বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বৃহৎ আকারে ঋণ বিতরণ করে দেশের ব্যাংকিং খাতে যখন নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে, তখন বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোতে। উচ্চ সুদ আর প্রায় শতভাগ ঋণ আদায়ের সফলতায় দেশের শীর্ষস্থানীয় এনজিওগুলো এখন ধনী আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্তের (কিউমুলেটিভ সারপ্লাস) মাধ্যমে শীর্ষ এনজিওগুলোর তহবিলে জমা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এক সময় এসব এনজিও বিদেশি দাতাগোষ্ঠীর অনুদানে চললেও এখন ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে আর্থিক সক্ষমতা অর্জন করেছে।
একটি প্রতিষ্ঠানের অর্জিত মুনাফা থেকে যাবতীয় খরচ বাদ দেওয়ার পর যে অতিরিক্ত অর্থ বছরের পর বছর ধরে সঞ্চিত হয়ে বড় অঙ্কের তহবিল তৈরি হয়, তাকেই ‘ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত’ বলা হয়। তবে ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর (এমএফআই) নিয়ন্ত্রক সংস্থা মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির (এমআরএ) সংজ্ঞানুসারে ‘ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত’ হচ্ছে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের মোট উদ্বৃত্ত থেকে বিধি মোতাবেক সংরক্ষিত তহবিল গঠনের পর অবশিষ্ট থাকা উদ্বৃত্ত।
এমআরএ-এর সার্কুলার অনুযায়ী, এমএফআইগুলোকে উদ্বৃত্ত থেকে ১০ শতাংশ তহবিল সংরক্ষণ করতে হয়। এ হিসাবে মোট উদ্বৃত্তের ১০ শতাংশ বাদ দিয়ে যে পরিমাণ অর্থ জমা হচ্ছে, সেটাই হচ্ছে ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্ত।
এনজিওগুলোর আর্থিক প্রতিবেদন ও এমআরএ-এর তথ্যানুযায়ী, এই উদ্বৃত্ত তহবিলের শীর্ষে রয়েছে ‘আশা’। ২০২৫ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত তথ্যানুযায়ী, আশার উদ্বৃত্ত তহবিলের পরিমাণ ২৫ হাজার ৪১১ কোটি টাকা। ১৭ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ব্র্যাক। তালিকায় এর পরই রয়েছে ব্যুরো বাংলাদেশ ৩৮৭১ কোটি টাকা, টিএমএসএস ২৩১৬ কোটি টাকা, সোসাইটি ফর সোশ্যাল সার্ভিস (এসএসএস) ১৭১২ কোটি টাকা, জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন ১৪৮৭ কোটি টাকা এবং পল্লী মঙ্গল কর্মসূচি (পিএমকে) ১০৫৩ কোটি টাকা। এছাড়া সাজেদা ফাউন্ডেশন, সিদীপ, প্রত্যাশী, পদক্ষেপ ও ক্রিশ্চিয়ান সার্ভিস সোসাইটির মতো এনজিওগুলোর প্রত্যেকের হাতেই ৪০০ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত তহবিল রয়েছে ।
গ্রাহকদের মধ্যে ঋণ বিতরণের তথ্যে দেখা যায়, এ সময়ে সবচেয়ে বেশি ঋণ বিতরণ করেছে ব্র্যাক। তাদের বিতরণকৃত ঋণের পরিমাণ ৪৩ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি। ২৭ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ বিতরণ করে দ্বিতীয় স্থানে ছিল আশা। তৃতীয় স্থানে থাকা ব্যুরো বাংলাদেশের বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এদিকে ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে এনজিওগুলো ক্রমেই আর্থিকভাবে সুসংহত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হলেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ভাগ্য খুব বেশি পরিবর্তন হচ্ছে না বলেই মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফিন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মাহমুদ ওসমান ইমাম। তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে দরিদ্র জনগোষ্ঠী উপকৃত হচ্ছে। ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ মেটাচ্ছে, পারিবারিক অসুস্থতায় ব্যয় করছে কিংবা সংসারের কোনো ব্যয় মেটানোর জন্য তারা ঋণ নিচ্ছে। কিন্তু এর মাধ্যমে তাদের ভাগ্যের বড় ধরনের পরিবর্তন হচ্ছে না। তারা দরিদ্রই থেকে যাচ্ছে। ঋণ পরিশোধ করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিচ্ছে তারা। ফলে ঋণের একটা চক্রে আটকা পড়ে যাচ্ছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সাফল্য থাকলেও এর পরিমাণ খুবই নগণ্য। সার্বিকভাবে ক্ষুদ্রঋণ দরিদ্র মানুষকে আরো দরিদ্র হওয়া থেকে হয়তো রক্ষা করছে, কিন্তু তারা দরিদ্রই থেকে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, উদ্বৃত্ত তহবিলের বড় অংশই ফের ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমে ব্যবহার করে থাকে এমএফআইগুলো। এ তহবিল থেকে বিতরণকৃত ঋণের জন্য কোনো ধরনের সুদজনিত ব্যয় বহন করতে হয় না প্রতিষ্ঠানগুলোকে। কিন্তু ঋণগ্রহীতাদের কাছে সর্বোচ্চ ২৪ শতাংশ হার সুদেই ঋণ বিতরণ করে থাকে তারা। ফলে উদ্বৃত্ত তহবিল থেকে ঋণ বিতরণে বড় ধরনের মুনাফা অর্জন করছে ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। বাণিজ্যিক ব্যাংক, পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন থেকে প্রাপ্ত ঋণ কিংবা গ্রাহকের কাছ থেকে সংগৃহীত আমানত থেকে বিতরণকৃত ঋণে ৬-১০ শতাংশ সুদজনিত ব্যয় বহন করতে হয় তাদের।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঋণ আদায়ে এমএফআইগুলোর বড় ধরনের সাফল্য রয়েছে। এ খাতে ঋণ আদায়ের হার ৯৫-৯৭ শতাংশ। কোনো জামানত ছাড়াই ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে ঋণ আদায়ে এমন অভাবনীয় সাফল্য এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক ভিত্তি মজবুতের অন্যতম কারণ। এছাড়া অংশীদারত্বমূলক (শেয়ারহোল্ডার) বা মালিকানাভিত্তিক না হওয়ার কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনো ধরনের ডিভিডেন্ড বা লভ্যাংশ দিতে হয় না।
অপরদিকে আয়কর আইনে ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে এমএফআইগুলোর সুদ থেকে প্রাপ্ত আয়কে করমুক্ত রাখা হয়েছে। আয়কর আইন, ২০২৩-এর ষষ্ঠ তফসিল অনুযায়ী, ক্ষুদ্রঋণের সব ধরনের সার্ভিসও (ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতার পরিশোধিত যে কোনো আর্থিক চার্জ বা সুদ বা মুনাফার শেয়ার) কর অব্যাহতিপ্রাপ্ত। এর ফলে এনজিওগুলোকে কোনো ধরনের করপোরেট ট্যাক্স দিতে হয় না। শুধু ক্ষুদ্রঋণে যে অংশটুকু ব্যবহৃত হবে না, সে অংশের ওপর কর প্রযোজ্য। ফলে ক্ষুদ্রঋণে এনজিওগুলো বড় ধরনের কর সুবিধাও ভোগ করছে। কিন্তু ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উচ্চহারে করপোরেট কর পরিশোধ করতে হয়। তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করপোরেট করহার যথাক্রমে সাড়ে ৩৭ শতাংশ ও ৪০ শতাংশ।
এমএফআইগুলোর কর সুবিধা ও ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্তের বিষয়ে জানতে চাইলে কর বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসির পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া আমার দেশকে বলেন, ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থায়ন করা হয়। ব্যাংক বা অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এ ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। পাঁচ হাজার টাকা ঋণের জন্য তারা দ্বারে দ্বারে যাচ্ছে এ কারণে তাদের ব্যবস্থাপনা ব্যয়ও বেশি। ফলে ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে করপোরেট করের বাইরে রাখা হয়েছে। এখন যদি বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত জমা হয় তাহলে করারোপের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারে।
আয়কর আইনজীবী মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, ব্যাংকগুলো শতভাগ জামানত নিয়েও ঋণ আদায় করতে পারছে না। কিন্তু ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো জামানত ছাড়াই প্রায় শতভাগ ঋণ আদায় করতে পারছে। লুটপাটের কারণে ব্যাংকিং খাত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। কর সুবিধার কারণে ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিকভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে। এর ফলে তারা আরো বেশি মানুষকে ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করছে, যা আমাদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। এনজিওগুলোর উদ্বৃত্ত তহবিলের পরিমাণ যদি বিপুল পরিমাণে হয়ে যায় সে ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগের নতুনমাত্রা যোগ হবে এবং সরকার তা থেকে রাজস্ব আহরণ করতে পারবে।
ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান ব্যুরো বাংলাদেশ-এর নির্বাহী পরিচালক জাকির হোসেন আমার দেশকে বলেন, ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ আদায়ে খুবই তৎপর থাকায় এ খাতে খেলাপির পরিমাণ খুবই কম। এ খাতে সাফল্যের এটিই বড় কারণ। কিন্তু করোনার সময়ে ঋণ আদায় কার্যক্রম বন্ধ থাকা, অঞ্চলভেদে বন্যা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এ খাতেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের তুলনায় কিছুটা বাড়ছে। ফলে বিগত বছরের তুলনায় ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা হলেও সংকটে পড়েছে। বিগত বছরে যে পরিমাণ উদ্বৃত্ত হয়েছে, চলতি বছরে এর পরিমাণ কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেন তিনি।
ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের বিষয়ে তিনি বলেন, সাড়ে চার লাখ কোটি টাকার ক্ষুদ্রঋণের প্রায় আড়াই কোটি গ্রাহক রয়েছে। এ ঋণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ উপকৃত হচ্ছেন। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ বড় ধরনের ভূমিকা পালন করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ক্ষুদ্রঋণের বড় অংশই যাচ্ছে কৃষি খাত ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় । আবার ব্যক্তিগত চাহিদা ও পারিবারিক প্রয়োজন মেটানোসহ বিভিন্ন ধরনের স্কিম রয়েছে। তবে শুধু ঋণ নিলেই কারো ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে না। ঋণের ব্যবহার থেকে শুরু করে সবকিছুর জন্য সমন্বিত নীতি থাকা দরকার।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঋণ আদায়ে চরম ব্যর্থতার কারণে ব্যাংকিং খাতে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে। বিশেষ করে পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ১৬ বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাংকিং খাতকে লুটপাটের হাতিয়ার বানানো হয়েছিল। চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী এস আলমের হাতে তুলে দেওয়া হয় দেশের বেসরকারি খাতের শীর্ষ ইসলামী ব্যাংকসহ সাতটি ব্যাংক। এসব ব্যাংক থেকে কয়েক লাখ কোটি টাকা অর্থ তুলে নেয় এস আলমসহ তৎকালীন প্রভাবশালী গোষ্ঠী। যার একটি বড় অংশই দেশের বাইরে পাচার করা হয়। অপরদিকে বেনামি ও নামসর্বস্ব কোম্পানির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। বেনামি প্রতিষ্ঠানের নামে দেওয়া ঋণের মালিকানার কোনো খোঁজ না থাকায় সেগুলো উদ্ধারের কোনো সুযোগ নেই।
অপরদিকে ইচ্ছাকৃত খেলাপি কিংবা বাস্তবতার কারণে খেলাপি হওয়া ঋণ উদ্ধারে খুব বেশি সাফল্য দেখাতে পারছে না ব্যাংকগুলো। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়েই চলছে। গত মার্চের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ খেলাপির কারণে দুই লাখ কোটি টাকা মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে ২৪টি ব্যাংক। ৬৮-৯৭ শতাংশ খেলাপি ঋণের কারণে ইতোমধ্যে শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি ব্যাংকের (এক্সিম, গ্লোবাল, ইউনিয়ন, সোশ্যাল ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী) কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এগুলোকে একীভূতকরণের মাধ্যমে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। এ ব্যাংকটির মূলধনের পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ইক্যুয়িটি হিসেবে ২০ হাজার কোটি টাকা জোগান দিচ্ছে সরকার। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোর ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় দেশের বিনিয়োগসহ সার্বিক অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
অপরদিকে ঋণ আদায়ে বড় ধরনের সফলতার কারণে এনজিওগুলোর আর্থিক ভিত্তি মজবুত হচ্ছে। এ খাতে খেলাপি ঋণ মাত্র ৩-৫ শতাংশ। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে খেলাপি ঋণের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তার বিপরীতে সময়মতো ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ঋণদাতা এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোরও ঋণ আদায়ে রয়েছে নিবিড় তদারকি। প্রতি সপ্তাহে এনজিও কর্মীরা বাড়িতে গিয়ে ঋণের কিস্তি আদায়ে তাগাদা দিয়ে থাকেন। ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের অধিকাংশই দরিদ্র শ্রেণির এবং তাদের মধ্যে অন্যের টাকা মেরে দেওয়ার প্রবণতা খুবই কম। এছাড়া ঋণ পরিশোধ না করলে পরকালে তার হিসাব দিতে হবেÑ ধর্মীয় এমন বিশ্বাসের কারণেও সময়মতো ঋণ পরিশোধে এক ধরনের দায়বদ্ধতা কাজ করে। এসব কারণে ক্ষুদ্রঋণে খেলাপির পরিমাণ খুবই কম হয়ে থাকে।
এনজিওগুলোর কার্যক্রমের বিষয়ে এমআরএ’র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আমার দেশকে বলেন, ঋণ আদায়ে এনজিওগুলোর সফলতার হার প্রায় ৯৫ শতাংশ। গ্রাহক নির্বাচন থেকে শুরু করে ঋণ আদায়ে কঠোর নজরদারি ও তৎপরতার কারণে এ খাতে খেলাপি ঋণের হার খুবই কম। ব্যাংকের তুলনায় সুদের হার বেশি হলেও কোনো জামানত ছাড়াই ঋণ নিতে পারছেন গ্রাহকরা। গ্রামীণ অর্থনীতিতে ক্ষুদ্রঋণ বড় ভূমিকা পালন করছে।
এনজিওর ঋণ দেওয়ার বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালক আমার দেশকে বলেন, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ক্ষুদ্রঋণ ব্যবসায় এনজিওর ওপর নির্ভরশীল। এসএমই খাতে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণে লক্ষ্যমাত্রার বড় অংশই পূরণ হচ্ছে এনজিওর মাধ্যমে। কারণ এনজিওগুলোর রয়েছে দেশব্যাপী বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। এনজিওকে ঋণ দেওয়া বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য সহজ ও নিরাপদ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণে জর্জরিত হলেও এনজিওর দেওয়া কোনো ঋণই খেলাপি নয়।
গত ২০২৫ সালের ৩০ জুনের তথ্যানুযায়ী, এনজিওগুলোর হাতে সদস্যদের সঞ্চয়ের পরিমাণ প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট তহবিলের ৪০ শতাংশ। ক্রমপুঞ্জীভূত উদ্বৃত্তের পরিমাণ প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এটি মোট তহবিলের ৩৪ শতাংশের মতো। বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ২২ হাজার কোটি টাকা ও পিকেএসএফ থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১৩ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা।
উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ও নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রামের জোবরা গ্রামে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ক্ষুদ্র পরিসরে দরিদ্র গ্রামীণ নারীদের ঋণ দেওয়ার মাধ্যমে এই কার্যক্রমের গোড়াপত্তন করেন। ১৯৭৬ সালে এটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প বা অ্যাকশন রিসার্চ হিসেবে রূপ নেয় এবং পরবর্তী সময়ে ১৯৮৩ সালে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রামীণ ব্যাংক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তী সময়ে আশি ও নব্বইয়ের দশক থেকে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) হাত ধরে বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে প্রসার লাভ করে। বর্তমানে ৭০০টির মতো এনজিও ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


