরনগরীতে হামলার পাশাপাশি ঐতিহাসিক কেশম, কিশ ও আবু মুসা দ্বীপে বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এই হামলার পর শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধের প্রথম দিককার একটি বড় প্রশ্ন আবার সামনে এসেছে। প্রশ্নটি হলো—ওয়াশিংটন কি ইরানের ভূখণ্ড দখল করার প্রস্তুতি নিচ্ছে?
এর আগে গত মার্চ মাসে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টকে দুই কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, ইরানের ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল রপ্তানির পথ খাগ দ্বীপ দখলে সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে পেন্টাগন। গত ১৭ জুন দুই পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলে সেই আলোচনা থিতিয়ে পড়েছিল।
তবে গত সোমবার ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বীপ দখলের সম্ভাবনা উড়িয়ে না দেওয়ায় বিষয়টি আবার আলোচনায় এসেছে। ট্রাম্প বলেন, ‘আমি আপনাকে এটি বলতে পারছি না। কারণ যদি বলি, তাহলে তা হবে একটি বোকামি।’
মার্কিন সামরিক সক্ষমতা ও দখলের বাস্তবতা
লন্ডনের কিংস কলেজের নিরাপত্তা বিষয়ের সহযোগী অধ্যাপক অ্যান্ড্রেয়াস ক্রিগ আল জাজিরাকে বলেন, সংকীর্ণ কৌশলগত দিক থেকে ইরানের দ্বীপগুলো দখল করার সামরিক সক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। পর্যাপ্ত বিমান ও নৌবাহিনীর সহায়তায় তারা যেকোনো ছোট দ্বীপ দখল করতে পারে।
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতির অধ্যাপক নাদের হাশেমীও একমত যে, একক বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার এই সক্ষমতা রয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, আসল প্রশ্ন হলো এর চড়া মূল্য নিয়ে।
ক্রিগ বলেন, কোনো দ্বীপ সাময়িকভাবে দখল করা আর তা ধরে রেখে কৌশলগত সুবিধা নেওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কেশম দ্বীপটি মূল ভূখণ্ডের একেবারে কাছে হওয়ায় এটি দখল করা খুবই কঠিন হবে। অন্যদিকে হেনগামের মতো ছোট দ্বীপগুলো সহজে দখল করা গেলেও তা ইরানের আর্টিলারি, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের নাগালের মধ্যেই থাকবে। ফলে এটি কোনো সীমিত অভিযান থাকবে না, বরং একটি বড় আকারের উভচর যুদ্ধে রূপ নেবে। দ্বীপ দখল করলেও ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়া থেকে আটকানো যাবে না।
ব্যয়বহুল অভিযান ও রাজনৈতিক ঝুঁকি
অধ্যাপক ক্রিগ হিসাব করে জানান, এই ধরনের একটি সীমিত অভিযানের জন্যও প্রাথমিক পর্যায়ে ৫ থেকে ১০ হাজার সেনা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, প্রকৌশলী, লজিস্টিকস ও মেডিকেল সহায়তার প্রয়োজন হবে। একের বেশি দ্বীপ হলে সেনার সংখ্যা দ্রুত বাড়াতে হবে। এই মার্কিন সেনারা ইরানের মূল ভূখণ্ডের সরাসরি আক্রমণের মুখে পড়বে এবং তাদের রসদ সরবরাহকারী যানগুলো ইরানের মাইনের ঝুঁকিতে থাকবে। ইরান সঙ্গে সঙ্গে দ্বীপ উদ্ধার না করে দীর্ঘমেয়াদি আক্রমণের মাধ্যমে মার্কিন অবস্থানকে রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর ও ব্যয়বহুল করে তুলতে পারে।
অধ্যাপক নাদের হাশেমি অত্যন্ত সংশয় প্রকাশ করে বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার নিজের ‘মাগা’ সমর্থকদের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়ার ভয়ে এমন কোনো দ্বীপ দখলে যাবেন না। কারণ এতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি ঘটবে এবং তা ইরাক যুদ্ধের মতো রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে।
তাত্ত্বিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের মূল ভূখণ্ডও দখল করতে পারে, যেমনটি তারা ভিয়েতনামে আধ মিলিয়ন সেনা পাঠিয়ে করেছিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা রাজনৈতিকভাবে অসম্ভব এবং তা সমগ্র মধ্যপ্রাচ্য ও আরব বিশ্বের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ককে ধ্বংস করে দেবে।
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের চ্যালেঞ্জ ও বাণিজ্যিক প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র কোনো দ্বীপ দখল করতে চাইলে প্রথমে ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করতে হবে। কিন্তু শুধু বিমান হামলা চালিয়ে তা সম্ভব নয়। ইরানের বেশিরভাগ রাডার, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঘাঁটিগুলো মোবাইল (স্থানান্তরযোগ্য) বা মাটির নিচে লুকানো। তাই হরমুজ প্রণালিতে ইরানের সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে ইরানের দক্ষিণ উপকূলের একটি বড় অংশ দখল করতে হবে, যা একটি পূর্ণাঙ্গ স্থলযুদ্ধের সূচনা করবে।
নাদের হাশেমি বলেন, এর জন্য যে তীব্র বোমাবর্ষণের প্রয়োজন, তা এখনও দেখা যাচ্ছে না। তাই ওয়াশিংটন এই পথে হাঁটছে না বলেই তিনি মনে করেন।
এরকম কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলে ইরান একে চরম উসকানি হিসেবে দেখবে। এর জবাবে তারা হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপন বাড়াবে এবং মার্কিন ঘাঁটি ও উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালাবে। ফলে দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ যার হাতেই থাক, জাহাজগুলো এই নৌপথ এড়িয়ে চলবে, বিমার প্রিমিয়াম বাড়বে এবং বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজ প্রণালি সচল দেখতে চাইলেও নিজেরা মার্কিন আক্রমণের ঘাঁটি বা ইরানের লক্ষ্যবস্তু হতে চাইবে না। ফলে এই অভিযান ওয়াশিংটনকে একটি দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে, যা তারা এড়াতে চায়।
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

