মির্জা ফখরুলই হতে পারেন রাষ্ট্রপতি

মির্জা ফখরুলই হতে পারেন রাষ্ট্রপতি
আমার দেশ গ্রাফিক্স

অবশেষে ভোটাভুটিতে গড়াচ্ছে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো জাতীয় সংসদের সদস্যরা ভোটের মাধ্যমে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় সংসদীয় ব্যবস্থায় অন্যসব রাষ্ট্রপতি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। আর মাত্র দুদিন পরই আনুষ্ঠানিকভাবে জানা যাবে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রপতি প্রার্থীদের নাম। অন্তত দুজন প্রার্থীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়টি এরই মধ্যে স্পষ্ট হয়েছে।

সরকারি দল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রায় চূড়ান্ত হয়েছেন দলের মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। বিরোধী ১১ দলীয় জোট আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করেছে কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ, বীর বিক্রমকে। তিনি জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা ও শরিক দল এলডিপির চেয়ারম্যান। বিএনপির পক্ষ থেকে এরই মধ্যে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে ২৫০ আসন রয়েছে বিএনপি ও দলটির শরিকদের। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিকারী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) যাকে মনোনীত করবে, তিনিই যে দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন তা নিশ্চিত। তবে দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। দলের বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে, মির্জা ফখরুলই রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাচ্ছেন। সম্প্রতি ক্ষমতাসীন বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের দায়িত্ব দলটির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করে। আগামী ১৩ আগস্ট রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা

দেওয়ার শেষ তারিখ। সেদিনই পরিষ্কার হয়ে যাবে তারেক রহমান বঙ্গভবনের চাবি কার হাতে তুলে দিতে যাচ্ছেন। আগামী ২০ আগস্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন।

দেশের ইতিহাসে দ্বিতীয়বার

ধারণা করা হচ্ছিল, ক্ষমতাসীন বিএনপি যাকে মনোনীত করবে, তিনিই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। কিন্তু সে ধারণা ভুল প্রমাণ করে ৩৫ বছর পর ভোটাভুটির মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। শনিবার রাতে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সভা শেষে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়। জোটগতভাবে প্রার্থী চূড়ান্ত করে ঘোষণার কথাও জানানো হয় শনিবার রাতে।

গতকাল রোববার ১১ দলীয় জোটের বৈঠক শেষে তাদের প্রার্থী হিসেবে এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ, বীর বিক্রমের নাম ঘোষণা করা হয়। আর এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে ২৩তম রাষ্ট্রপতি যে আগের মতো বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন না, তা নিশ্চিত হয়ে যায়। যদিও এখনো মনোনয়নপত্র জমা, যাচাই-বাছাই, প্রত্যাহারের সুযোগ রয়েছে। কোনো কারণে মনোনয়নপত্র বাতিল বা প্রত্যাহার করা হলে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতাও দেখা যেতে পারে।

গতকাল দুপুরে ১১ দলীয় জোটের বৈঠক শেষে জোটের অন্যতম শরিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম জানান, দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ।

এদিকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দুটি মনোনয়ন ফরম নিয়েছে সরকারি দল বিএনপি। নির্বাচন কমিশন ভবনে গিয়ে গতকাল সকালে এ মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। দলের কয়েকজনের নাম প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় ছিল। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই রাষ্ট্রপতি প্রার্থী চূড়ান্ত করবেন।

গতকাল বিরোধী দলের প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর বিকাল নাগাদ সরকারি দলের নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই মনোনয়ন পাচ্ছেন। দুটি মনোনয়নপত্র নেওয়া হলেও বিএনপির পক্ষ থেকে একাধিক প্রার্থীর পক্ষে জমা দেওয়া হবে না বলে জানা গেছে। ভুল-ত্রুটির বিষয়টি মাথায় রেখে একজন প্রার্থীর পক্ষেই দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হবে বলে ইতোমধ্যে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের প্রার্থী বহাল থাকলে আগামী ২০ আগস্ট ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হবেন দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এএমএম নাসির উদ্দিন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ‘নির্বাচনি কর্তা’র দায়িত্ব পালন করবেন।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী সংসদের অধিবেশন চলাকালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে ভোটগ্রহণের সাতদিন আগে স্পিকারকে জানাতে হবে। আর অধিবেশন বাদে অন্য সময় নির্বাচন হলে স্পিকারের সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচন কমিশন অন্যূন সাতদিন আগে গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে ভোটগ্রহণের দিনে সংসদ সদস্যদের বৈঠক আহ্বান করবেন। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতির অধিবেশন ডাকার প্রয়োজন পড়বে না।

রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হবেন। নির্বাচন কমিশনার (নির্বাচনি কর্তা) রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান পরিচালনা করবেন। তিনি নির্বাচনের জন্য অনুষ্ঠিত সংসদ সদস্যদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন।

৯১-এর পুনরাবৃত্তি

এর আগে দেশের ইতিহাসে একবার রাষ্ট্রপতি পদে ভোট অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে সংসদ সদস্যদের ভোটে দেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন আবদুর রহমান বিশ্বাস। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। ১৯৯১ সালের ৮ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে বিএনপি মনোনীত আবদুর রহমান বিশ্বাস পেয়েছিলেন ১৭২ ভোট। অপরদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বদরুল হায়দার চৌধুরী পেয়েছিলেন ৯২ ভোট।

এরপর সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় সব রাষ্ট্রপতিই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। অবশ্য তার আগে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থায় সরাসরি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট রাষ্ট্রপতি প্রার্থী ঘোষণা করলেও জয়ের সুযোগ নেই। কারণ, সংসদে ২৫০ আসন নিয়ে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে বিএনপি জোটের। ফলে তাদের সমর্থনের বাইরে কার্যত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ নেই। উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার ৩৪৯ জন।

বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগের পর ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) মো. হাফিজউদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম।

মির্জা ফখরুলই হচ্ছেন রাষ্ট্রপতি!

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না করলেও বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের বিভিন্ন সূত্র থেকে আভাস মিলেছে যে, দলের মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই ২৩তম রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন। নাটকীয় কিছু না ঘটলে তার মনোনয়ন ও পরবর্তী রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার বিষয়টি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনে নিরন্তর সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। চরম প্রতিকূল সময়ে হাল ধরে রেখেছিলেন দলের। ব্যাপক জেল-জুলুম, নিপীড়ন সয়েছেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ত্যাগের মূল্যায়ন ও পরীক্ষিত নেতা হিসেবে তার ওপর আস্থা রাখতে চাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। অবশ্য দলের আরেক শীর্ষ নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনকেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিবেচনায় রাখতে চাইছেন অনেকে।

এছাড়া দলের বাইরে থেকে পছন্দ করা হলে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামও আলোচনায় রয়েছে। অবশ্য গতকাল এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নের বিষয়ে তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ বা আলোচনা হয়নি বলে জানা গেছে। ফলে দলের বাইরে কারো বঙ্গভবনে যাওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পেলে দলীয় মহাসচিব পদ থেকে পদত্যাগ করবেন। সে ক্ষেত্রে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। আর এলজিআরডি মন্ত্রী হিসেবে নতুন মুখ দেখা যাবে।

রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল

আগামী ২০ আগস্ট ভোটগ্রহণের তারিখ রেখে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী আগ্রহী প্রার্থীরা ১৩ আগস্ট মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারবেন। ১৬ আগস্ট মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে এবং ১৮ আগস্ট প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন। এক প্রার্থী একাধিক মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেন; কিন্তু বাছাইয়ে একটিই চূড়ান্ত হবে। ভোট হবে ২০ আগস্ট সংসদ অধিবেশন কক্ষে।

ভোটারের হিসাব

নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন উপলক্ষে যে ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে ৩৪৯ ভোটার অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপিদলীয় ২৪৭ সংসদ সদস্য রয়েছেন। আর বিএনপির জোটসঙ্গী বা সমমনা দলে রয়েছেন আরো তিনজন। তারা হচ্ছেন গণসংহতি আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ ও বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) একজন করে সংসদ সদস্য। সব মিলিয়ে বিএনপির নেতৃত্বে রয়েছেন ২৫০ জন।

অন্যদিকে জামায়াতের নেতৃত্বে ১১ দলীয় জোটের সংসদ সদস্য ৯০ জন। এর মধ্যে জামায়াত দলীয় ৭৭ এবং এনসিপির আটজন। এছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের তিনজন, খেলাফত মজলিস ও জাগপার একজন করে সদস্য রয়েছেন। এর বাইরে রয়েছেন আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন সদস্য।

আইন অনুযায়ী ভোট দিতে হবে প্রকাশ্যে। দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দলের বিপক্ষে ভোট দিলে ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্যপদ হারাতে হবে।

সংবিধানে কী আছে

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন ও প্রার্থিতার যোগ্যতার বিষয়ে সংবিধানের ৪৮ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে। সেখানে ১ উপঅনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘বাংলাদেশের একজন রাষ্ট্রপতি থাকিবেন, যিনি আইন অনুযায়ী সংসদ-সদস্যগণ কর্তৃক নির্বাচিত হইবেন।’

যোগ্যতা প্রশ্নে ৪৮ (৪)-এ বলা হয়েছে, ‘কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হইবার যোগ্য হইবেন না, যদি তিনি (ক) পঁয়ত্রিশ বৎসরের কম বয়স্ক হন; অথবা (খ) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইবার যোগ্য না হন; অথবা (গ) কখনো এই সংবিধানের অধীন অভিশংসন দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদ হইতে অপসারিত হইয়া থাকেন। (৫) প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রীয় ও পররাষ্ট্রীয় নীতি সংক্রান্ত বিষয়াদি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত রাখিবেন এবং রাষ্ট্রপতি অনুরোধ করিলে যেকোনো বিষয় মন্ত্রিসভায় বিবেচনার জন্য পেশ করিবেন।’

ভোটের প্রস্তুতি ইসির

পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে এবারও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হবেÑএমনটি ধরে নিয়ে এগোচ্ছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে সংসদের বিরোধী দল জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করায় নড়েচড়ে বসেছে ইসি। এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটগ্রহণের প্রস্তুতি নিয়ে গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিনের নেতৃত্বে কমিশন অনির্ধারিত বৈঠক করে।

ইসি সূত্র বলছে, নির্বাচন কমিশনের চিন্তা ছিল বিগত নির্বাচনগুলোর ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রপতি পদে ভোটগ্রহণ পর্যন্ত অপেক্ষা করা লাগবে না। একক প্রার্থী হিসেবে সরকারি দল মনোনীত প্রার্থীই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হবেন, ওই চিন্তা থেকে ভোটগ্রহণের জন্য সেই অর্থে প্রস্তুতি নেওয়া হয়নি। কিন্তু বিরোধী দল প্রার্থী দেওয়ায় রাষ্ট্রপতি পদে ভোট নিয়ে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখন ভোটগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি শুরু করেছে ইসি।

গতকাল অনুষ্ঠিত অনির্ধারিত বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে ভোটকক্ষ প্রস্তুত, ব্যালট বাক্স তৈরি, ব্যালট পেপার প্রস্তুতসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এক্ষেত্রে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে একাধিক প্রার্থী থাকলে কমিশন ১৮ আগস্ট ব্যালট পেপার ছাপাবে। এ নির্বাচনের ভোটার মাত্র ৩৪৯ জন হওয়ায় ব্যালট পেপার ছাপাতে বেশি বেগ পেতে হবে না বলে মনে করছে ইসি। আইনানুযায়ী সংসদ কক্ষই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ভোটকক্ষ। নির্বাচনে সহায়তার জন্য নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা ছাড়াও সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সহায়তা নেওয়া হবে।

নির্বাচন কীভাবে হবে

রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী ভোটগ্রহণ করা হবে। রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন পরিচালনার বিধানকল্পে করা আইনটি ১৯৯১ সালের ১৮ আগস্ট পাস হয়।

ওই আইনের ‘ভোটগ্রহণ’ উপ-শিরোনামে ১০(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্রপতি সংসদ সদস্যগণের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হইবেন। (২) এই আইনের অধীনে কোনো নির্বাচনে প্রত্যেক সংসদ সদস্যের একটি মাত্র ভোট থাকিবে। (৩) ভোটগ্রহণের নিমিত্ত নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয়সংখ্যক ব্যালট পেপার প্রস্তুত করিবে। প্রত্যেকটি ব্যালট পেপারের দুটি অংশ থাকিবে, কাউন্টার ফয়েলে প্রত্যেক ভোটারের নাম ও বিভক্তি সংখ্যা মুদ্রিত থাকিবে এবং ভোটারের স্বাক্ষরের জন্য স্থান নির্ধারিত থাকিবে। প্রত্যেকটি ব্যালট পেপারের আউটার ফয়েলে প্রত্যেক ভোটারের বিভক্তি সংখ্যা এবং রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীদের নাম আদ্যাক্ষর অনুযায়ী ক্রমানুসারে সরলরেখার মধ্যে পৃথকভাবে মুদ্রিত থাকিবে এবং প্রত্যেক নামের বিপরীতে ভোটার কর্তৃক স্বাক্ষরের মাধ্যমে ভোট প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট স্থান থাকিবে।’

আইনের ১০(৪) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রত্যেক ভোটার তাহার জন্য নির্দ্দিষ্ট ব্যালটের কাউন্টার ফয়েলে নিজ নাম স্বাক্ষর করিয়া ব্যালট পেপার সংগ্রহ করিবেন। অতঃপর উহার আউটার ফয়েলে তিনি যে প্রার্থীকে ভোট প্রদান করিবেন তাহার নামের বিপরীতে নির্দিষ্ট স্থানে নিজের পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করিয়া ভোট প্রদান করিবেন এবং উহা সংরক্ষিত ব্যালট বাক্সের অভ্যন্তরে রাখিবেন। (৫) নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনবোধে সংসদ কক্ষের অভ্যন্তরে একাধিক ভোট কাউন্টার স্থাপন করিতে পারিবে।’

একই আইনের ১১(১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘ভোটগ্রহণ অন্তে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশনার প্রকাশ্যে ভোট গণনা করিবেন। (২) প্রার্থীগণের মধ্যে যিনি প্রদত্ত ভোটের মধ্যে সর্বোচ্চসংখ্যক ভোট পাইবেন, নির্বাচন কমিশনার তাহাকে নির্বাচিত বলিয়া ঘোষণা করিবেন। (৩) যদি প্রার্থীগণ সমানসংখ্যক ভোটপ্রাপ্ত হন, তাহা হইলে লটারির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করিবেন। (৪) রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণা চূড়ান্ত বলে গণ্য হইবে।’

বিরোধী জোট কেন প্রার্থী দিল

১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রেস ব্রিফিংয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান এলডিপি সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রমকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ঘোষণা করে বলেন, গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হিসেবে আমরা এটিকে (রাষ্ট্রপতি নির্বাচন) আমাদের দায়িত্ব হিসেবে নিয়েছি। আমরা মনে করি, সর্বক্ষেত্রে রাজনীতি স্বচ্ছ হওয়া উচিত, প্রতিযোগিতামূলক হওয়া উচিত। তাহলে গণতন্ত্রের গতি এবং তার সুস্বাস্থ্য ফিরে আসবে।

তিনি বলেন, আমাদের পক্ষ থেকে দেশের কল্যাণের জন্য আমাদের বিবেচনায় সর্বোত্তম ব্যক্তিকে এ দেশের রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দিয়েছি।

রাষ্ট্রপতি প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের প্রত্যাশা ছিল সরকার গণভোটের রায় মেনে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করবে। তাহলে সংস্কারকৃত সংবিধানের মাধ্যমে নতুনভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে পারব। কিন্তু এ সরকার গণভোটের গণরায়কে অস্বীকার করেছে এবং জুলাই সনদের বাস্তবায়নের কোনোকিছু কোনো ধারায়ই নেই। সংস্কার পরিষদের শপথ তারা নেয়নি, অধিবেশন ডাকেনি এবং নির্বাচন কমিশনসহ সব প্রতিষ্ঠানকে তারা দলীয়করণ করছে। এই সরকারও আসলে আগের স্বৈরতন্ত্রের পথে হাঁটছে।

তিনি বলেন, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করায় আমাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা থাকা সত্ত্বেও বিএনপির একদলীয় ও সংস্কারবিরোধী আচরণের কারণে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ সম্ভব হলো না। এটি দেশের মানুষ দেখছে। জনগণই এর বিচার করবে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, আমাদের কাছে মনে হয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বর্তমান সময়ের জন্য বাংলাদেশের সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। আমরা অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে এ আলোচনা করেছি। আলোচনায় বিএনপির নির্বাচন-পরবর্তী অবস্থান, গণভোটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি নিয়ে দ্বিচারিতাসহ অনেক বিষয় উঠে আসে।

সংসদে ভোটার হিসেবে কমসংখ্যক সংসদ সদস্য থাকা সত্ত্বেও প্রার্থী করার কারণ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নাহিদ ইসলাম বলেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি পরিবর্তন হলে আমরা এক হতে পারতাম। কিন্তু এখন তো আসলে তাদের যে আচরণ ও তারা যেভাবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে, সে জায়গায় আমাদের ঐকমত্য হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ সময় দেশের যে ধরনের অভিভাবকত্ব প্রয়োজন, তাতে আমরা মনে করি রাষ্ট্রপতি হিসেবে কর্নেল অলি আহমদ উপযুক্ত।

বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, আমরা অত্যন্ত আনন্দিত যে, প্রেসিডেন্ট পদের জন্য সবচেয়ে যোগ্য একজন ব্যক্তিকে আমরা মনোনয়ন দিতে পেরেছি। আমরা ১১ দলের পক্ষ থেকে সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ একাত্তরের রণাঙ্গনের বীর যোদ্ধা, বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, বর্তমান বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক যে চ্যালেঞ্জ, যে আধিপত্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে বাংলাদেশের চলমান লড়াই ও জুলাই বিপ্লবের যে চেতনা, একাত্তর থেকে চব্বিশ পর্যন্ত এই চেতনার একজন অখণ্ড, বলিষ্ঠ ধারক ও যোদ্ধাকে রাষ্ট্রপতি পদের জন্য প্রার্থী নির্বাচন করেছি।

কর্নেল অলির কৃতজ্ঞতা

প্রার্থী ঘোষণা করায় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে কর্নেল অলি আহমদ বলেন, সবাই মনে করেছেন আমি একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং পরীক্ষিত একজন লোক; যার বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ নেই, শিক্ষাগত যোগ্যতার কোনো অভিযোগ নেই। সুন্দরভাবে জীবনযাপন করেছি বিধায় সবাই সর্বসম্মতিক্রমে আমার নাম প্রস্তাব করেছেন। আমরা জাতিকে বলতে চাই, আমরা আমাদের জায়গা থেকে এ জাতির সঙ্গে কখনো বেঈমানি করব না ইনশাল্লাহ। মানুষের জন্য যেটা ভালো, আমরা হারব বা জিতব এটা প্রশ্ন না; প্রশ্নটা হচ্ছে আমরা জনগণের পাশে সবসময় তাদের স্বার্থরক্ষার জন্য দাঁড়াব।

কী আছে জুলাই সনদে

১১ দলীয় জোটের নেতারা প্রার্থী দেওয়ার ক্ষেত্রে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন না করে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। জুলাই সনদে ‘সংবিধান সংশোধনসাপেক্ষে সংস্কারের বিষয়সমূহ’-এর মধ্যে ১০ নম্বরে রয়েছে ‘রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি’। তাতে বলা হয়েছে, ‘সংবিধানে এরূপ যুক্ত করা হবে যে, বাংলাদেশে একজন রাষ্ট্রপতি থাকবেন, যিনি আইন অনুযায়ী আইনসভার উভয়কক্ষের (নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ) সদস্যদের গোপন ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংবিধানের অনুচ্ছেন ৪৮(৪)-এ বর্ণিত যোগ্যতাসমূহ এবং রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার সময় কোনো ব্যক্তি কোনো রাষ্ট্রীয়, সরকারি বা রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের পদে থাকতে পারবেন না।’ জুলাই সনদের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনসংক্রান্ত এই প্রস্তাবনায় বিএনপি, জামায়াতসহ ২৯টি রাজনৈতিক দল একমত হয়েছিল। নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছিল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন হওয়ার পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে দুই কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হতেন বলে আশা করেছিল বিরোধী জোট।

বিএনপির নির্বাচনি ইশতিহারে কী আছে

বিএনপির স্বাক্ষর করা জুলাই সনদে দুই কক্ষের সদস্যদের গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কথা থাকলেও নির্বাচনি ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতি সম্পর্কে খোলাসা করে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। ইশতেহারের ‘সংবিধান সংস্কার’ অধ্যায়ে বলা হয়েছে, ‘একজন উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃজন করা হবে এবং তিনি রাষ্ট্রপতির মতোই নির্বাচিত হবেন।’ রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার অঙ্গীকারও করা হয়েছে ইশতেহারে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন