বাংলাদেশে গবেষণায় অসদাচরণ নিয়ে নতুন করে জাতীয় বিতর্ক শুরু হয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চৌর্যবৃত্তি, তথ্যগত অসংগতি, চিত্রবিকৃতি ও ডুপ্লিকেট প্রকাশনার কারণে আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে বাংলাদেশি গবেষকদের অন্তত ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হয়েছে। সংখ্যাটি উদ্বেগজনক এবং এ ধরনের অসদাচরণের বিরুদ্ধে কঠোর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
কিন্তু এ ঘটনাকে যদি শুধু কয়েকজন অসাধু গবেষকের গল্প হিসেবে দেখা হয়, তাহলে বড় সমস্যাটি আড়ালেই থেকে যাবে। সমাজবিজ্ঞান এখানে একটি কার্যকর দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে। ১৯৩০-এর দশকে রবার্ট মার্টন ‘অ্যানোমি’ (anomie) ধারণাটি ব্যাখ্যা করেছিলেন—একটি সমাজ যখন সবাইকে একই লক্ষ্যের (সাফল্য, মর্যাদা ও পদোন্নতি) দিকে ঠেলে দেয়, কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের বৈধ উপায় সবার জন্য নিশ্চিত করে না, তখন এক ধরনের সামাজিক চাপ বা ‘স্ট্রেইন’ তৈরি হয়। কেউ কেউ তখন ‘উদ্ভাবক’ (innovator) হয়ে ওঠেন—তারা লক্ষ্য অক্ষুণ্ণ রাখেন, কিন্তু শর্টকাট পথ খুঁজে নেন। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেন এর একটি পাঠ্যপুস্তক-উদাহরণ। লক্ষ্য (আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা) সবার ওপর সমানভাবে চাপানো হয়েছে, কিন্তু উপায় (অর্থায়ন, ল্যাব, সময় ও জনবল) সমানভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
লক্ষ্য ও অবকাঠামোর মধ্যে অসামঞ্জস্য
বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস ও নকশাগতভাবেই টিচিং বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ তাদের ক্রমেই বিচার করা হচ্ছে গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশনা মানদণ্ডে। সংগঠন-সমাজবিজ্ঞানী পল ডিমাজিও ও ওয়াল্টার পাওয়েল একে বলেছেন ‘প্রাতিষ্ঠানিক আইসোমরফিজম’ (institutional isomorphism)—প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই মর্যাদাবান প্রতিদ্বন্দ্বীদের দৃশ্যমান রূপ ও সূচক (র্যাংকিং, জার্নাল সংখ্যা, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর) গ্রহণ করে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রকৃত সক্ষমতা অর্জন না করেই। ফলে কাগজে-কলমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেখতে শুরু করে, বাস্তবে সেভাবে কাজ করার আগেই।
একটি প্রকৃত গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠে বছরের পর বছরের বিনিয়োগে—নিবেদিত গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাবরেটরি, গবেষণা সহকারী ও পোস্টডক্টরাল গবেষক, শক্তিশালী লাইব্রেরি, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং গভীর কাজের জন্য যথেষ্ট হালকা পাঠদান-দায়িত্বের ওপর। বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই মৌলিক শর্তগুলোর অনেকগুলোই এখনো অনুপস্থিত। বাস্তবে একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে পাঁচ-ছয়টি কোর্স পড়াতে হয়, পরীক্ষা নিতে হয়, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হয়, থিসিস তত্ত্বাবধান করতে হয়, আবার আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাও প্রকাশ করতে হয়। এটি ব্যক্তিগত শৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি প্রাতিষ্ঠানিক নকশার সমস্যা।
গবেষণা কেন করা হয়
সমাজবিজ্ঞানী র্যান্ডাল কলিন্স ‘ক্রেডেনশিয়ালিজম’ (credentialism) নিয়ে লিখেছেন—যেখানে সনদ ও প্রকাশনার সংখ্যা মর্যাদা ও পদোন্নতির মুদ্রায় পরিণত হয়, কখনো কখনো যে জ্ঞান তারা যাচাই করার কথা তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে। বাংলাদেশের একাডেমিক পদোন্নতি ব্যবস্থার সঙ্গে এই ধারণা সহজেই মিলে যায়, যেখানে গবেষণার সংখ্যা ও ‘স্বীকৃত’ বা উচ্চ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রকাশ প্রায়ই কাজের প্রকৃত মানের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সমাজবিজ্ঞানী মাইকেল পাওয়ারের বর্ণিত ‘অডিট কালচার’ (audit culture)—ব্যবসা থেকে হাসপাতাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এক বৈশ্বিক প্রবণতা, যেখানে প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয় গণনাযোগ্য, নিরীক্ষাযোগ্য সূচক দিয়ে, মানের কঠিন-পরিমাপযোগ্য বিচারের বদলে। প্রকাশনার সংখ্যা গণনা করা সহজ; মৌলিক অন্তর্দৃষ্টি নয়। ফলে সবাই একমত হলেও যে মানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত, বাস্তবে সংখ্যাই জিতে যায়।
এর অর্থ এই নয় যে প্রতিটি প্রত্যাহার জালিয়াতি, বা সীমিত বাজেটে কাজ করা, শিক্ষার্থীদের থিসিসের ওপর নির্ভর করা, কিংবা বৃহৎ আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় যুক্ত হওয়া—এসব স্বয়ংক্রিয়ভাবে অনৈতিক। কিন্তু এর অর্থ এই যে, যখন পুরস্কার ব্যবস্থা পরিমাণকে মূল্য দেয় আর সহায়তা ব্যবস্থা তা সততার সঙ্গে অর্জনের উপায় দেয় না, তখন কিছু গবেষক মার্টনের ‘উদ্ভাবক’ পথ বেছে নেবেন—লক্ষ রাখবেন, নিয়ম ভাঙবেন।
একটি অভিন্ন উত্তরাধিকার, একটি অভিন্ন সংকট
বাংলাদেশ একা নয়। ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইনের অনুসরণে বিশ্বব্যবস্থা তাত্ত্বিকরা (world-systems theory) বৈশ্বিক জ্ঞান উৎপাদনকে বর্ণনা করেন একটি ‘কেন্দ্র’ (core) ও ‘প্রান্ত’ (periphery) কাঠামোয়—কেন্দ্র নিয়ম ঠিক করে (মর্যাদাবান জার্নাল, সাইটেশন ডেটাবেস, র্যাংকিং, যা মূলত ধনী দেশভিত্তিক) আর প্রান্ত সেই নিয়মে বিচারিত হয় অথচ নিয়ম-নির্ধারণে তার সমান সম্পদ বা প্রভাব থাকে না। দক্ষিণ এশিয়ার অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ও ঔপনিবেশিক আমলের এমন কাঠামো উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল প্রশাসনিক ও পেশাজীবী জনবল তৈরি, মৌলিক জ্ঞান উৎপাদন নয়। এই উত্তরাধিকারের ওপর আজকের বৈশ্বিক র্যাংকিং ব্যবস্থা যুক্ত হলে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এক প্রকৃত সংকটে পড়ে—তাদের বড় পরিসরে পাঠদান করতে হয়, আবার অভিজাত গবেষণা কেন্দ্রের মতোই মূল্যায়িত হতে হয়।
এই দ্বন্দ্বই বিশ্বজুড়ে ‘Publish or Perish’ সংস্কৃতির প্রমাণিত কারণ এবং এটি ব্যাখ্যা করে কেন চৌর্যবৃত্তি, গিফট অথরশিপ, স্যালামি পাবলিকেশন, সাইটেশন কার্টেল ও প্রিডেটরি জার্নাল—এগুলো একসঙ্গে দেখা যায় অনেক উন্নয়নশীল একাডেমিক ব্যবস্থায়, শুধু বাংলাদেশে নয়। এগুলো ব্যক্তিগত নৈতিক ব্যর্থতার চেয়ে বেশি বিকৃত প্রণোদনার প্রতি অনুমানযোগ্য প্রতিক্রিয়া—স্ট্রেইন তত্ত্ব অনুযায়ী, যা মোটেও অপ্রত্যাশিত নয়।
তাহলে ৩২৫টি প্রত্যাহারকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় সেই প্রণোদনা কাঠামোর একটি সংকেত হিসেবে, বাংলাদেশি গবেষকদের নিয়ে কোনো রায় হিসেবে নয়। গবেষণার পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে তার সততা রক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা সমান তালে বাড়েনি। এটি একটি সমাধানযোগ্য সক্ষমতার ঘাটতি।
বাড়ছে প্রকাশনা, বাড়ছে প্রত্যাহার—একটি বৈশ্বিক প্রবণতা
গত এক দশকে ওপেন-অ্যাকসেস প্রকাশনা, ডিজিটাল ডেটাবেস ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার বিশ্বজুড়ে গবেষণা প্রকাশনার পরিমাণ দ্রুত বাড়িয়েছে, সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্ঞানের ভূরাজনীতি—যেখানে রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার মতোই প্রকাশনা ও র্যাংকিং নিয়ে প্রতিযোগিতা করে। সবচেয়ে বড় গবেষণা-উৎপাদক দেশগুলো—চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ অন্যান্য—বিপুল পরিমাণ গবেষণা প্রকাশ করে এবং সেই একই পরিমাণ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রত্যাহারও ঘটে। প্রকাশনার সংখ্যা কখনোই মানের নির্ভরযোগ্য সূচক ছিল না, কোথাও নয়। বাংলাদেশের নির্দিষ্ট চ্যালেঞ্জ হলো, সেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সাংখ্যিক মানদণ্ড অনুসরণ করা অথচ সেই প্রতিযোগিতা যে অবকাঠামো ধরে নেয়, তা এখনো গড়ে না তোলা।
একটি গঠনমূলক পথ
চৌর্যবৃত্তি ও গবেষণা অসদাচরণের প্রতি শূন্য সহনশীলতা অবশ্যই থাকতে হবে, কিন্তু শুধু শাস্তি ‘উদ্ভাবক’কে সামলায়, অ্যানোমিকে নয়। নিচের চারটি পরিবর্তন এই কাঠামোগত চাপ কমাতে পারে—
১. প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা স্পষ্টভাবে পৃথক করুন। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে পরিকল্পিতভাবে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে—প্রকৃত বাজেট, আধুনিক অবকাঠামো, পোস্টডক্টরাল পদ ও হালকা পাঠদান-দায়িত্বসহ। অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে শক্তিশালী টিচিং বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যেখানে পাঠদান, মেন্টরিং, কারিকুলাম উন্নয়ন ও সামাজিক সম্পৃক্ততা পদোন্নতিতে পূর্ণ গুরুত্ব পাবে—নিম্নমানের বিকল্প হিসেবে নয়, সমান মর্যাদার একটি বৈধ পথ হিসেবে।
২. পরিমাণ নয়, মান মূল্যায়ন করুন। কয়েকটি কঠোর, মৌলিক গবেষণা বহু সাধারণ প্রকাশনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত—পাওয়ারের অডিট-কালচারের সহজ-গণনার প্রবণতাকে প্রতিরোধ করে।
৩. প্রশিক্ষণ ও তদারকি অবকাঠামো গড়ুন। গবেষণা নৈতিকতা, পদ্ধতি, ওপেন সায়েন্স এবং একাডেমিক লেখালেখির ওপর বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ গবেষকদের মান পূরণে সহায়তা করবে, শুধু তাদের সেই মানে দায়বদ্ধ রাখার বদলে। কোনো একক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন, গবেষণা অসদাচরণ তদন্তের জন্য একটি স্বাধীন জাতীয় সংস্থা গঠন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।
৪. মূল্যায়নের পরিধি বিস্তৃত করুন। আন্তর্জাতিক র্যাংকিংয়ের পাশাপাশি, মূল্যায়নে বাংলাদেশের নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সমস্যা সমাধানে অবদান রাখা গবেষণাকেও কৃতিত্ব দিতে হবে—অর্থাৎ ‘লক্ষ্য’কেই এমনভাবে সরাতে হবে, যা ‘উপায়’ প্রকৃতপক্ষে সমর্থন করতে পারে।
শেষ কথা
৩২৫টি প্রত্যাহারের খবর গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া দরকার, কিন্তু এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যর্থতার গল্প নয়—এটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের কাঠামোগত ঘাটতি এবং প্রায় এক শতাব্দী ধরে সমাজবিজ্ঞান যে চাপের কথা বলে আসছে, তারই প্রতিফলন। গবেষণার সততা রক্ষায় ব্যক্তির জবাবদিহি জরুরি, কিন্তু সমান জরুরি লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, মূল্যায়ন ব্যবস্থা ও বিনিয়োগ। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সংস্কার শুরু হওয়া উচিত ব্যক্তি দিয়ে নয়, প্রতিষ্ঠান দিয়ে; প্রকাশনার সংখ্যা দিয়ে নয়, জ্ঞান উৎপাদনের মান দিয়ে; এবং ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার বা বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ের অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতাভিত্তিক একটি উচ্চশিক্ষা দর্শনের মধ্য দিয়ে।
লেখক : শিক্ষক, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গ্র্যাজুয়েট স্টুডেন্ট ম্যাসাচুসেটস বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র
ইমেইল: shams.rehan@gstu.edu.bd
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



