হাসিনার ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ডাকাতি

হাসিনার ব্যবসায়ীদের ব্যাংক ডাকাতি

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বের করে নিয়ে করা হয়েছে পাচার।

অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর শেখ হাসিনার পরিবারের সদস্যসহ ১১ ব্যক্তি ও তাদের শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। ইতোমধ্যে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের এক লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি ঋণ।

বিজ্ঞাপন

গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় দেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার অগ্রগতি পর্যালোচনা বৈঠকে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। বৈঠকে উপস্থাপন করা এ-বিষয়ক প্রতিবেদনটি আমার দেশের হাতে এসেছে। এ ছাড়া এ বিষয়ে আরো তদন্ত চলছে।

হাসিনার পরিবারের সদস্যদের বাইরে ১০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হলোÑ সাইফুজ্জামান চৌধুরী, এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বসুন্ধরা গ্রুপ, নাসা গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, জেমকন গ্রুপ ও সামিট গ্রুপ। তবে হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যের কারো নামে ঋণের তথ্য পাওয়া যায়নি।

ওই প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের নামে এক হাজার ১০৭ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে খেলাপি ৬৩৯ কোটি টাকা। ইতোমধ্যে সাইফুজ্জামান ও তার পরিবার এবং আরামিট গ্রুপের নামে থাকা দেশ-বিদেশের ৫৮০ বাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট, জমিসহ স্থাবর সম্পদ জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। এর মধ্যে যুক্তরাজ্যে ৩৪৩টি, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২২৮টি এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৯টি বাড়ি রয়েছে। বেসরকারি খাতের ইউসিবি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ছিল সাইফুজ্জামান পরিবারের কাছে। এখন এ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে অনন্ত গ্রুপের হাতে।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, এস আলম ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ রয়েছে ৬৩ হাজার ৯৩২ কোটি টাকা। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বিএফআইইউর তথ্যমতে, এস আলম গ্রুপের নামে-বেনামে ১০টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান দুই লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ পেয়েছে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের মালিকানাধীন বেক্সিমকো গ্রুপের কোম্পানিগুলোর নামে ৫৩ হাজার ৪৩ কোটি টাকা ঋণ রয়েছে, যার মধ্যে ২০ হাজার ৫৬১ কোটি টাকাই খেলাপি। এসব ঋণের টাকা পাচার করা হয়েছে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুরে। এসব দেশে গ্রুপটির পরিবারের নামে সম্পদ থাকার তথ্য পেয়েছে তদন্ত সংস্থাগুলো। ইতোমধ্যে লন্ডনে সালমান এফ রহমানের ছেলে ও তার ভাতিজার এক হাজার ৪৭৯ কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

দেশের ব্যাংকগুলো থেকে সিকদার গ্রুপ নামে-বেনামে ১০ হাজার ২৩৩ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে, যার মধ্যে দুই হাজার ৯৪ কোটি টাকা খেলাপি। সিকদার পরিবারের সম্পদ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস ও নিউইয়র্ক, প্রমোদনগরী হিসেবে খ্যাত লাস ভেগাস, সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি ও থাইল্যান্ডের ব্যাংককে। যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডে রয়েছে সিকদার পরিবারের একাধিক কোম্পানি।

দেশে বসুন্ধরা গ্রুপ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৪ হাজার ৯৮৪ কোটি টাকার ঋণ থাকার তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে সাত হাজার ৮১১ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানসহ তার পরিবারের আট সদস্যের বিদেশে থাকা স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ জব্দ ও অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছে আদালত। সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, স্লোভাকিয়া, সাইপ্রাস, সেন্ট কিটস অ্যান্ড নেভিস ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডে বসুন্ধরা পরিবারের সদস্যদের সম্পদের খোঁজ মিলেছে। এজন্য সম্পদ জব্দের আদেশের অনুলিপি এসব দেশে পাঠানো হয়েছে।

এ ছাড়া নাসা গ্রুপ ও এর স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে ৯ হাজার ২১৫ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান ছিলেন নজরুল ইসলাম মজুমদার। তার যুক্তরাজ্যে পাঁচটি বাড়ি, আইলে অব ম্যানে একটি ও নিউ জার্সিতে একটি বাড়ির খোঁজ মিলেছে। এসব সম্পদ অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছে আদালত।

ওরিয়ন গ্রুপের নামে ১০ হাজার ১২ কোটি টাকার ঋণের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব ঋণের মধ্যে এক হাজার ৪৬১ কোটি টাকা খেলাপির খাতায় উঠেছে। গ্রুপের চেয়ারম্যান ওবায়দুল করিম। ইতোমধ্যে তার ৩১টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ ও একটি ফ্ল্যাটসহ ৪৩ একর জমি জব্দের আদেশ দিয়েছে আদালত। ওবায়দুল করিমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সম্প্রতি তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।

নাবিল গ্রুপের নামে-বেনামে ৯ হাজার ৪০৫ কোটি টাকার ঋণের তথ্য দেখানো হয়েছে। এর মধ্যে সাত হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে। যদিও নাবিল গ্রুপের নামে ১৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ রয়েছে বলে একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এ ছাড়া জেকমন গ্রুপ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠানের নামে দুই হাজার ১১৩ কোটি টাকার ঋণ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯৩ কোটি টাকা খেলাপি। তা ছাড়া সামিট গ্রুপের নামে রয়েছে এক হাজার ৩৩৫ কোটি টাকার ঋণ। সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজ খান। আজিজ খান ও তার পরিবারের ১১ সদস্যের ১৯১টি ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার আদেশ দিয়েছে আদালত।

গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক শেষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, যারা তদন্তের আওতায় এসেছেন, তাদের এক লাখ ৩০ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ সংযুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদেশে ১৬ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার এবং ৪২ হাজার ৬১৪ কোটি টাকার অস্থাবর সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার ও ১০ শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ঘুস, দুর্নীতি, প্রতারণা, জালিয়াতি, মুদ্রা পাচার, কর ও শুল্ক ফাঁকি এবং অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে সরকার ১১টি তদন্তদল গঠন করে। তদন্তদলে রয়েছে সিআইডি ও এনবিআর। এ তদন্তের নেতৃত্ব দিচ্ছে দুদক। সমন্বয়ের দায়িত্বে রয়েছে বিএফআইইউ। আইনি সহায়তা দেবে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন