জুলাই হত্যা মামলার আসামিকে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতির প্রস্তাব

জুলাই হত্যা মামলার আসামিকে প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে পদোন্নতির প্রস্তাব
ছাইদুর রহমান

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) প্রধান প্রকৌশলী পদে ওই প্রতিষ্ঠানের বঙ্গবন্ধু পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছাইদুর রহমানকে পদোন্নতি দেওয়ার প্রস্তাব তোলা হয়েছে। গত রোববার এ-সংক্রান্ত ফাইল সংস্থাটির চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া হয়। অনুমোদন মিললেই তিনি প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্ব নেবেন।

জানা গেছে, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পর্যন্ত সবকটি পদোন্নতি পাওয়া ছাইদুর রহমানকে প্রধান প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি দিতে যাচ্ছে বিএনপি সরকার। তার বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে মামলাও হয়। ওই মামলায় প্রধান আসামি সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।

বিজ্ঞাপন

২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগের তিন আমলের পুরো সময়ে ড্রেজিং বিভাগে থাকা এই কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিতে বিএনপিপন্থি রাজনীতিক ও কর্মকর্তারা ব্যাপক তদবির করছেন বলে জানা গেছে। ওই আমলে তিনি কয়েকটি মেগা প্রকল্পেরও পরিচালক ছিলেন। এমনকি তাকেসহ বঙ্গবন্ধু পরিষদের দুই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান নির্দেশনা দেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ ওই নির্দেশনা আমলে নেয়নি। এ ঘটনায় বিএনপিপন্থি কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। এ বিষয়ে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য নেওয়ার জন্য ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে প্রকৌশলী ছাইদুর রহমান যে জুলাই হত্যা মামলার আসামি এবং বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি পদে আছেন, সে বিষয়টি জানেন না নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব জাকারিয়া। তিনি আমার দেশকে বলেন, ছাইদুর রহমান যে জুলাই হত্যা মামলার আসামি, সেটা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে অভিযোগ এলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগপন্থি সংগঠন বঙ্গবন্ধু পরিষদের বিআইডব্লিউটিএ শাখার সহসভাপতি ছিলেন ছাইদুর রহমান। ওই সংগঠনের সভাপতি আব্দুল আউয়াল চাকরি থেকে অবসরে গেলে বঙ্গবন্ধু পরিষদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন ছাইদুর রহমান। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খান ও প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর ‘আস্থাভাজন’ এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন ও অর্থায়ন করতেন। এমনকি বিআইডব্লিউটিএতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল বঙ্গবন্ধু পরিষদের এই নেতার। জুলাই আন্দোলন বানচালে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে প্রকৌশলী ছাইদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, সামনে পদোন্নতি থাকায় আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, আমাকে জোর করে কমিটিতে রাখা হয়েছে। আমি কখনো এ কমিটির কোনো কর্মসূচিতে যাইনি। জুলাই হত্যা মামলায় আমি আসামি—এটা মিথ্যা।

বিআইডব্লিউটিএর সবচেয়ে দুর্নীতিপ্রবণ হিসেবে ড্রেজিং বিভাগ আলোচনায় রয়েছে। ২০১০ সালের ৫ জুলাই থেকে ২০২৫ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ড্রেজিং বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ছাইদুর রহমান। প্রতি তিন বছর পর বদলির নিয়ম থাকলেও সৌভাগ্যবান এই কর্মকর্তা বহাল তবিয়তে তার পদে ছিলেন।

দীর্ঘমেয়াদে একই বিভাগে থাকায় বাংলাদেশের শীর্ষ ড্রেজিংয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে তার বিশেষ সখ্য রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় তাকে ড্রেজিং বিভাগ থেকে সরিয়ে প্রকৌশল (পুর) বিভাগে বদলি করা হয়। এর আগে নিজ পদের অতিরিক্ত হিসেবে আইসিটি বিভাগের পরিচালকও ছিলেন। যদিও ওই পদটি তখন অনুমোদিত ছিল না।

যেভাবে উত্থান ছাইদুর রহমানের

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ওই বছরই নির্বাহী প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান ছাইদুর রহমান। ২০১০ সালে তাকে খুলনা থেকে ঢাকার ড্রেজিং বিভাগে বদলি করা হয়। একই বিভাগে টানা ১৬ বছর ছিলেন তিনি।

আওয়ামী লীগের প্রথম আমলে তিনি নির্বাহী প্রকৌশলী পদে থেকেই ১৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘মাদারীপুর, চরমুগুরিয়া, টেকেরহাট ও গোপালগঞ্জ নৌপথ খনন’ প্রকল্পের পরিচালক হন। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। এছাড়া তিনি এক হাজার ৯২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে অভ্যন্তরীণ নৌপথে ৫৩টি রুটে ক্যাপিটাল ড্রেজিং (১ম পর্যায়ে ২৪টি নৌপথ) প্রকল্পের পরিচালকও ছিলেন। বর্তমানে তিনি চার হাজার ৪০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তুলাই ও পুনর্ভবা নদীর নাব্য উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পের পরিচালক।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন