পাঁচ বছরেও ছাড় হয়নি জরুরি কেনাকাটার ৭০০ কোটি টাকা

পাঁচ বছরেও ছাড় হয়নি জরুরি কেনাকাটার ৭০০ কোটি টাকা

মন্ত্রী-সচিব ও প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের গাফিলতিতে পাঁচ বছরেও ছাড় হয়নি মহামারি করোনাকালের জীবনরক্ষাকারী সুরক্ষা সামগ্রীর ৭০০ কোটি টাকা। টাকা পেতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তবে নিজেদের পক্ষে আদালতের রায় নিয়ে এসেও টাকা পাচ্ছে না সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো। ফলে মহামারি মোকাবিলায় এগিয়ে আসায় যাদের পুরস্কার পাওয়ার কথা, তারা এখন পথে বসেছেন।

ভুক্তভোগী কোম্পানিগুলো বলছে, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার সমান উল্লেখ করে মহামারি করোনার সময় চিকিৎসা উপকরণ সরবরাহের অনুরোধ করা হয় সরকারের পক্ষ থেকে। কিন্তু সরবরাহের পর বিল দিতে নানা কূটকৌশল করেছেন আমলারা।

বিজ্ঞাপন

যার মূলে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) সাবেক পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান। তিনি জরুরি পরিস্থিতির বিষয়টি জেনেও মন্ত্রণালয়ে ভুলভাবে উপস্থাপন করেন। গাফিলতি করেছেন মন্ত্রী ও সচিবরাও। আশ্বাস ছাড়া কারো কাছেই সমাধান পাওয়া যায়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই বিষয়টি সমাধান আসতে পারে বলে জানান সিএমএসডির কর্মকর্তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে করোনার প্রকোপ শুরু হলে বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। দেশে লকডাউনের খবরে চারদিকে সংকট, উৎকণ্ঠা। এমন পরিস্থিতিতে একজন আইনজীবীর করা রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ২২ মার্চ সাতদিনের মধ্যে করোনা শনাক্তকরণে আরটি-পিসিআর মেশিন, করোনা থেকে সুরক্ষায় পারসোনাল প্রটেকশন ইক্যুইপমেন্ট (পিপিই), সার্জিক্যাল মাস্ক, হ্যান্ড সেনিটাইজারসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।

সে অনুযায়ী, সিএমএসডির তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শহীদউল্লাহর চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের উপকরণ সরবরাহ করে কোম্পানিগুলো। ওই বছরের ৩ মে পণ্যের দাম চূড়ান্ত করতে বৈঠক করে ছয় সদস্যের ক্রয় কমিটি। কমিটিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদও ছিলেন।

পরে আদালতের নির্দেশনা ও কোভিড-১৯ মোকাবিলায় সাপ্লাই চেইন অব্যাহত রাখার স্বার্থে ডিপিএম পদ্ধতিতে মার্চ থেকে জুন পর্যন্ত ১৯৬টি প্যাকেজে মাধ্যমে এক হাজার ২৮৫ কোটি ২২ লাখ ৪১ হাজার টাকার চিকিৎসা উপকরণ কেনা হয়। এর মধ্যে সিএমএসডির পরিচালক মোহাম্মদ শহীদউল্লাহ ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি বদলি ও পরে তার মৃত্যু হলে তার আমলে কেনা ৭০০ কোটি টাকার সরঞ্জামের বিল আটকে যায়, যা আজও পরিশোধ করা হয়নি কোম্পানিগুলোকে।

চিঠি চালাচালিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন আমলারা

বিদায়ের আগে ৫৭টি প্যাকেজের ৩৪৩ কোটি ২৯ লাখ ৯৭ হাজার টাকার একটি বিল সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির ভূতাপেক্ষ অনুমোদনের জন্য পাঠান ব্রিগেডিয়ার শহীদউল্লাহ। এর এক সপ্তাহ পর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান তিনি। নতুন পরিচালক তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব আবু হেনা মোরশেদ জামান দায়িত্ব নিয়েই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে বলেন, এই কেনাকাটায় কোনো প্রকার পিপিআর (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা) মানা হয়নি। এ ছাড়া সরবরাহ চুক্তি, কার্য সম্পাদন জামানতসহ আটটি ত্রুটি তুলে ধরে এই বিল পরিশোধ বিধিসম্মত নয় বলে মত দেন। সমস্যা সমাধানে সিএমএসডির করণীয় সম্পর্কে মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেন আবু হেনা।

পরে ২৯ জুন বিল পরিশোধের করণীয় ঠিক করতে আট সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। কমিটির সভাপতি সাবেক অতিরিক্ত সচিব নাজমুল হক খান গত সোমবার আমার দেশকে বলেন, ‘জরুরি পরিস্থিতিতে কেনাকাটা হয়েছে, এটা ঠিক। তবে সেগুলো পিপিআর মেনে কেনা উচিত ছিল। ব্রিগেডিয়ার শহীদুল্লাহ মারা গেলে সিএমএসডির উচিত ছিল সরকারের ক্রয় কমিটিতে ভূতাপেক্ষ অনুমোদন নিয়ে বিল পরিশোধ করা। তাহলে আজ এ অবস্থায় পৌঁছত না।’

আদালতে হওয়া মামলার রায়েও মেলেনি টাকা

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ২৬টি কোম্পানি সরকারের ক্রয় ব্যবস্থা সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটে (সিপিটিইউ) মামলা করেছে। এ ছাড়া আদালতে মামলা করেছে দুটি কোম্পানি। কিন্তু রায় নিয়ে যাওয়া হলেও টাকা পাচ্ছে না কোম্পানিগুলো।

করোনার শুরুতে সবচেয়ে বেশি চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ করে ওভারসিস মার্কেটিং করপোরেশন (ওএমসি) প্রাইভেট লিমিটেড। ১০১ কোটি ৫১ লাখ ৭২ হাজার ৫০০ টাকার সরঞ্জাম সরবরাহ করে কোম্পানিটি। বিল পরিশোধে আমলাদের হয়রানির পর হাইকোর্টে মামলা করে ওএমসি। গত বছরের ১ জুলাই আদালত সরকারকে বিল পরিশোধের আদেশ দেয়। ওএমসির কর্মকর্তা জুয়েল আমার দেশকে বলেন, ‘টাকা না পেয়ে আমরা মামলা করেছি, আদালত রায়ও দিয়েছে, কিন্তু কোনো অগ্রগতি নেই।’

টাকা ফেরত চান ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা

মহামারি মোকাবিলায় এগিয়ে এসেছিলেন দেশের প্রখ্যাত অভিনয় শিল্পী মাসুদ রানা মিঠু। তার কোম্পানি এম আর এন্টারপ্রাইজের পিপিই সরবরাহ করে। মিঠুর পাওনা ‍দুই কোটি ৮১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। পাঁচ বছর ধরে মন্ত্রণালয়, সিএমএসডিসহ বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরেও টাকা পাননি তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নানা শারীরিক অসুস্থায় ভুগছেন এই গুণী অভিনেতা, কিন্তু টাকার অভাবে করাতে পারছেন না চিকিৎসা।

অভিনেতা মিঠু আমার দেশকে বলেন, ‘সিপিটিইউতে অভিযোগ করলে গত বছরের ২ নভেম্বর দুই মাসের মধ্যে বিল পরিশোধের জন্য সিএমএসডিকে নির্দেশনা দেওয়া হয়। এরপর সচিব, পরিচালকদের কাছে গেলেও আশ্বাস ছাড়া কিছুই পাইনি।’

পিপিই ও সার্জিক্যাল মাস্ক সরবরাহ করা স্টারলিংকের মালিক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসার করি। বিল না পাওয়ায় লোন বেড়ে গেছে। ব্যবসা চালাতেই কষ্ট হচ্ছে।’

বগুড়া ট্রেড সেন্টার কোম্পানির মালিক সৈয়দ মাহমুদুর রশিদ বলেন, ‘ব্যাংকের ঋণ নিয়ে চীন থেকে আমদানি করা ৯০ হাজার পিস পিপিই সরবরাহ করি। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করায় চার বছরে সুদ অনেক বেড়েছে।’

সাবেক পরিচালককে দুষছেন ঠিকাদাররা

সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, জরুরি পরিস্থিতির কেনাকাটায় আদালতের নির্দেশনার পরও বিল আটকে যাওয়ার পেছনে মূল কারণ, পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামানের আপত্তি। তিনি বিল দিতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে বাধা দেন।

তবে সিএমএসডির সাবেক পরিচালক আবু হেনা মোরশেদ জামান আমার দেশকে বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পর কাগজপত্র ঘেঁটে দেখি কোথাও কোথাও লেখা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশে মালামাল কেনা হয়েছে। কোনো ধরনের পিপিআর অনুসরণ করা হয়নি। তাই ওই অবস্থায় বিল দিলে আমাকে জেলে যেতে হতো। আমি কেবল একটি চিঠি দিয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘ঠিকাদারদের কষ্ট আমরা বুঝি। এজন্য তখনই তাদের মামলা করতে বলা হয়েছিল। তদন্ত কমিটিও কোনো সমাধান দিতে পারেনি। আমার পর আরো চারজন পরিচালক গেছেন, অনেক সচিব গেছেন, মন্ত্রীও ছিলেন। সবাই শুধু চিঠি চালাচালি করেছেন, কিন্তু সমাধান দেননি।’

সিএমএসডির উপপরিচালক ডা. তউহীদ আহমদ বলেন, ‘ব্রিগেডিয়ার শহীদউল্লাহর সময়ের কেনাকাটার ৭০০ কোটির একটি টাকাও পরিশোধ হয়নি। ঠিকাদাররা মালামাল দিয়েছেন, সরকার নিয়েছে এবং ব্যবহার করেছে সবই সত্য। কিন্তু বেশকিছু প্রশ্ন ওঠায় মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ারে চলে যায়। বিষয়টি এখন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়।’

সিএমএসডির পরিচালক ড. এনামুল হাবীব আমার দেশকে বলেন, ‘বিষয়টি স্বাস্থ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয় দেখছে। আদালতের যেসব আদেশ আসছে, সে অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ে আমরা পাঠাচ্ছি। কীভাবে পাবে মন্ত্রণালয় বলতে পারবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি না।’

মামলার রায় নিয়ে এলে টাকা পাবে

জানতে চাইলে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ‘টাকা পেতে একটি অংশ মামলা করেছিল। যেহেতু দীর্ঘদিন হয়ে গেছে, তাই যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়ে যাবে। তবে কারো বিরুদ্ধে সুর্নির্দিষ্ট অভিযোগ না থাকলে টাকা পাবে। যেসব ঠিকাদার মামলার রায় নিয়ে আসছেন, তাদের টাকা পরিশোধ করা হবে। এটা আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত।’

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন