কেইন ‘দ্য ওয়ান্ডার কিড’

কেইন ‘দ্য ওয়ান্ডার কিড’

বিশ্বকাপ ফাইনাল শেষ হয়েছে। গ্যালারির আলো তখনো নিভে যায়নি। লাল-হলুদের উৎসবে ডুবে আছে নিউইয়র্কের মেটলাইফ স্টেডিয়াম। কেউ ট্রফি নিয়ে ছবি তুলছে, কেউ পরিবারের মানুষদের জড়িয়ে ধরে কাঁদছে, কেউ আবার স্প্যানিশ সুর ছড়িয়ে দিচ্ছে মাঠজুড়ে। সেই হাজারো মুহূর্তের মাঝেও ক্যামেরার লেন্স ঘুরে যাচ্ছিল বছর তিনেকের এক শিশুর দিকে। ফাইনাল মহারণের কোনো অংশ না হয়েও সে হয়ে উঠল সবচেয়ে বড় চরিত্র। পুরো উদযাপনের প্রাণ হয়ে উঠেছিল ছোট্ট কেইন ইয়ামাল; বিশ্বজয়ী লামিনে ইয়ামাল যার বড় ভাই। সে এসেছিল বড় ভাইকে অভিনন্দন জানাতে। কিন্তু মাঠ ছাড়ল বিশ্বকাপজয়ী দলের সবচেয়ে আলোচিত ক্ষুদে তারকা হয়ে।

বিশ্বকাপ ফাইনালের নায়ক ছিলেন ফেরান তোরেস। গোল্ডেন বল জিতেছেন রদ্রি। ইতিহাস লিখেছেন লামিনে ইয়ামাল। কিন্তু স্টেডিয়ামের গ্যালারি ছেড়ে কোটি কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফিরতেই বারবার ঘুরে ফিরছিলেন কেইন ইয়ামাল। তার হাতে নেই বল, পায়ে নেই বুট, গলায় নেই কোনো পদক। তবু বিশ্বকাপজুড়ে যেন সে-ই ছিল স্পেনের সবচেয়ে নির্ভার, সবচেয়ে নির্মল মুখ। মাঠে ৯০ মিনিট ধরে যে উত্তেজনা, বাঁশি বাজতেই তার সবটুকু গলে যায় ছোট্ট এক শিশুর হাসিতে।

বিজ্ঞাপন

ফাইনাল শেষ হতেই লাল জার্সি গায়ে দৌড়ে মাঠে ঢুকে পড়ে কেইন। দুই হাত ছড়িয়ে ছুটে যায় বড় ভাই লামিনের দিকে। ইয়ামালও আর নিজেকে আটকে রাখতে পারেননি। ছোট ভাইকে কোলে তুলে এমনভাবে জড়িয়ে ধরেছিলেন, যেন বিশ্বকাপের ট্রফির চেয়েও মূল্যবান কিছু ফিরে পেয়েছেন তিনি। সেই ভিডিও মুহূর্তেই কোটি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কিন্তু এ তো কেবল শুরু।

একটু পরই দেখা গেল, গোলপোস্টের জালের একটি টুকরো শক্ত করে ধরে রেখেছে কেইন। যেন সেটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় স্মারক। এরপর কখনো পুলিশের সদস্যদের সঙ্গে খুনসুটি, কখনো ইয়ামালের সতীর্থদের সন্তানদের সঙ্গে ছোট্ট ফুটবল ম্যাচ, কখনো নিকো উইলিয়ামসকে গোলরক্ষক বানিয়ে গোল করার অভিনয়; মাঠের প্রতিটি কোণকে সে নিজের খেলাঘরে পরিণত করেছিল। আর যখন বিশ্বকাপ ট্রফির কাছে পৌঁছাল, তখন সবার চোখ কপালে। ছোট্ট জিহ্বা ছুঁইয়ে ট্রফিকে চুমু দিল, তারপর দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে ছবি তুলল, যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক ঘটনাই এটি। সেই ছবিই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে বিশ্বজুড়ে লাখোবার শেয়ার হয়।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও বুঝে গেল—এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ভাইরাল চরিত্র কোনো ফুটবলার নয়, তিন বছরের ছোট্ট কেইন। পিপল ম্যাগাজিন লিখল, বিশ্বকাপ ফাইনালের আবেগঘন মুহূর্তের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য ছিল কেইনের দৌড়ে এসে ভাইকে জড়িয়ে ধরা। টাউন অ্যান্ড কান্ট্রি তাকে তকমা দিয়ে দিল, ২০২৬ বিশ্বকাপের ভাইরাল সেনসেশন। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ক্যাডেনা সের আরো এক ধাপ এগিয়ে লিখেছে, স্পেন দলের আসল তারকা কেইন।

কিন্তু এই গল্প কেবল ভাইরাল হওয়ার নয়। বিশ্বকাপ চলাকালেই লামিনে ইয়ামাল এক সংবাদ সম্মেলনে ছোট ভাইকে নিয়ে এমন কিছু কথা বলেন, যা শুনে অনেকের চোখ ভিজে যায়। আর্দ্রতায় ভেসে স্প্যানিশ সেনসেশন বলেছিলেন, ‘আমার ছোট ভাই আমার কাছে সবকিছু। আমি ওকে এত ভালোবাসি, মনে হয় ও যেন আমার নিজের ছেলে। ওকে হাসতে দেখলেই আমার সব ক্লান্তি দূর হয়ে যায়।’

এই কথার পেছনেও আছে এক জীবনের গল্প। দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া ইয়ামাল একবার বলেছিলেন, তিনি এমন একটি ছোট্ট ফ্ল্যাটে বড় হয়েছেন, যেখানে রান্নাঘর আর শোবার ঘর প্রায় একই জায়গায় ছিল। তাই আজ যখন তিনি দেখেন, ছোট ভাই সেই কষ্টের শৈশব পায়নি, তখন সেটাই তার সবচেয়ে বড় আনন্দ।

হয়তো এ কারণেই কেইনের প্রতিটি হাসিতে নিজের অপূর্ণ শৈশব খুঁজে পান ইয়ামাল। বিশ্বকাপে গোল, ড্রিবল কিংবা ট্রফি মানুষ একদিন ভুলে যাবে। কিন্তু তিন বছরের একটি শিশুর সেই নির্ভেজাল উচ্ছ্বাস, বড় ভাইকে জড়িয়ে ধরার সেই মুহূর্ত, কিংবা ট্রফিকে খেলনার মতো বুকে জড়িয়ে রাখার ছবিগুলো ফুটবলের ফ্রেমে তো জীবন্ত। ফুটবলের ইতিহাসে অনেক ‘ওয়ান্ডার কিড’ এসেছে—পেলে, ম্যারাডোনা, মেসি, ইয়ামাল। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপ আরেকটি নতুন নামও উপহার দিয়েছে।

সে কোনো গোল করেনি। কোনো অ্যাসিস্টও নয়। তবুও মায়াবি হাসি আর উচ্ছ্বাসে ভেসে জিতে নিয়েছে কোটি মানুষের হৃদয়। স্পেনের শিরোপা জয়ের মঞ্চ ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’-এ ছোট্ট কেইনই হয়ে রইল ‘দ্য গ্রেটেস্ট ওয়ান্ডার কিড’।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন