ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংক্ষিপ্ত মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ বা ‘ছোট অভিযান’ সমকালীন আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে মার্কিন সামরিক শক্তির কৌশলগত দুর্বলতাকে দ্রুত প্রকাশ করে দিয়েছে। ফলে এই যুদ্ধ ভিয়েতনাম যুদ্ধের চেয়েও বড় ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের মোড় হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
১৯৬৫ সালে ভিয়েতনাম যুদ্ধকে যৌক্তিকতা দিয়ে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিন্ডন বি জনসন বলেছিলেন, মার্কিন স্বাধীনতা রক্ষার স্বার্থেই অন্য দেশের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। ইতিহাস জুড়ে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাদের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বের জোরে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে পরবর্তীতে বিপর্যস্ত হয়েছেন। ধারণা করা হয়েছিল সমর্থকদের যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের কারণে ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এমনটি ঘটবে না। তবে চলমান শান্তি চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, ট্রাম্পের এই ইরান অভিযান সার্বজনীনভাবে একটি ‘পরাজয়’ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের তুলনায় স্কেলের দিক থেকে এই সংঘাত অনেক ছোট এবং এতে মাত্র ১৩টি মার্কিন লাশ দেশে ফিরেছে। তবে আন্তর্জাতিক ফলাফলের দিক থেকে এটি দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে। ১৯৭৫ সালে সাইগনের পতনের পর তৎকালীন মার্কিন নীতিনির্ধারকদের আশঙ্কাকৃত কমিউনিজমের ‘ডমিনো ইফেক্ট’ দেখা যায়নি। কিন্তু ট্রাম্পের এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ইসরাইলের কৌশলগত ব্যর্থতা
এই যুদ্ধ ইসরাইলের ২০ বছরের ‘শাসনব্যবস্থা পরিবর্তন’ কৌশলের পতন ডেকে এনেছে। ইসরাইলি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা ড্যানি সিট্রিনোভিচ একে ইসরাইলের জন্য একটি ‘অপারেশনাল সাফল্য কিন্তু কৌশলগত বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
উপসাগরীয় দেশগুলোর পুনর্মূল্যায়ন
মার্কিন ঘাঁটির উপস্থিতি আসলেই নিরাপত্তা আনে কি-না, তা নিয়ে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো তাদের ভূরাজনৈতিক সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান শাপিরো সৌদি আরব বা কাতারের মতো দেশগুলোর ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দাবিকে ‘অলীক’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
ড্রোনের ক্ষমতা ও সামরিক ব্যয়
আধুনিক যুদ্ধে সস্তা ড্রোন যে বড় সমতাবিধানকারী শক্তি, তা প্রমাণিত হয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ আকাশ থেকে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা বিজয় আনতে পারেনি, বরং মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ ও তহবিল খালি করেছে।
ইউরোপে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধাক্কা
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে জীবনযাত্রার মান ব্যাহত হওয়ায় ফ্রান্স, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের ক্ষমতাসীন মধ্যপন্থীরা নির্বাচনী ধাক্কার মুখে পড়তে পারে। পাশাপাশি ট্রাম্পের ন্যাটো থেকে সেনা প্রত্যাহারের হুমকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাঠামোকে দুর্বল করছে।
মার্কিন বিশ্ব ব্যবস্থার পতন
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস (সিএফআর)-এর রেবেকা লিসনার সতর্ক করেছেন, এই যুদ্ধ ইতোমধ্যে লাইফ সাপোর্টে থাকা মার্কিন নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক আঘাত হেনেছে। মিত্ররা এখন ওয়াশিংটনের বাইরে নতুন ক্ষমতার কেন্দ্রের দিকে ঝুঁকছে। সাবেক স্টেট ডিপার্টমেন্ট কর্মকর্তা মীরা র্যাপ-হুপার একে ‘সুপারপাওয়ার সুইসাইড’ বা পরাশক্তির আত্মহত্যা বলে অভিহিত করেছেন।
ইরানের অবস্থান ও হরমুজ প্রণালি
যুদ্ধ ইরানকে দুর্বল করলেও দলমত নির্বিশেষে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতাকে পুনরুজ্জীবিত করেছে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের আলী ভায়েজ বলেন, যুদ্ধ ইরানকে আদর্শিক পুনরুজ্জীবিতকরণ, বৈদেশিক সামরিক হস্তক্ষেপের অভ্যন্তরীণ অগ্রহণযোগ্যতা এবং তাদের প্রতিরোধ কৌশলের সংস্কার এই তিনটি উপহার দিয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ভৌগোলিক ও বিশ্বায়নের সুবিধাকে ইরান নিজের সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছে।
ভিয়েতনামের সঙ্গে সাদৃশ্য ও গোয়েন্দা ব্যর্থতা
সিএফআর-এর গিডন রোজের মতে, ট্রাম্প প্রথমে জনসনের মতো যুদ্ধে প্রবেশ ও তীব্রতা বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে নিক্সন-কিসিঞ্জারের মতো ‘ম্যাডম্যান থিওরি’ বা উন্মাদ তত্ত্বের মতো হুমকি দিয়ে একটি অসন্তোষজনক চুক্তির দিকে এগিয়েছেন। কিসিঞ্জার যেমন ভিয়েতনামকে চতুর্থ সারির শক্তি মনে করেছিলেন, ট্রাম্পও তেমনি ভেবেছিলেন কয়েক দিনের মধ্যে ইরানের পতন ঘটবে।
ট্রাম্প দাবি করেছিলেন ২০২৫ সালের জুনের সংক্ষিপ্ত যুদ্ধে তিনি ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেছেন। তবে সাবেক ইইউ আলোচক ফেডেরিকা মোগেরিনি এই দাবি নাকচ করে যুদ্ধটিকে শুরু থেকেই ‘অবৈধ ও বেপরোয়া’ বলে অভিহিত করেছেন।
এদিকে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা ইরান আক্রমণে ট্রাম্পকে প্ররোচিত করার জন্য বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছেন। একটি সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু জানান, যুদ্ধ চলার সাথে সাথে হরমুজ প্রণালির সমস্যাটি তারা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) প্রধান ফাতিহ বিরল একে একটি ‘ডুমসডে সিনারিও’ (কেয়ামতের মতো পরিস্থিতি) হিসেবে উল্লেখ করলেও পেন্টাগন ইরানের ‘ত্রিমুখী জবরদস্তিমূলক’ (যা উপসাগরীয় তেল ও গ্যাস সুবিধায় আঘাত হানে) কৌশল অনুমান করতে পারেনি।
বর্তমানে এই যুদ্ধের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৫০ বিলিয়ন ডলার। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার, মিশর এবং পাকিস্তানের জোট ট্রাম্পকে পুনরায় সংঘাতে জড়ানো থেকে বিরত করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে ইরানের সাথে এই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজস্ব সম্পর্কই এখন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


