ঔপনিবেশিক আমলে ওয়াক্ফ : প্রাথমিক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষাব্যবস্থা বজায় রাখার আগের পদ্ধতিটি প্রাথমিক ব্রিটিশ আমলেও অব্যাহত ছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আগের মতোই নিজস্ব এবং নিষ্কর ভূমি অনুদান (rent-free land-grants) ছিল। মুসলিম আমল থেকেই পাণ্ডুয়ার তিনটি মাদরাসার লা-খেরাজ (নিষ্কর) জমি ছিল এবং কোম্পানির শাসনামলে সেগুলো কেবল নামমাত্র টিকে ছিল। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার বোহর ও চাঙ্গারিয়া মাদরাসারও লা-খেরাজ জমি ছিল। পশ্চিমবঙ্গের বীরভূমের অনেক শিক্ষকের নিজস্ব লা-খেরাজ জমি ছিল। রাজশাহীর বাঘা মসজিদ ও মাদরাসার কথা আগেই বলা হয়েছে। উনিশ শতকে অ্যাডামের (Adam) পরিদর্শনের সময় এই এস্টেটের বেশিরভাগ সম্পত্তি প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকারীদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছিল। অ্যাডামের সময়ে চট্টগ্রামের একটি মাদরাসা এবং সিলেটের শাহ জালালের (র.) মাজারসংলগ্ন একটি মাদরাসার লা-খেরাজ জমি ছিল। সৈয়দ মুহাম্মদ তাইফুর লক্ষ করেছেন, বাংলার তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল ১৮৭৪ সালে ঢাকায় একটি আরবি-ফারসি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা ওবায়দুল্লাহ আল-ওবায়দি বাহরুল উলুম (১৮৩২-১৮৮৫) ছিলেন এর প্রথম সুপারিনটেনডেন্ট এবং তিনি আমৃত্যু সেখানে কর্মরত ছিলেন। সরকার এই প্রতিষ্ঠানের রক্ষণাবেক্ষণে উদারভাবে অবদান রেখেছিল এবং হাজী মুহাম্মদ মুহসীনের ওয়াক্ফ এস্টেট (endowment) থেকে এর ভবন নির্মাণের জন্য বেশ বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করেছিল। তৎকালীন লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার অ্যাশলে ইডেন ১৮৭৭ সালের ২৯ জুলাই এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯৫৬ সালের পর এই প্রতিষ্ঠানটি ‘গভর্নমেন্ট মুসলিম হাই স্কুল’ নামে পরিচিত হয়। উনিশ শতকের শেষের দিকে সৈয়দ বখত মজুমদার সিলেটের মজুমদারীতে ‘সৈয়দিয়া মাদরাসা’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর যাবতীয় ব্যয় মজুমদারি ওয়াক্ফ এস্টেট থেকে বহন করা হতো।
কোম্পানি শাসকেরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত লা-খেরাজ জমিগুলো বাজেয়াপ্ত করেছিলেন। অ্যাডাম (Adam) এই নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। ব্রিটিশরা এ দেশ দখল করার আগে বাংলার মোট জমির প্রায় এক-চতুর্থাংশ (চার ভাগের এক ভাগ) ছিল লা-খেরাজ বা ওয়াক্ফ সম্পত্তি। এই জমিগুলো থেকে প্রাপ্ত আয় শিক্ষা এবং অন্যান্য ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক কাজে উৎসর্গ করা হতো। সে সময় বিভিন্ন ধরনের নিষ্কর জমি প্রচলিত ছিল। মুসলমানরা মূলত মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করতেন এবং তাদের মালিকানা স্বত্বের বিষয়ে লিখিত দলিল বা রাজকীয় সনদপত্র সংরক্ষণে তেমন যত্নবান ছিলেন না। ব্রিটিশ সরকার এই নিষ্কর জমিগুলোর অনেকগুলোরই সত্যতা বা বৈধতা নিয়ে গভীর সন্দেহ পোষণ করত। ফলস্বরূপ ভারতের প্রথম ডি ফ্যাক্টো (কার্যত) গভর্নর-জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭৩ থেকে ১৭৮৫ সাল) এগুলোর বৈধতা যাচাইয়ের চেষ্টা করেন, কিন্তু তার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৭৬৪ থেকে ১৭৬৮ সালের মধ্যে চট্টগ্রামে কিছু লা-খেরাজ জমি বাজেয়াপ্ত (resumed) করা হয়েছিল, যদিও কিছু জমির বৈধতা বহাল রাখা হয়। এই প্রক্রিয়ায় সনদপত্র নিয়ে কিছু জালিয়াতিও ধরা পড়েছিল। ১৭৮৬ থেকে ১৭৯৩ সাল পর্যন্ত ভারতের গভর্নর-জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস আদেশ জারি করেন যে, সব নিষ্কর জমির দলিল এক বছরের মধ্যে কালেক্টরের কার্যালয়ে নিবন্ধিত (রেজিস্ট্রি) করতে হবে। কিন্তু গ্রামীণ এলাকায় বসবাসকারী বহু লা-খেরাজদার সরকারের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে সম্পূর্ণ অসচেতন ছিলেন এবং ফলস্বরূপ তারা এই নির্দেশ পালন করতে ব্যর্থ হন। এর ফলে ‘বহু প্রজন্ম ধরে বৈধ মালিকানা থাকা সত্ত্বেও তাদের জমিগুলো বাজেয়াপ্ত করা হয়েছিল।’ অনেক দলিলপত্র হারিয়ে গিয়েছিল, কোনোটি পোকায় খেয়েছিল আবার কোনোটি চুরি হয়ে গিয়েছিল।
১৭৯৩ থেকে ১৮১৮ সাল পর্যন্ত এই লা-খেরাজ জমিগুলোর বিষয়ে ধারাবাহিক বেশ কিছু আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। সেগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো—বেঙ্গল রেভিনিউ-ফ্রি ল্যান্ডস (নন-বাদশাহি গ্রান্টস) রেগুলেশন, ১৭৯৩; ১৭৯৩ সালের রেগুলেশন XIX (১৯) (সরকারকে রাজস্ব প্রদান থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত জমির ওপর অধিকার ভোগকারী বা দাবিদার ব্যক্তিদের স্বত্বের বৈধতা যাচাইয়ের জন্য ১৭৯০ সালের ১ ডিসেম্বর পাস হওয়া নিয়মাবলির পুনঃপ্রবর্তনমূলক একটি রেগুলেশন); এবং বেঙ্গল রেভিনিউ-ফ্রি ল্যান্ডস (বাদশাহি গ্রান্টস) রেগুলেশন, ১৭৯৩ সালের XXXVII (তামগা, জায়গির এবং সরকারি রাজস্ব প্রদান থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত অন্যান্য জমির ওপর অধিকার ভোগকারী বা দাবিদার ব্যক্তিদের স্বত্বের বৈধতা যাচাইয়ের একটি রেগুলেশন); ১৮১১ সালের রেগুলেশন VIII, ১৮১৭ সালের রেগুলেশন XI ও XIII; বেঙ্গল ল্যান্ড-রেভিনিউ অ্যাসেসমেন্ট (রিজিউমড ল্যান্ডস) রেগুলেশনস, ১৮১৯; বেঙ্গল রেভিনিউ-ফ্রি ল্যান্ডস রেগুলেশন, ১৮২৫ (১৮২৫ সালের বেঙ্গল রেগুলেশন XIV); এবং ১৮২৮ সালের রেজাম্পশন লজ বা বাজেয়াপ্তকরণ আইন (১৮২৮ সালের রেগুলেশন III)।
এই রেগুলেশন বা আইনগুলোর প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষ করা প্রয়োজন। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার যেমনটি পর্যবেক্ষণ করেছেন—‘শত শত প্রাচীন পরিবার ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল এবং মুসলমানদের শিক্ষাব্যবস্থা, যা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই নিষ্কর অনুদানের ওপর ভর করে টিকে ছিল, তা এক মরণাঘাত পেয়েছিল।’ (ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার, দি ইন্ডিয়ান মুসলমানস, পৃ. ১৭৭)। ‘তবে জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ ও আশঙ্কার কারণে ১৮৫২ সালে বেঙ্গল গভর্নমেন্ট বা বাংলা সরকার এই বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেয়।’ আজিজুর রহমান মল্লিক লক্ষ করেছেন, ‘এই বাজেয়াপ্তকরণ প্রক্রিয়াটি অবশ্য কিছু মানুষকে সমৃদ্ধ ও ধনী করেছিল। যারা এই মামলা বা প্রক্রিয়াগুলো পরিচালনা করতেন সেই সব আইনজীবী (উকিল), যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দিতেন সেই সব সাক্ষী এবং যারা বাজেয়াপ্তকরণ কর্মকর্তাদের কাছে কানকথা বা গোপন খবর পৌঁছে দিতেন সেই সব তথ্যদাতারা (মুখবির) সবাই ধনী হয়েছিলেন; কিন্তু মুসলিম উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি নিঃস্ব এবং ‘ধ্বংস’ হয়ে গিয়েছিল।’
হাজী মুহম্মদ মুহসীনের ওয়াক্ফ এস্টেটের (মুহসীন ফান্ড) সূত্রটি উল্লেখ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের হুগলির বাসিন্দা জয়নব নামের এক নারী তার প্রথম স্বামী আগা মোতাহার হোসেনের কাছ থেকে বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। আগা মোতাহার পারস্য (ইরান) থেকে দিল্লিতে এসেছিলেন। নবাব মুর্শিদকুলি খানের (আনুমানিক ১৬৬০-১৭২৭) আমলে তিনি একটি জায়গির লাভ করেন এবং হুগলিতে চলে আসেন। আগা মোতাহার ও জয়নবের মন্নুজান নামে একটি কন্যাসন্তান ছিল। আগা মোতাহারের মৃত্যুর পর জয়নবের সঙ্গে হাজী ফয়জুল্লাহর দ্বিতীয় বিয়ে হয় এবং তাদের ঘরে মুহসীন (১৭৩২-১৮১২) নামে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম হয়। ফলে মন্নুজান ছিলেন মুহসীনের সৎ বোন (একই মায়ের সন্তান)। জয়নব তার প্রথম স্বামী আগা মোতাহারের কাছ থেকে হুগলি, যশোর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় বিপুল সম্পত্তির উত্তরাধিকার পেয়েছিলেন এবং মন্নুজান তার মা জয়নবের কাছ থেকে সেই একই সম্পত্তি লাভ করেন। মির্জা সালাহউদ্দীন ছিলেন মন্নুজানের স্বামী। মন্নুজান বিধবা ছিলেন এবং ১৮০৩ সালে তার মৃত্যুর পর মুহসীন মন্নুজানের সব সম্পত্তির মালিক হন। তিনি ছিলেন একজন মহান মানবহিতৈষী এবং ১৮০৬ সালে একটি ট্রাস্ট বা ওয়াক্ফনামার মাধ্যমে তার এই উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সব সম্পত্তি দান করে যান।
সরকারি উৎস থেকে যখন জানা গেল, মুতাওয়াল্লিরা (ট্রাস্টি বা তত্ত্বাবধায়কেরা) ‘ন্যায়পরায়ণতা ও সততার নীতি থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত’, তখন সরকার মনে করল, এই ট্রাস্ট ফান্ডের ব্যবস্থাপনায় যে অপব্যবহার ও অনিয়ম হচ্ছে, তা ‘অননুমোদিত, অসমর্থনযোগ্য ও বেপরোয়া’। সরকার ১৮১৭ সালে মুতাওয়াল্লিদের তাদের পদ থেকে অপসারণ করে এবং তাদের আত্মীয়-স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের এই পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে। এরপর সরকার নিজেই হাজী মুহম্মদ মুহসীনের এস্টেটের দায়িত্ব গ্রহণ করে। পদচ্যুত মুতাওয়াল্লি ওয়াসিক আলী সদর দেওয়ানি আদালতে আপিল করলেও চূড়ান্তভাবে সরকারেরই জয় হয়। (ফান্ডের টাকা থেকে) ইমামবাড়ার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া হয়, সরকার কর্তৃক একজন মুতাওয়াল্লি নিযুক্ত করা হয় এবং অবশিষ্ট অর্থ দিয়ে একটি ট্রাস্ট ফান্ড (মুহসীন ফান্ড) গঠন করা হয়। (এ আর মল্লিক, ব্রিটিশ পলিসি অ্যান্ড দ্য মুসলিমস অব বেঙ্গল, পৃ. ২৯৩-২৯৫)। পরবর্তীকালে হাজী মুহম্মদ মুহসীনের ওয়াক্ফ সম্পত্তির আয় এমন সব খাতে ব্যবহার করা হয়েছিল, যা তার আসল ওয়াক্ফনামা বা দলিলে উল্লেখ ছিল না। এই ওয়াক্ফ-এর মাধ্যমে মুসলমানদের পরিবর্তে অমুসলিমরা বেশি উপকৃত হয়েছিল। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত করুণ ও বেদনাদায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সৈয়দ আমীর আলী সম্পর্কে একটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তিনি মুসলমানদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে ওয়াক্ফ সম্পত্তিগুলো ব্যবহার করার জন্য সরকারকে রাজি করাতে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু তার সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তবে এম এ জিন্নাহর কৃতিত্বে ১৯১৩ সালে যে ‘ওয়াক্ফ বিল’ (Waqf Bill) পাস হয়েছিল, তার মূল সূচনা বা ভিত্তি তৈরি হয়েছিল সৈয়দ আমীর আলীর উদ্যোগেরই কল্যাণে।
পাশাপাশি ঢাকার নবাবদের ওয়াক্ফ সম্পত্তিগুলোর কথাও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। খাজা আলিমুল্লাহ (?—১৮৫৪) ঢাকার খাজা পরিবারের সম্পত্তি ওয়াক্ফ করেছিলেন। তিনি এটিকে একটি সম্মিলিত এবং অবিভাজ্য পারিবারিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে রূপ দেন এবং ১৮৪৬ সালের ৮ মে একটি ওয়াক্ফনামার (ওয়াক্ফ আলাল আওলাদ) মাধ্যমে নবাব আব্দুল গনি এই এস্টেটের প্রথম মুতাওয়াল্লি নিযুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে এটি ‘ধানবিবি ওয়াক্ফ সম্পত্তি’ (পূর্বপুরুষদের চারটি সম্পত্তি) নামে পরিচিতি লাভ করে। নবাব খাজা আহসানুল্লাহ (১৮৪৬-১৯০১) ছিলেন খাজা পরিবারের এই সম্পত্তির পরবর্তী মুতাওয়াল্লি এবং তিনি জনকল্যাণমূলক কাজে অর্থ ব্যয় করতেন।
অধিকন্তু বাংলাদেশের টাঙ্গাইলের করটিয়া ওয়াক্ফ এস্টেটটিও (Karatia Waqf Estate) বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণের দাবি রাখে। বাংলাপিডিয়া থেকে জানা গেছে—‘১২২৭ বঙ্গাব্দের ৯ পৌষ সাদাত আলী খান এবং তার স্ত্রী জমরুন্নেসা খানম যৌথভাবে একটি দলিল সম্পাদন করেন, যার মাধ্যমে তাদের সমগ্র সম্পত্তিকে দুটি সমান ভাগে বিভক্ত করা হয়। এর প্রথম অর্ধাংশ (প্রথম অর্ধেক) পারিবারিক ব্যয় নির্বাহের জন্য সংরক্ষণ করা হয় এবং বাকি অর্ধাংশ ধর্মীয় ও জনকল্যাণমূলক উদ্দেশ্যে ওয়াক্ফ সম্পত্তি হিসেবে দান করা হয়। দলিলের শর্তানুযায়ী, ওয়াক্ফ সম্পত্তিটি দেখাশোনার জন্য একজন মুতাওয়াল্লি নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছিল। সাদাত আলী খান পন্নীর মৃত্যুর পর তার পুত্র হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নী এই ওয়াক্ফ সম্পত্তির মুতাওয়াল্লি হন।
১৮৯৬ সালে হাফেজ মাহমুদ আলী খান পন্নীর মৃত্যুর পর মুতাওয়াল্লি পদের দুই দাবিদার তার পুত্র ওয়াজেদ আলী খান পন্নী (চাঁদ মিয়া) ও ওয়াজেদের দাদি জমরুন্নেসা খানমের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও মামলা-মোকদ্দমা শুরু হয়। চূড়ান্তভাবে ওয়াজেদ আলী খান পন্নী জয়লাভ করেন এবং মুতাওয়াল্লি হিসেবে এই এস্টেট পরিচালনার দায়িত্ব পান।’ (‘করটিয়া জমিদারি’, বাংলাপিডিয়া)
পাকিস্তান ও বাংলাদেশ আমলে ওয়াক্ফ : ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের পর বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) অনেক ওয়াক্ফ সম্পত্তি সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয়, অথবা ভূমিগ্রাসীদের দ্বারা অবৈধভাবে দখল হয়ে যায়। এই এস্টেটগুলোর অনুদান প্রাপকেরা তাদের অধিকার এবং স্বার্থ রক্ষা করার মতো অবস্থায় ছিলেন না, কারণ তারা ওয়াক্ফনামা বা মূল দলিলপত্র উপস্থাপন করতে পারছিলেন না। এই দলিলগুলো কলকাতায় রয়ে গিয়েছিল।
দ্য ডেইলি ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইনুদ্দীন হায়দার ও ফয়জুন্নেসা ওয়াক্ফ এস্টেট (ওয়াক্ফ লিল্লাহ) কর্তৃপক্ষের ১২ হাজার ৫০০ একর জমি এবং অন্যান্য সম্পত্তি ছিল। আইনুদ্দীন হায়দার প্রায় আট হাজার একর জমি উৎসর্গ করেছিলেন এবং তার মৃত্যুর কয়েক বছর পর তার স্ত্রী বাকি সম্পত্তি দান করেন (যার ফলে মোট জমির পরিমাণ দাঁড়ায় ১২ হাজার ৫০০ একর)।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর এই বিশাল ওয়াক্ফ এস্টেটটি সম্পূর্ণভাবে বেদখল হয়ে যায়। পাশাপাশি শাহজাদী বেগম ওয়াক্ফ এস্টেটের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। এই ওয়াক্ফ এস্টেটটি ‘গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ এবং মুন্সীগঞ্জ জেলার এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে গঠিত। ৭২ হাজার একরের এই এস্টেটটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎসর্গীকৃত বা ওয়াক্ফ এস্টেট। তবে বর্তমানে এই পুরো এস্টেটটি অবৈধ দখলে রয়েছে।’ তৎকালীন ঢাকা সদর থানার অন্তর্গত বাগদিসার আগা মুহাম্মদ হোসেনের মৃত্যুর পর, তার বিধবা স্ত্রী শাহজাদী বেগম ১৮৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর শাহজাদী বেগম ওয়াক্ফ এস্টেটের জন্য এই জমি দান করেছিলেন। (আনিসুর রহমান খান, ‘ওয়াক্ফ প্রোপার্টি ইন ক্যাপিটাল ৮৫০০০ একরস ল্যান্ড গ্র্যাবড’, দ্য ডেইলি ইন্ডিপেনডেন্ট, ২ মার্চ ২০১৬)
ওয়াক্ফ কার্যালয়ের সূত্রগুলো থেকে জানা যায়, নিম্নলিখিত সরকারি কার্যালয় ও এলাকাগুলো বর্তমানে ওয়াক্ফ ভূমির ওপর অবস্থিত—ঢাকার বঙ্গভবন থেকে চানখারপুল পর্যন্ত এলাকা, মিরপুর এবং সাভার এলাকা, যা এখন সরকারি দখলে রয়েছে। এ ছাড়া অনেক সরকারি দপ্তর, যেমন—বাংলাদেশ সচিবালয়, রেলওয়ে ভবন, পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স (পুলিশ সদর দপ্তর), ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তন, নগর ভবন (ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন) এবং সাভার সেনানিবাসও এর অন্তর্ভুক্ত। অনেক আবাসন ব্যবসায়ী (ল্যান্ড ডেভেলপার), ওয়াকিফদের (ওয়াক্ফকারী) উত্তরসূরি এবং সাধারণ ব্যক্তিরাও এই জমিগুলোর বিভিন্ন অংশ দখল করে নিয়েছে। (মোহসিনুল করিম, ‘নো ট্রেস অব ৮৫০০০ একরস অব টু ওয়াক্ফ এস্টেটস ইন সিটি, দ্য ডেইলি অবজার্ভার, ২ মার্চ ২০১৬)
বাংলাদেশে বর্তমানে ওয়াক্ফ নিয়ন্ত্রণের একটি পূর্ণাঙ্গ আইন হিসেবে ‘ওয়াক্ফ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬২’ প্রচলিত রয়েছে। এই অর্ডিন্যান্সের অধীনে একটি বিভাগ বা অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এই বিভাগের প্রধান ‘ওয়াক্ফ প্রশাসক’ (Waqf Administrator) হিসেবে পরিচিত এবং বিভাগটির নাম ‘ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়’।
উপসংহার: বাংলায় মুসলিম শাসনের একেবারে সূচনালগ্ন থেকেই শাসকেরা বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁরা কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করতে পারেন না। তাই তাঁরা একটি মুসলিম সমাজ গড়ে তোলার লক্ষ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা এবং খানকা নির্মাণ করেছিলেন; এবং ওয়াকফ ব্যবস্থাটি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অধীনে নিষ্কর বা ওয়াকফ ভূমি থাকত। এই সম্পত্তিগুলোর মুতাওয়াল্লি বা ওয়াকিফরা (প্রাপক/তত্ত্বাবধায়ক) উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, এই প্রতিষ্ঠানগুলো পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত হতো সুফি এবং ওলামাদের (ধর্মীয় পণ্ডিত) দ্বারা, যাঁদের সমাজে ব্যাপক প্রভাব ছিল। সমাজে এই প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল, এই প্রবন্ধে তা উন্মোচিত হয়েছে। মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা এই ওয়াকফ ভূমির মাধ্যমে সাহায্য পেতেন এবং খানকাগুলোর সাথে লঙ্গরখানা বা অন্নছত্র যুক্ত থাকত। ওয়াকফ ভূমি থেকে প্রাপ্ত আয় এবং এর ব্যয়ের খাতগুলো সমাজে একটি শক্তিশালী বন্ধন হিসেবে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রধান নিয়ামক ছিল। সম্ভ্রান্ত বংশীয় পুণ্যবান ব্যক্তি, ধার্মিক মানুষ এবং ধর্মীয় পণ্ডিতেরা এই ব্যবস্থার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন ও সম্মানিত হতেন। যেহেতু তাঁরা রাজকীয় অনুদান (Crown) দ্বারা উপকৃত হতেন, তাই তাঁরাও শাসকদের প্রতি অনুগত ও সহায়ক ছিলেন এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা, ভারসাম্য ও শাসন সুসংহত করার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছিলেন। এমনকি অমুসলিমদেরও মদদ-ই-মাআশ (নিষ্কর জমি) দেওয়া হতো, যার উদ্দেশ্য ছিল রাজকীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি তাঁদের আনুগত্য লাভ করা এবং সাম্রাজ্যবাদী শাসনকে শক্তিশালী করা। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দাতব্য সহায়তায় দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের অন্নসংস্থান ও চিকিৎসা নিশ্চিত করা হতো। ব্রিটিশদের দ্বারা ওয়াকফ ভূমি বাজেয়াপ্ত হওয়ার পর বাঙালি মুসলমানদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ ও বেদনাদায়ক হয়ে পড়েছিল। অতএব, ওয়াকফ সম্পত্তির ইতিহাসকে বাংলার আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় ইতিহাসের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


