পার পেয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতের লুটেরা সিন্ডিকেট

এম আবদুল্লাহ

পার পেয়ে যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতের লুটেরা সিন্ডিকেট

দেশের বিদ্যুৎ খাতে লুটপাটে জড়িতরা পার পেয়ে যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের দুই বছর হতে চললেও কাউকেই শাস্তি কিংবা জবাবদিহির আওতায় আনা যায়নি। এ খাত থেকে বিদেশে পাচার হওয়া লাখো কোটি টাকা ফিরিয়ে আনার কার্যকর কোনো পদক্ষেপ এখনো দেখা যাচ্ছে না।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের দায়মুক্তি আইন বাতিল করে নতুন করে টেন্ডারবিহীন উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পথ বন্ধ করেছে, দেড় দশকের লুটপাটের চিত্র সামনে এনেছে। কিন্তু দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি। উল্টো সরকারকে জিম্মি করে বিদ্যুৎ খাতের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে আওয়ামী সিন্ডিকেট।

বিজ্ঞাপন

লুটেরাদের পকেটে এখনো যাচ্ছে বিদ্যুৎ খাতের বিপুল অর্থ। সে অর্থে দেশে-বিদেশে বিলাসী জীবন কাটাচ্ছেন তারা। আবার সরকারকে অস্থিতিশীল করার পেছনেও এসব অর্থ ব্যবহার হচ্ছে বলে তথ্য রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। কেউ কেউ বর্তমান সরকারের প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে লুটের ধারা অব্যাহত রাখতে সচেষ্ট রয়েছেন বলে জানা গেছে। আবার নানা ছলচাতুরি করে বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়ে সরকারকে চাপে ফেলছে। ফলে চলতি গ্রীষ্ম মৌসুম সামাল দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। ২৯ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে এখন সান্ধ্য পিক আওয়ারে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ১৪ হাজার মেগাওয়াট।

পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বহুসংখ্যক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অনুমোদন দেওয়া হয়। লুটপাট অবারিত করতে চাহিদার প্রায় দ্বিগুণ, ৩০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বিদ্যুৎ কেন্দ্র অনুমোদন দেয় অবৈধ সরকার। আর এসব কেন্দ্র বসিয়ে রেখে কোনো বিদ্যুৎ না পেয়েই ক্যাপাসিটি চার্জের নামে প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। এ বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় মাফিয়া ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট, শেখ পরিবারের সদস্য, আওয়ামী ঘরানার নব্য বিদ্যুৎ-ব্যবসায়ীচক্র এবং দলটির ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা। সুবিধা নেয় দুঃশাসনের সহযোগী দুর্বিনীত আমলাচক্রও। দেড় দশক এভাবে রাষ্ট্রের অর্থ লোপাটের কারণে বিদ্যুৎ খাত এখন খাদের কিনারায়। দিনে দিনে ব্যয় ও দায় বেড়েছে। আর বোঝা চেপেছে জনগণের ঘাড়ে। ভর্তুকি দিয়ে দেশের অর্থনীতি হয়েছে ফতুর। দফায় দফায় বেড়েছে বিদ্যুতের দাম। এখন আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের কমিটি করেছে বর্তমান বিএনপি সরকার। যে কোনো সময় মূল্য বৃদ্ধির ঘোষণা আসতে পারে।

বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার বিদ্যুৎ খাতের লুটেরাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের পথ খুঁজছে। সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় তার আইনি দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী। কুইক-রেন্টাল, রেন্টাল ও আইপিপি মালিকদের সঙ্গে করা চুক্তির কিছু ধারা লোপাটের অর্থ উদ্ধারের ক্ষেত্রে অন্তরায় হিসেবে দেখছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করীম। অসহায়ত্ব প্রকাশ করে ক্যাপাসিটি চার্জের ফাঁদ থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছেন না বলেও জানান তিনি।

জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ আমার দেশকে বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল সংকট পরিস্থিতি সামাল দিতে হওয়ায় অন্যান্য খাতের প্রতি এখনো খুব একটা নজর দেওয়া সম্ভব হয়নি। বিগত ১৫-১৬ বছরে বিদ্যুৎ খাতে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের নামে যে ভয়াবহ লুটের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল সে ব্যাপারে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায় তা আমরা অবশ্যই বিবেচনা করব। বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জের কবল থেকে এ খাতকে উদ্ধারের বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে এবং হবে। লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সম্ভব সব ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি। গত রোববার সংসদে প্রশ্নোত্তরেও মন্ত্রী বিদ্যুৎ খাতের পাচার করা অর্থ বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে সরকারের উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।

এখনো বিপুল অর্থ যাচ্ছে তাদের পকেটে

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ও পলায়নের পরও রেন্টাল ও আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উচ্চমূল্যের বিদ্যুতের বিপরীতে বিপুল অর্থ যাচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠদের পকেটে। আওয়ামী শাসন আমলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু, সামিট গ্রুপের আজিজ খান, ওরিয়ন গ্রুপের ওবায়দুল করীম, জাতীয় পার্টির আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজম পরিবার, আলাউদ্দিন চৌধুরী নাসিম, শামীম ওসমানরা বিদ্যুৎ খাতের অর্থে ফুলে-ফেঁপে দেশ-বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। নামে-বেনামে দলটির আরো বেশ কয়েকজন নেতা ও পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন এই তালিকায়।

এদের অনেকে দেশের বাইরে পালিয়ে থাকলেও তাদের মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো উচ্চমূল্যে সরকারের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি ও চুক্তি অনুযায়ী ক্যাপাসিটি চার্জ হিসেবে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অভ্যুত্থানের পর বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সামিট গ্রুপের ৫টি কোম্পানিকে সরকার পরিশোধ করেছে ৫ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বিদ্যুতের মূল্য যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে ক্যাপাসিটি চার্জও। এই পাঁচটি ছাড়াও সামিটের মালিকানা ও অংশীদারত্বে আরো চারটি কোম্পানিকে মোটা অংকের অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে। ওরিয়ন গ্রুপ ও মির্জা আজম পরিবারের অংশীদারত্বের কোম্পানি ডিজিটাল পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) সরকারের কাছ থেকে ২৯৮ কোটি ৬২ লাখ টাকা নিয়েছে। এ কোম্পানিতে ওরিয়ন গ্রুপের ওবায়দুল করীমের সঙ্গে মালিকানায় রয়েছেন মির্জা আজমের তিন ভাই মির্জা গোলাম রব্বানী, মির্জা গোলাম কিবরিয়া ও মির্জা জিল্লুর রহমান। মন্ত্রী হওয়ার কারণে মির্জা আজম তখন সরাসরি পরিচালক হননি।

শেখ হাসিনার সাবেক প্রটোকল অফিসার ও অবৈধ সংসদে ফেনী-১ আসনে আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য আলাউদ্দিন নাসিমের কোম্পানি ডাচ-বাংলা পাওয়ার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটস লি. সরকারের কাছ থেকে ক্যাপাসিটি চার্জ ও উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ দিয়ে আগের অর্থবছরে নিয়েছে ২৪১ কোটি টাকা। আলাউদ্দিন নাসিম কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। এ কোম্পানিতেও রয়েছেন ওরিয়ন গ্রুপের কর্ণধার ওবায়দুল করীম। অপর লুটেরা কোম্পানি ওরিয়ন পাওয়ার সোনারগাঁ লি.-এ ওবায়দুল করীমের পার্টনার হিসেবে আছে মির্জা আজম পরিবার ও নারায়ণগঞ্জের আলোচিত গডফাদার শামীম ওসমান। এ কোম্পানিকে অভ্যুত্থানের পর গত অর্থবছরে ৪৪১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা পরিশোধ করেছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। মির্জা আজম পরিবারের অংশীদারত্বে আরেকটি কোম্পানি ১০৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ওরিয়ন পাওয়ার রূপসা লি.। এই কোম্পানিকে বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সরকার পরিশোধ করেছে ৩৫১ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। তার আগের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটিকে ক্যাপাসিটি চার্জসহ পরিশোধ করা হয়েছিল ৪৮৩ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

পিডিবির অসহায়ত্ব

জরুরি সংকট মোকাবিলায় মাত্র এক বছর থেকে সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত মেয়াদের কথা বলে ২০০৯ সাল থেকে বিনা টেন্ডারে কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও বিদ্যুৎ কেনা শুরু হয়। কিন্তু ১৬ বছরের মাথায়ও অনেক কেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি বহাল রাখা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পিডিবি কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা গুটিয়ে নিতে সক্ষম হয়।

পিডিবির চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার রেজাউল করীম গত রোববার আমার দেশকে জানান, ড. ইউনূস সরকারের সময় ১০-১২টি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে। চাইলেই অন্য কোম্পানির চুক্তি বাতিল কিংবা ক্যাপাসিটি চার্জ থেকে বেরিয়ে আসা যাচ্ছে না। তারা দেশীয় কিংবা আন্তর্জাতিক আদালতে চলে গেলে জটিলতা বেড়ে যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এখনো ২১টি কুইক-রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে অস্বাভাবিক উচ্চ দরে বিদ্যুৎ নিচ্ছে পিডিবি। এছাড়া বিনা টেন্ডারের ৫৭টি আইপিপি ও এসআইপিপি থেকেও উচ্চ মূল্যের বিদ্যুৎ নিতে হচ্ছে সরকারকে। অভিযোগ রয়েছে, কেউ কেউ পুরোনো ও ভাঙাচোরা বিদ্যুৎ প্লান্ট বসিয়েও ক্যাপাসিটি চার্জ হাতিয়ে নিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার সময় মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল রাষ্ট্রীয় মালিকানায়। আর দলীয় লোকজনকে লুটের সুযোগ করে দিতে নির্বিচারে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করায় এখন পুরো খাতের নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে মাফিয়া গোষ্ঠীর হাতে। তারা চাইলেই গোটা দেশকে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিতে পারবে। বিদ্যুতের মতো সংবেদনশীল খাত এভাবে গোষ্ঠী বিশেষের হাতে জিম্মি হয়ে যাওয়া যেকোনো দেশের জন্যেই ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

লাইসেন্সে শর্ত ভঙ্গ

পিডিবির একটি প্রতিবেদন বলছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত কোনো বিদ্যুৎ না নিয়েই রেন্টাল ও আইপিপি কেন্দ্রগুলোকে প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। ক্রমাগতভাবে এ ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে। শুরু থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে যেখানে কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয় সাড়ে ৪৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সেখানে পরের ছয় বছরে অর্থাৎ ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিদ্যুৎ খাতের জন্য দেওয়া ভর্তুকির ৮০ শতাংশই ব্যয় হয় ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধে অর্থাৎ বসে থাকা বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর বিল খাতে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বিনা দরপত্রে ৩২টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দেয়। দরপত্র এড়াতে ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে দুই বছরের জন্য পাস করা হয় দায়মুক্তির জরুরি বিশেষ আইন। পরে আইনটির মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৬ সাল পর্যন্ত করা হয়। এ আইনের অধীনে ৭২টি রেন্টাল ও ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) কেন্দ্রের অনুমতি দেওয়া হয়। বিনা দরপত্রে প্রতিযোগিতা ছাড়াই এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের বড় অংশই পেয়েছেন তৎকালীন সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তি ও দলীয় প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে সামিট, ওরিয়ন, দেশ এনার্জি, ডরিন পাওয়ার, হোসাফ পাওয়ার, ইউনাইটেড ও এনার্জিপ্যাক অন্যতম।

জানা গেছে, রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় ব্যবহার করা হবেÑএমন শর্তে লাইসেন্স দেওয়া হলেও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো গড়ে চলেছে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ক্ষমতায়। অর্থাৎ এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রে বছরের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি, বরং অলস বসে ছিল। কিন্তু ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হয়েছে।

লুট ও পাচারে প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠরাও

বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জের নামে ১৫ বছর ধরে কয়েক বিলিয়ন ডলার দেশের বাইরে পাচারের তথ্য পেয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত একটি কমিটি। পুরো সময় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ কবজায় রেখেছিলেন। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা তৎকালীন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব, পিডিবি চেয়ারম্যানসহ বিদ্যুৎ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সিন্ডিকেট বেপরোয়া লুটে অংশ নেয়। এর মধ্যে পতিত প্রধানমন্ত্রীর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং তার ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ছিলেন লুটপাটের হোতা। আর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সামগ্রিক লুটপাট নিয়ন্ত্রণ সিন্ডিকেটের ‘গুরু’ হিসেবে কাজ করেছেন সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা (বর্তমানে কারাবন্দি) তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ ও আহমেদ কায়কাউস। এ সিন্ডিকেট বিশেষ আইনে, বিনা দরপত্রে প্রতিযোগিতা ছাড়াই তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ ও আওয়ামী লীগ সমর্থক ব্যবসায়ীদের রেন্টাল, কুইক-রেন্টাল ও আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সুবিধা দেয়। অথচ লুটেরা বেসরকারি কোম্পানিগুলো কেন্দ্র স্থাপনের জন্যে বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে যে অঙ্কের অর্থ ঋণ হিসেবে নিয়েছে তা দিয়ে সরকারই আরো অধিক উৎপাদন ক্ষমতার কেন্দ্র স্থাপন করতে পারত।

জরিমানার পরিবর্তে ক্যাপাসিটি চার্জ

একইভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে জরিমানার পরিবর্তে উল্টো কেন্দ্রের ভাড়া নিয়েছে বেসরকারি খাতের ফার্নেস তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। জানা গেছে, চুক্তি অনুসারে মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বছরে ১০ শতাংশ সময় নিজেরা বন্ধ রাখতে (আউটেজ) পারে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। তার মানে ১০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বছরে ৮৩৬ ঘণ্টা (৩৬.৫ দিন) বন্ধ রাখতে পারে। এর বাইরে বন্ধ রাখার সময় কেন্দ্র ভাড়া পাবে না; বরং জরিমানা দিতে হবে তাদের। কিন্তু শর্ত ভেঙে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রাখা হলেও ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করে যায় পিডিবি।

বিপিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, আত্মঘাতী চুক্তিগুলো করার সময় পিডিবিকে অন্ধকারে রাখা হয়েছে। ট্যারিফ নির্ধারণ কমিটিতে একজন সাধারণ সদস্য হিসেবে উপস্থিত থাকা ছাড়া চুক্তির কোনো প্রক্রিয়াতেই পিডিবির সংশ্লিষ্টতা রাখেনি তৎকালীন সরকার। অথচ দায় নিতে হচ্ছে তাদেরই। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া বিল এরই মধ্যে প্রায় ৫৬ হাজার কোটিতে উন্নীত হয়েছে। বকেয়া জমতে থাকায় ক্ষমতাধর মালিকদের কোম্পানিগুলো বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে মাঝে মাঝেই অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। এতে জিম্মি দশায় পড়ছে পিডিবি। কেন্দ্র বন্ধ রাখার সময় হিসাব না করেই বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছে পিডিবি। ২০২২ সালের জুলাই থেকেই এ ধরনের বিল পরিশোধ হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের অনুমোদন ছাড়াই বিপিডিবির বোর্ডে এ সিদ্ধান্ত অনুমোদন করে নেন তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান।

বিল নিয়েছে কিন্তু ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করেনি

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, দেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ব্যাংক ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৩১১ কোটি ২৬ লাখ টাকা। সরকারের কাছ থেকে বিল আদায় করে নিলেও ব্যাংকের দেনা পরিশোধ করেননি অধিকাংশ বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিক।

গ্যাস ও জ্বালানি তেলভিত্তিক আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ ও ফুয়েল পেমেন্ট বাবদ ১৭ হাজার ৩৫৭ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। এছাড়া যৌথ উদ্যোগে নির্মিত ও আইপিপি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লার মূল্য ও ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ১৫ হাজার ৪৫২ কোটি ৯১ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে বলেও জানান জ্বালানিমন্ত্রী।

বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উদ্যোক্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ বিক্রির বিপরীতে বকেয়া বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখন আর্থিক চাপে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পরিশোধ না হওয়ায় অনেক কোম্পানি ঋণ পরিশোধে ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতির কারণে অনেক প্রতিষ্ঠানের নতুন করে ব্যাংক ঋণ পাওয়ার সুযোগও সংকুচিত হয়ে গেছে। নিয়মিত অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় ব্যাংকগুলোও ঋণ ফেরত পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

বিদ্যুৎ খাতকে জিম্মি করা এবং ক্যাপাসিটি চার্জের নামে লুটপাট ও অর্থ পাচার সম্পর্কে বক্তব্য জানতে বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিপ্পা) সভাপতি ডেভিড হাসনাতের সেল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিসিভ করেননি। হোয়াটঅ্যাপ মেসেজে জানতে চাইলেও কোনো উত্তর দেননি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন