বসবাসের জন্য একটু নির্মল পরিবেশ সবাই চায়। বিশ্বে এমন কিছু শহর আছে, যেখানে শুধু কাজ করা নয়; থাকা, চলা ও শ্বাস নেওয়াতেও যেন মেলে স্বস্তি। সেসব শহরে থাকার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। আবার কিছু শহর আছে, যেখানে প্রতিদিনের জীবনই একরকম লড়াই। জীবনের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নেই, যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ছড়ানো, ট্রাফিক আইনের তোয়াক্কা নেই, ওতপেতে থাকা কোনো দুষ্কৃতকারী হয়তো ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে জনসাধারণের মূল্যবান জিনিসপত্র।
এমন সব নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের কথা সামনে এলেই সবার মনে যে শহরের কথা চলে আসবে, সেটা হলো ঢাকা। কারণ, বাংলাদেশের রাজধানী শহরটি হলো বিশ্বে সবচেয়ে বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর একটি। বিশ্বে এর চেয়েও বসবাসের অযোগ্য দুটি শহর আছে। সেগুলো হলো যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলি এবং সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক।
প্রতিবছর বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকা প্রকাশ করে ব্রিটেনের প্রভাবশালী সাময়িকী ইকোনমিস্ট ইনটেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ)। লাইভেবিলিটি ইনডেক্সে র্যাংকিংয়ের ভিত্তিতে প্রকাশিত এ তালিকায় ১৭৩টি শহরের নাম থাকে।
ইআইইউ প্রকাশিত ২০২৬ সালের সবচেয়ে বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় টানা দ্বিতীয়বারের মতো শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন। তালিকার শীর্ষ দশে থাকা অন্য শহরগুলোর মধ্যে ক্রমানুসারে রয়েছে—অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, সিডনি ও অ্যাডিলেড, সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ও জেনেভা, জাপানের ওসাকা, কানাডার ভ্যাঙ্কুভার এবং জাপানের রাজধানী টোকিও।
এ শহরগুলো শীর্ষে স্থান পাওয়ার অন্যতম কারণ—উন্নত সাইকেলবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা ও শান্ত পরিবেশ, অসাধারণ গণপরিবহন, উন্নত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি, জীবনযাত্রা, চমৎকার খাদ্যাভ্যাস, প্রাকৃতিক পরিবেশ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক কাঠামো, আধুনিক অবকাঠামো, শক্তিশালী সমাজব্যবস্থা, অপরাধের নিম্নহার, দুর্যোগ মোকাবিলায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, সময়নিষ্ঠা ইত্যাদি।
এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যের কারণে ঢাকা তালিকার ১৭১ নম্বরে অবস্থান করছে। অর্থাৎ বিশ্বের সবচেয়ে বসবাস অযোগ্য শহরের তালিকায় তৃতীয়। অবশ্য ২০২৫ সালেও একই অবস্থানে ছিল শহরটি।
একটি শহর তখনই এগিয়ে যায়, যখন সেখানে মানুষ সময়মতো চিকিৎসা পায়, সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়াতে পারে, নিরাপদে চলাফেরা করতে পারে এবং নিত্য যানজট বা দূষণে ক্লান্ত না হয়; যেগুলোর বালাই নেই ঢাকা শহরে। বিপরীতে শীর্ষ শহরগুলো নাগরিকের জীবনকে শুধু টিকিয়ে রাখে না; বরং সহজ করে।
ইআইইউর লাইভেবিলিটি ইনডেক্স শহরগুলোকে স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো—পাঁচটি মূল সূচকে মূল্যায়ন করে। ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে শীর্ষে থাকা কোপেনহেগেনের স্কোর যেখানে ৯৮, সেখানে ১৭১তম স্থানে থাকা ঢাকার স্কোর ৪২। অর্থাৎ সামগ্রিক স্কোরে ঢাকা কোপেনহেগেনের চেয়ে ৫৬ পয়েন্ট পিছিয়ে।
পিছিয়ে থাকার পেছনে ঢাকার সবচেয়ে দুর্বল ক্ষেত্র হলো অবকাঠামো, যেখানে স্কোর মাত্র ২৭। এছাড়া স্থিতিশীলতায় ঢাকা পেয়েছে ৪৫, স্বাস্থ্যসেবায় ৪২, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৪১ এবং শিক্ষায় স্কোর ৬৭। পাঁচটির মধ্যে শিক্ষায় তুলনামূলক ভালো হলেও বাকি চারটি খাতে ঘাটতি থাকার কারণে মোট স্কোর অনেক নিচে নেমে গেছে।
অন্যদিকে স্থিতিশীলতা, অবকাঠামো, গণপরিবহন, নিরাপত্তা ও জনসেবার মান উচ্চ হওয়ায় কোপেনহেগেন শহর ধারাবাহিকভাবে শীর্ষে থাকে। স্থিতিশীলতা সূচকটি শহরের নিরাপত্তা, অপরাধ, সামাজিক ঝুঁকি ও জীবনযাপনের অনিশ্চয়তাকে বোঝায়। খাতটিতে কোপেনহেগেন পূর্ণ ১০০ পাওয়ায় এর থেকে ঢাকার পার্থক্য ৫৫ পয়েন্ট।
একই ভাবে স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় কোপেনহেগেন পূর্ণ স্কোর পাওয়ায় ঢাকা যথাক্রমে ৫৮ ও ৩৩ পয়েন্ট পিছিয়ে। শিক্ষায় ঢাকার অবস্থান তুলনামূলক ভালো হলেও এটি শহরটিকে উপরে তুলতে পারেনি। কারণ, বাসযোগ্যতা সামগ্রিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। অপরদিকে কোপেনহেগেনে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা শহরের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে, যা অভিবাসী, পরিবার ও কর্মজীবী মানুষের জন্য বড় সুবিধা। এ জায়গায়ই উন্নত শহর আর চাপের শহরের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়।
এছাড়া অবকাঠামো এবং সংস্কৃতি ও পরিবেশে কোপেনহেগেন পূর্ণ স্কোর ১০০ পাওয়ায় ঢাকা যথাক্রমে ৭৩ ও ৫৯ পয়েন্ট পিছিয়ে।
এই স্কোরই স্পষ্ট সংকেত দেয়, ঢাকার নগর অবকাঠামোয় কতবড় ঘাটতি আছে। এর মধ্যে রাস্তা, পরিবহন, নগর পরিকল্পনা, জনসংখ্যার ঘনত্ব, সেবার সমন্বয়হীনতা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এগুলোই শহরের প্রতিদিনের স্বস্তিকে প্রভাবিত করে। সংস্কৃতি ও পরিবেশগত দিক দিয়েও নিম্ন হওয়ার কারণ সাংস্কৃতিক সুযোগ, বিনোদন, পরিবেশের মান, সবুজায়ন, দূষণ এবং নগরজীবনের স্বাচ্ছন্দ্য প্রত্যাশার চেয়েও অনেক নিচে।
কোপেনহেগেনের ক্ষেত্রে উল্টো চিত্র। পরিকল্পিত নগরায়ণ, হাঁটার উপযোগী অবকাঠামো, সাইকেলবান্ধব রাস্তা এবং পরিবেশবান্ধব জীবনধারা শহরটিকে আলাদা করেছে।
ইআইইউর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এশিয়ার সামগ্রিক উন্নতি সত্ত্বেও এই সুফল ঢাকায় পৌঁছায়নি, আঞ্চলিক গড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। এশিয়ার গড় বাসযোগ্যতার স্কোর বেড়ে ৭৪ হলেও বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার স্কোর তার চেয়ে ৩২ পয়েন্ট কম।
গতবারের চেয়ে এবার এশিয়ার বেশ কয়েকটি শহরের সূচকে উন্নতি ঘটলেও ঢাকা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন তালিকাতেই আটকে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শহরের মতো কোনো যুদ্ধবিগ্রহের কারণে নয়; বরং দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতাই শহরটির এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী বলে সূচকে বলা হয়েছে।
বাসযোগ্য শহর হিসেবে ঢাকার আদৌ উন্নতি সম্ভব কি না—জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ শফি উল্লাহ বলেন, বাসযোগ্য শহরের যে ইনডেক্স, সেখানে ঢাকাকে অবশ্যই উপরে তুলে আনা সম্ভব। তবে সেজন্য আমাদের বেশকিছু জায়াগা মেরামত করতে হবে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ইস্যু বায়ুদূষণ রোধ করা। আমরা জানি বায়ুদূষণের দুটি উৎস—যানবাহন ও ময়লা-আবর্জনা।
তিনি বলেন, ফুটবল বিশ্বকাপে ইউরোপ-আমেরিকানরা ভালো করছে কেন? কারণ, ওদের রক্তের মধ্যে ফুটবল খেলা মিশে আছে। তেমনি আমাদের রক্তেও থাকতে হবে, শহরকে আমরা রক্ষা করব, নোংরা করব না। তাহলে আমাদের শহর বাসযোগ্য হয়ে যাবে। আরেকটি বিষয় হলো, আমরা প্রচুর অপচয় করি বা উচ্ছিষ্ট তৈরি করি। আমাদের সেটা কমিয়ে আনতে হবে। এটা শুধু বললে হবে না, মানুষের রক্তের মধ্যে এ ধারণাকে মিশিয়ে দিতে হবে। প্রয়োজনে এটাকে বাধ্য করাতে হবে। বাধ্য করানোর জন্য যে ফ্রেমওয়ার্কগুলো লাগবে, সেগুলোর উন্নতি করতে হবে এবং যথাযথভাবে কার্যকর নিশ্চিত করতে হবে। আর যে গাড়িগুলোর কারণে আমাদের বায়ুদূষণ হয়, সেগুলো বন্ধ করে দিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, পলিথিনের কারণে ডেনেজ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। আমাদের অভ্যাসগত কারণেই এটা হচ্ছে। আমাদের রক্তের মধ্যে শহরকে পরিষ্কার রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। শহর নিজের, এটা নিজেকেই পরিষ্কার রাখতে হবে। আপনার ব্যবহৃত টিস্যু আপনার পকেটেই থাকবে, নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া যেখানে সেখানে ফেলা যাবে না।
শহীদ মিনারের মতো স্থানেও একটি প্রোগ্রাম শেষে হাজার হাজার বস্তা ময়লা জমা হয়। এগুলো কারা করে? আমরাই করি। কিন্তু যেদিন দেখা যাবে, প্রোগ্রাম শেষে সেখানে এক টুকরা কাগজও নেই, তখনই আমরা বুঝব আমাদের শহর উন্নত হয়ে গেছে।
অধ্যাপক শফি উল্লাহ বলেন, কিছু কিছু প্রোগ্রামে উপস্থিত অংশগ্রহণকারীদের বলতে হবে, আমরা প্রোগ্রাম করব কিন্তু শেষে এখানে কোনো ময়লা-আবর্জনা থাকবে না। তখন অন্যরা শিখবে। এভাবে চললে শহর আস্তে আস্তে উন্নতি করবেই।
আইন প্রয়োগের ওপর জোর দিয়ে তিনি আরো বলেন, সবাইকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনার জন্য প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চেষ্টা করতে হবে। যেমন, আমাদের দেশে যত্রতত্র ময়লা ফেললে জরিমানার আইন প্রয়োগ হয় না। প্রয়োগ হয় না বলেই দূষণ হয়। যদি একটি কাঠামোর মধ্যে সবাইকে আনা যায় এবং কাঠামো অনুযায়ী আইনের প্রয়োগ হয়, দেখবেন মানুষের চরিত্র পরিবর্তন হচ্ছে। সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে বাসযোগ্য শহরের যে ইনডেক্স, সেটাও উন্নত হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন




