প্রকল্পের কাজ না করেই এক হাজার ৬৪৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা উঠিয়ে নিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) পিরোজপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পলায়ন পর্যন্ত শেষ চার অর্থবছরে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল সোমবার স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম, সাবেক সংসদ সদস্য মহিউদ্দিন মহারাজ, মহারাজের ছোট ভাই ও পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মেরাজুল ইসলাম, নাজিরপুর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নুরে আলম শাহীন ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও সাবেক মুখ্য সচিব তোফাজ্জল হোসেনের প্রশাসনিক সহায়তা দেন এ অর্থ তছরূপে। এতে এলজিইডির কর্মকর্তারা ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে টাকা তোলেন।
স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া তদন্ত প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করে বলেন, গত চার অর্থবছরে পিরোজপুর জেলায় রাজনৈতিক বিবেচনায় ১৭টি প্রকল্প নেওয়া হয়। এ প্রকল্পগুলোর চুক্তিমূল্য ছিল তিন হাজার পাঁচশ ৫৮ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে তিন হাজার ১৭৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ছাড় করা হয়েছে আর কাজ সম্পন্ন হয়েছে এক হাজার ৫২৯ কোটি ১০ লাখ টাকার। বাকি এক হাজার ৬৪৭ কোটি ৪৮ লাখ টাকা সবাই মিলে আত্মসাৎ করেছেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এলজিইডি পিরোজপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম, হিসাবরক্ষক এ কে এম মোজাম্মেল হক খান, নাজিরপুরের সাবেক উপজেলা প্রকৌশলী জাকির হোসেন মিয়া, ভান্ডারিয়া উপজেলার প্রকৌশলী মো. বদরুল আলম, পিরোজপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী হরষিত সরকার, নেছারাবাদ উপজেলা প্রকৌশলী রিপন হালদার, প্রকল্প পরিচালক আদনান আখতারুল আজম, সুশান্ত রঞ্জন রায়, সৈয়দ আহম্মদ আলী ও কাজী মিজানুর রহমান। দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এলজিআরডি উপদেষ্টা।
অনিয়ম করে বিল দেওয়া ও উত্তোলন করে আত্মসাতের সঙ্গে পিরোজপুর জেলা অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার ও তার কার্যালয়ের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত ছিলেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ইএফটিই- ইটিসিএল প্রাইভেট লিমিটেড, শিমরান মায়ান ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, এইচএস ইঞ্জিনিয়ার্স, রূপালী কনস্ট্রকশন, ইউনূস অ্যান্ড ব্রাদার্স। এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া বিল তৈরি করে টাকা তোলা হয়েছে।
পিরোজপুর নির্বাহী প্রকৌশলীর এ অর্থ কেলেঙ্কারির বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন, বিগত সাড়ে ১৫ বছরে শেখ হাসিনার আমলে কীভাবে দেশের টাকা লুট করে পাচার করা হয়েছে তা দেশবাসী জানেন। পিরোজপুরের ঘটনা তারই একটি উদাহরণ মাত্র। আমরা ধীরে ধীরে দেশের অন্য জেলাগুলোও তদন্তের আওতায় নিয়ে আসছি।
জড়িতদের বিরুদ্ধে কোন ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে উপদেষ্টা বলেন, সাবেক মন্ত্রী রেজাউল, সাবেক এমপি মহারাজ ও সাবেক মুখ্য সচিব তোফাজ্জলসহ জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দুদকে অভিযোগ দেওয়া হবে। যারা আমাদের মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিলেন বা রয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

