বাজারে জড়িত বড় সিন্ডিকেট- দাবি ক্যাবের

চালের দামে ক্ষুব্ধ ভোক্তা অস্বস্তিতে সরকার

চালের দামে ক্ষুব্ধ ভোক্তা অস্বস্তিতে সরকার

বোরোর ভরা মৌসুমে বাজারে চালের দাম হঠাৎ কেজিতে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ সাধারণ ভোক্তারা। সেই সঙ্গে অস্বস্তিতে পড়েছে সরকারও। উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশে চালের দাম মিল না থাকায় এ পরিস্থিতি বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্রেতারা বলছেন, নতুন ধান উঠতে না উঠতেই প্রায় সব ধরনের চালের দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে বাজারে সিন্ডিকেট জড়িত। বিক্রেতারা বলছেন, মিল মালিকরা তাদের জানিয়েছেন ধানের দাম হঠাৎ বাড়ায় চালের দাম এখন বেশি।

বিজ্ঞাপন

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা এসএম আকাশ একটি বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করেন। ঈদের আগে কৃষি মার্কেট থেকে মোজাম্মেল কোম্পানির ৫০ কেজির এক বস্তা সরু মিনিকেট চাল কেনেন চার হাজার টাকার কমে। কিন্তু ঈদের সপ্তাহ খানেক পর একই বাজারে চাল কিনতে গিয়ে দেখেন তা সাড়ে চার হাজার টাকা।

আকাশ বলেন, দেশটা যেন মগের মুল্লুক হয়ে গেছে। চালের বাজারে বড় ধরনের সিন্ডিকেট সক্রিয়। তা না হলে ভরা মৌসুমে হঠাৎ কেজিতে ১০ টাকা বৃদ্ধির কোনো কারণ নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চালের প্রায় ৫৫ শতাংশ বোরো মৌসুমে উৎপাদন হয়। ফলন ভালো হলে সরবরাহ বাড়ে এবং বাজারে দামও কমে। চলতি বছর বোরোতে রেকর্ড ২ কোটি ১৪ লাখ টন চাল উৎপাদন হয়েছে। বিশ্ববাজারেও নিম্নমুখী এখন চালের দর।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, জুনে আন্তর্জাতিক বাজারে বাসমতিসহ বিভিন্ন জাতের চালের চাহিদা কমেছে। এতে করে চালের দাম এখন কমেছে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। এরপরও দেশের বাজারে বেড়েছে চালের দাম।

বিক্রেতারা জানান, হঠাৎ কোরবানির ঈদের পরে চালের দাম বেড়ে যায়। এ সময়ে খুচরা পর্যায়ে প্রতি কেজি মিনিকেট চালের দাম পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ দশ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। চার সপ্তাহ ধরে বাজারে সরু তথা মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে বাড়তি দামেই। নতুন করে মোটা চালের দামও বস্তাপ্রতি ৫০ টাকা বেড়েছে।

গতকাল সোমবার রাজধানীতে চালের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার বাবুবাজারে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদের তিন-চারদিন পর হঠাৎ করেই মিনিকেট চালের দাম বস্তাপ্রতি তিনশ’ থেকে চারশ’ টাকা বেড়েছে। এর সঙ্গে যোগ হয় গাড়ি ভাড়া। যার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

গতকাল বাবুবাজারের পাশেই নয়াবাজারে গিয়ে দেখা গেল, খুচরায় তীর ডায়মন্ড, সাগর, মঞ্জুর, রশিদ প্রভৃতি ব্র্যান্ডের প্রতি কেজি মিনিকেট চাল ৮০ থেকে ৮২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ঈদের আগে এসব চালের কেজি ছিল ৭৫-৭৬ টাকা। বর্তমানে মোজাম্মেল ব্র্যান্ডের মিনিকেটের দাম সবচেয়ে বেশি, প্রতি কেজি ৮৬-৯০ টাকা, যা ঈদের আগে ৮৯ থেকে ৮০ টাকা ছিল। এ ছাড়া খুচরা বাজারে প্রতি কেজি স্বর্ণা (মোটা চাল) ৫৫-৫৮ টাকা, ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ (মাঝারি চাল) জাতের চাল ৬০-৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

টিসিবির হিসাবেও, জুন মাসে দেশের বাজারে কেজিতে ৭ থেকে ৮ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে চালের দাম। মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৮২ থেকে ৮৫ টাকায়। ৫৬ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি মোটা চাল।

এ প্রসঙ্গে বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে চালের সরবরাহে কোনো সংকট নেই। নতুন করে বাড়েনি চাহিদাও। পরিবহন ব্যয় বা শ্রমিকের মজুরি বাড়ার নতুন কোনো তথ্যও তাদের কাছে নেই। কারওয়ান বাজারের চাল ব্যবসায়ী বাচ্চু মিয়া বলেন, ঈদের পরে হঠাৎ করেই বেড়ে গেছে দাম। অথচ বাজারে ধান-চাল সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো কারণ ছাড়াই বড় কোম্পানিগুলো অনেকটাই সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়েছে। যদিও তারা বলছেন ধানের দাম বাড়ার কথা।

কারওয়ানবাজারের ব্যবসায়ী আতিকুর রহমান বলেন, সরকারের মজুত নীতিমালার তোয়াক্কা করছেন না অসাধু মজুতদাররা। বোরো মৌসুমের শুরুতেই করপোরেট ব্যবসায়ীরা হাট-বাজারে আসা অর্ধেকের বেশি ধান কিনে মজুত করে রেখেছেন। কৃষকের ধান সাধারণ মোকামের সাধারণ মিলারদের হাতে একেবারে নেই বললেই চলে। এখন তারা ধানের দাম বাড়ার কথা বলে চালের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বাবুবাজারের চাল আড়ৎ মালিক আমজাদ হোসেন বলেন, দেশের ধান-চালের বাজার এখন অটো রাইচ মিল ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে। তারা বাজার থেকে প্রতিযোগিতা করে ধান কেনে। ফলে ধানের বাজার বাড়তি। এ কারণে চালের দাম বাড়ছে।

খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, বোরোর এই ভরা মৌসুমেও বাজারে চালের দাম বাড়ার ঘটনা অস্বাভাবিক। সরকারের পক্ষ থেকে নজরদারির অভাবে ধানের দাম বাড়তির কথা বলে মোকামে সব ধরনের চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে মিলাররা। এর ফলে আড়ৎ থেকে শুরু করে খুচরা বাজার পর্যন্ত সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। চাল আমদানি ও অভ্যন্তরীণ ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম বাড়তি। সরকার চালের বাড়তি দর নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টার কথা বললেও তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না।

তবে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান বলেন, আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি এবং অযৌক্তিকভাবে মূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। তিনি আরো বলেন, জেলা প্রশাসন বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে স্পেশাল অ্যাক্টের আওতায় ব্যবস্থা গ্রহণ করে পারেন।

কনসিউমার্স অ্যাসোসিয়েশন ওফ বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর নির্বাহী কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও ব্যবসায়ীদের মানসিকতা বদলায়নি। বাজার সিন্ডিকেট একই রয়ে গেছে। গুটিকয়েক অসাধু ব্যবসায়ী বাজারকে অস্থির করে তুলছে। এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলোর নীরবতা রহস্যজনক। আমরা বিভিন্ন ব্যানারে সারা দেশেই চালের মূল্য বৃদ্ধির বিরুদ্ধে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছি। কিন্তু সরকার জনগণের কথা ভাবছে বলে মনে হচ্ছে না।

এ অবস্থায় ভোক্তাকে স্বস্তি দিতে সরকারি তদারকি বাড়ানোর পরামর্শ দিয়ে কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. সামিউল ইসলাম বলেন, কিছু অসাধু চালকল মালিক, বড় ব্যবসায়ী ও করপোরেট হাউসের মালিকদের কারসাজিতে অস্থির হয়েছে চালের বাজার। সরকার মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করলে বাজারে চালসহ অন্যান্য পণ্যের অবৈধ মজুত কমবে। দামও কমে আসবে বলে মনে করেন তিনি।

এদিকে চালের দাম বাড়া প্রসঙ্গে সম্প্রতি কৃষি উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, চাল আমদানি ও অভ্যন্তরীণ ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম বাড়তি। সরকার চালের বাড়তি দর নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। গত বছরের তুলনায় এবার বোরো উৎপাদন ১৫ লাখ টন বেশি হয়েছে। তবু বাজারে চালের দাম বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন