রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনে দীর্ঘ প্রতীক্ষিত মেট্রোরেল লাইন-৫-এর সাউদার্ন রুট বাস্তবায়নের উদ্যোগে গতি এসেছে। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭.২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এ প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আগামী বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিসভা কক্ষে একনেক সভায় এটিসহ বিভিন্ন খাতের ১৫ প্রকল্প অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে বলে জানা গেছে। প্রধানমন্ত্রী ও একনেক সভাপতি তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভাটি অনুষ্ঠিত হবে।
‘ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫) : সাউদার্ন রুট’ নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। সর্বশেষ পুনর্মূল্যায়নে প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। বাকি প্রায় ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা আসবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ডের (ইডিসিএফ) ঋণ থেকে।
ব্যয় কমেছে ৯,০০০ কোটি টাকা
প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫৪ হাজার ৬১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। পরবর্তী পর্যালোচনায় তা নামিয়ে আনা হয় ৪৭ হাজার ৭২১ কোটি ৪৪ লাখে। সর্বশেষ পুনর্মূল্যায়নে আরো ২,২১৭ কোটি ৬৭ লাখ টাকা কমিয়ে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রথম প্রস্তাবের তুলনায় ব্যয় কমেছে ৯,১১৫ কোটি ১৯ লাখ টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত।
১৩ কিলোমিটারই হবে পাতালপথ
প্রকল্পের নথি অনুসারে, গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত রুটের ১৩.১০ কিলোমিটার থাকবে মাটির নিচে। বাকি ৪.১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ। পুরো করিডোরে ১৫টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি পাতাল এবং চারটি উড়াল স্টেশন।
রুটটি গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, রাসেল স্কয়ার, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও এবং আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে। গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশ মূলত মাটির নিচ দিয়ে নির্মাণ করা হবে। এরপর আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত অংশ হবে উড়ালপথে। পাতাল টানেল ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬ থেকে ৩৮ মিটার গভীরে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। হাতিরঝিলের নিচ দিয়ে টানেল নেওয়ায় নির্মাণকাজকে জটিল ও ব্যয়বহুল হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
২৮ মিনিটে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি
প্রকল্পটি চালু হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যেতে সময় লাগবে প্রায় ২৮ মিনিট। বর্তমানে যানজটের কারণে একই পথে যাতায়াতে দেড় থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। শুরুতে ছয় কোচের ১৯ সেট ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২,৩১২ জন যাত্রী বহনের সক্ষমতা থাকবে। ট্রেন চলাচলের ব্যবধান রাখা হবে ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড। পরবর্তী সময়ে তা কমিয়ে ৩ মিনিট ১০ সেকেন্ডে আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ৯ লাখ ২৪ হাজার যাত্রী এই পথে চলাচল করতে পারেন। বছরে প্রায় ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে দ্রুতগতির গণপরিবহন যোগাযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ঋণ দেবে এডিবি-কোরিয়া
প্রকল্পে এডিবির পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার ইডিসিএফ অর্থায়ন করবে। এডিবি সর্বোচ্চ ৩ বিলিয়ন ডলার ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রথম ধাপে আগামী অর্থবছরে ৩০ কোটি ডলার ছাড় করার কথা রয়েছে। কাজের অগ্রগতি অনুযায়ী পরবর্তী অর্থ দেওয়া হবে। দক্ষিণ কোরিয়া সর্বোচ্চ ১.৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
তবে প্রকল্পের নথিতে দুই উন্নয়ন সহযোগীর ঋণ হিসেবে প্রায় ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা দেখানো হয়েছে। ডিপিপির আর্থিক বিশ্লেষণে নিট বর্তমান মূল্য ঋণাত্মক ৫,১৯৯ কোটি টাকা এবং বেনিফিট-কস্ট রেশিও ০.৯৫। অর্থাৎ শুধু ভাড়া ও পরিচালন আয় দিয়ে বিনিয়োগের পুরো অর্থ ফেরত আসবে না।
তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে সময় সাশ্রয়, যানজট হ্রাস, জ্বালানি ব্যয় কমানো, কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মতো বৃহত্তর সুফল বিবেচনা করা হয়েছে। এসব সুবিধা ধরেই প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হিসেবে দেখানো হয়েছে। পুনর্বাসন খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪,৭১৬ কোটি টাকা।
প্রস্তুতি অনেকটাই শেষ
প্রকল্পটির প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, মৌলিক প্রকৌশল নকশা, বিস্তারিত নকশা, দরপত্র প্রক্রিয়ায় সহায়তা, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা ও পুনর্বাসন কর্মপরিকল্পনার কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এডিবির অর্থায়নে পরিচালিত কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় এসব কাজ সম্পন্ন করা হয়।
ইতোমধ্যে কয়েকটি প্যাকেজের দরপত্র নথিও প্রস্তুত হয়েছে। সিপি-১ থেকে সিপি-৪-এর চূড়ান্ত দরপত্র নথিতে এডিবির সম্মতি পাওয়া গেছে। সিপি-৬ ও সিপি-৭-এর কাগজপত্র পর্যালোচনায় রয়েছে। সিপি-৮ ও সিপি-৯-এর নথিও তৈরি করা হয়েছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা জানান, ভূমি অধিগ্রহণে প্রায় এক থেকে দেড় বছর সময় লাগতে পারে। এ সময় দরপত্রসহ অন্যান্য প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়া হবে। জমি কেনার অর্থ সরকার বহন করবে। ফলে বৈদেশিক ঋণ চূড়ান্ত হতে কিছুটা সময় লাগলেও প্রাথমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে। শুধু পাতাল টানেল নির্মাণেই প্রায় পাঁচ বছর লাগতে পারে। এমআরটি-৫ এর সাউদার্ন রুট বাস্তবায়নের উদ্যোগ রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের গণপরিবহন ব্যবস্থায় নতুন সংযোগ তৈরি করতে পারে। এখন প্রকল্পটির একনেক অনুমোদনের অপেক্ষা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


