বঙ্কিমীয় প্রগতির মোর্চা, চর্চা ও মজদুররা

বঙ্কিমীয় প্রগতির মোর্চা, চর্চা ও মজদুররা

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে রাজনীতির শতাব্দী পুরোনো যে বাইনারি; প্রগতিশীল ও রক্ষণশীল; জেন-জিÑসেখান থেকে মুক্ত একটা মধ্যপন্থি রাজনৈতিক ধারা চর্চা করে।

বিজ্ঞাপন

আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন-জি প্রজন্ম যেদিন প্রথম ফিলিস্তিন ইসরাইলি গণহত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ শুরু করে; ওইদিন জায়নিস্টদের তৈরি করা লিবারেলিজমের মিথ ভেঙে যায়। কারণ জায়নিস্ট লবিগুলো আমেরিকার মিডিয়া, চলচ্চিত্র, একাডেমিক ও কালচারাল এরিয়াগুলো দখল করে লিবারেলিজমের মালিকানা দাবি করেছিল। আর ফিলিস্তিনকে এঁকে দিয়েছিল কনজারভেটিভ জনবসতি হিসেবে। ফলে ফিলিস্তিন গণহত্যার ব্যাপারে অনুশীলিত নির্লিপ্ততা অবলম্বন করত আমেরিকার কথিত লিবারেলরা। জেন-জিরা যেহেতু এসব কৃত্রিম বিভাজন রেখা দিয়ে অন্যায় ও অবিচারের সম্মতি তৈরিকে প্রত্যাখ্যান করেছে; ফলে তারা কোনো ধরনের পূর্বসংস্কার না মেনে ফিলিস্তিনের নির্যাতিত মানুষের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।

ইসরাইল সমর্থক জায়নিস্টদের মতো করে ভারতের হিন্দুত্ববাদী চিন্তা একইভাবে নিজেদের লিবারেল দাবি করে মুসলমান জনগোষ্ঠীকে কনজারভেটিভ বলে দাগিয়ে দিয়েছে। ভারতের মিডিয়া-চলচ্চিত্র-একাডেমিক ও কালচারাল এরিয়াগুলো দখল করে গুজরাট ও কাশ্মীরে মুসলিম গণহত্যার সম্মতি তৈরি করা হয়েছে। সম্প্রতি ককরোচ জনতা পার্টি নামের জেন-জি ও জেন-আলফারা হিন্দুত্ববাদের ওই ন্যারেটিভ চ্যালেঞ্জ করেছে। আশার কথা, সোনম ওয়াংচুক, অরুন্ধতী রায়, নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমীর মতো মুক্ত বুদ্ধিজীবীদের সমর্থন পেয়েছে তারা। গদি মিডিয়ার বিপরীতে ভেটেরান সাংবাদিক করণ থাপার, রাবিশ কুমার কাজ করেছেন নতুন প্রজন্মের কণ্ঠকে ইউটিউব দর্শকদের কাছে পৌঁছে দিতে। ধ্রুব রাঠি ও দেশভক্ত তো দীর্ঘদিন ধরে ইউটিউবে নতুন কণ্ঠস্বর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।

বাংলাদেশের জেন-জিরা ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে হিন্দুত্ববাদীদের মুসলমান সমাজকে কনজারভেটিভ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার ন্যারেটিভ ভেঙে দিয়ে সমাজের সব গোত্র-পেশার মানুষকে এক জায়গায় করে। কিন্তু ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পতিত ফ্যাসিস্ট দিল্লি পালিয়ে যাওয়ার পর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় হিন্দুত্ববাদ নিজেকে প্রগতিশীল দাবি করে ক্রমাগত জুলাই তারুণ্যকে কনজারভেটিভ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। হিন্দুত্ববাদের যেসব মজদুর স্বঘোষিত প্রগতিশীল পরিচয়ে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে খাচ্ছে, তারা জুলাইয়ের তারুণ্যের মধ্য থেকে কয়েকজন তরুণ-তরুণীকে আলাদা করে কোলে তুলে নিয়ে বলে, ‘এই তো আমাদের লক্ষ্মী ছেলেমেয়ে’; আর বাকিদের ইসলামপন্থি হিসেবে দাগিয়ে দেয়।

জায়নিস্টদের হলোকাস্ট মেমোরি পলিটিকস দিয়ে ফিলিস্তিন গণহত্যা জাস্টিফাই করার মতো করে একাত্তরের গণহত্যার মেমোরি পলিটিকস দিয়ে তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের হাতে ২০০৯-২৪ (৫ আগস্ট সকাল) পর্যন্ত সংঘটিত গণহত্যার জাস্টিফিকেশন করতে শুরু করে ইন্ডিয়ার গোদি মিডিয়া, বাংলাদেশের মোদি প্রভাবিত মিডিয়া। জেন-জিদের রাজাকার তকমা দিয়ে হাসিনা বিদায় নিলেও; তার গণহত্যার সমর্থকরা জুলাই তারুণ্যকে ক্রমাগত রাজাকার তকমা দিতে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধের যে অঙ্গীকার : সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার; তার একটিও পূরণের প্রতি স্বাধীনতার ৫৫ বছরে আওয়ামী লীগের কোনো সদিচ্ছা লক্ষ করা যায়নি। অথচ জুলাই তারুণ্য বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে। জুলাই বিপ্লবের তরুণ নেতা নাহিদ ইসলাম অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে বারবার।

কিন্তু যেহেতু জুলাই তারুণ্য পিলখানা হত্যাযজ্ঞের বিচার চেয়েছে যে হত্যাযজ্ঞে ভারতের মার্সিনারি কিলারদের অংশগ্রহণ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ হয়েছে; ফলে বাংলাদেশে ইন্ডিয়ান মজদুরদের প্রতিদিনের দায়িত্ব জুলাই তারুণ্যের ছিদ্রান্বেষণ। যেহেতু জুলাই তারুণ্য শাপলা হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়েছে; ফলে বাংলাদেশের হিন্দুত্ববাদী মিডিয়া তাদের প্রতিদিন ইসলামপন্থি হিসেবে দাগিয়ে দিতে প্রতিদিন সক্রিয় থেকেছে।

আমেরিকার ও ইন্ডিয়ার জেন-জিদের আন্দোলনের সুবিধা হচ্ছে; সেখানে অন্য কোনো দেশের কালচারাল কলোনি নেই। কিন্তু বাংলাদেশের জেন-জিদের বাস্তবতা হচ্ছে এখানে ইন্ডিয়ান কালচারাল কলোনি আছে। যে কলোনিতে ইসলাম ধর্মকে নিয়ে হাসাহাসি না করলে, দাড়ি-টুপি নিয়ে সাম্প্রদায়িক ঘৃণামূলক কার্টুন না আঁকলে, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারদের ভঙ্গিতে অন্যদের ‘ইতর’ বলে গালি না দিলে প্রগতিশীল হওয়া যায় না।

প্রগতিশীল হতে গেলে দাড়ি-টুপি পরা লোকের সেক্স স্ক্যান্ডাল নিয়ে ঘন ঘন ফেসবুক স্ট্যাটাস দিতে হবে। কিন্তু ক্লিন শেভড লোকের সেক্স স্ক্যান্ডাল নিয়ে স্পিকটি নট থাকতে হবে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বেলচা’ নিয়ে ঘেমে নেয়ে একাকার হতে হবে। কিন্তু হবিগঞ্জের পথে পথে বালুহীন ‘ট্রাকে’র প্রতিবন্ধক নিয়ে ‘চুপ চুপ চুপ অনামিকা চুপ গাইতে হবে’।

বিউটি রাণী পালের গানের সঙ্গে হেঁটে যাওয়া ভিডিও নিয়ে ট্রল হলে; সবাই মিলে বিউটি রাণী পালের মতো গানের সঙ্গে হেঁটে গিয়ে প্রতিবাদ করতে হবে। কিন্তু হবিগঞ্জে বিএনপির হামলায় আলিফ নামে তরুণ দৃষ্টিশক্তি হারানোর প্রতিবাদে জুলাই তরুণী নেত্রী সেখানে যাওয়ার পথে পুরুষ পুলিশের ধাক্কাধাক্কিতে পড়ে গেলে তা দেখে প্রণব মুখার্জির মতো মুখ টিপে হাসতে হবে।

সম্পন্ন মানুষের জনপদ পূর্ববঙ্গকে ব্রিটিশ আমলে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদাররা শোষণ ও নির্যাতনের মাধ্যমে দরিদ্র এবং উপায়হীন করে তুলে; এর ফলে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে এ জনপদের মানুষ। হিন্দুত্ববাদী সাহিত্যিক বঙ্কিমচন্দ্র পূর্ববঙ্গের মানুষকে ‘নিম্নবর্গ’ বলে তকমা দিলে; এখানে উচ্চবর্গ হওয়ার ইঁদুরদৌড় শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর অসাম্প্রদায়িক শব্দের মোড়কে হিন্দুত্ববাদী প্রগতিশীলতা অর্জনের চারু ও কারুপাঠ শুরু হলে; আজকে দৃশ্যমান কথিত প্রগতিশীল প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। আজও দেখবেন জুলাই তরুণদের সাব-অল্টার্ন বলে তকমা দিয়ে মফিজ আত্মপ্রকাশ করে বঙ্কিম হিসেবে।

কিছুই না; পলিট বুড়োর কথাবার্তা শুনে দু-চারখানা গ্রন্থ ও লেখকের নাম মুখস্থ করেছে; কণ্ঠশীলন করে এখনো ‘ছ’ উচ্চারণ বাগে আনতে পারেনি; রবীন্দ্রসংগীত শুনে মাথা দোলাতে শিখেছে; দৈনিক হিরোশিমার ঠাকুর বাড়িতে নেমন্তন্ন পেয়েছে, আর্ট ফিল্ম দেখে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে গাল চেপে ধরে আর্ট অ্যাপ্রিসিয়েশনের ভঙ্গিটা শিখেছে। অমনি সে লিবারেল কো হর্ট হিসেবে উচ্চবর্গ হয়ে গেছে।

এরা পরের প্রজন্মে চুইংগাম চিবিয়ে ‘বলতেসে’ ‘করতেসে’ বলা ছেলেমেয়ে পেলেই ‘এই তো আমাদের লক্ষ্মী ছেলেমেয়ে’ বলে তাকে ব্যাপ্টাইজ করে ভবিষ্যতের লিবারেল কো হর্ট বানাতে মরিয়া হয়ে ওঠে। আর দৈনিক হিরোশিমা ‘কালচারের পৈতে’ পরিয়ে দিলে তখন সেমিনারে আশ্চর্য শিশু হিসেবে নেমন্তন্ন পেতে থাকে তারা। এই আশ্চর্য শিশুরা বঙ্কিমীয় প্রগতিশীল বয়ান ফেসবুকে লেখা মাত্র মন্তব্যে এসে শিবব্রত দাদা ও ললিতাদি বলে; এই তো আমাদের মনের মতো শিশু; তোমাদের ভরসায় বেঁচে আছি; তোমরাই ‘সংস্কৃতি’কে রক্ষা করবে।

ব্রিটিশ আমলে অনেক জোড়াতালি দিয়ে কলকাতায় যে রকম একটা খেলনা অভিজাত শ্রেণি তৈরি করা হয়েছিল; বাংলাদেশ আমলে ঢাকায় তেমনি জোড়াতালি দিয়ে একটা ইমিটেশন অভিজাত শ্রেণি সৃজন করা হয়েছে। পশ্চিমা বিশ্বে যে রকম মানসিক সাম্যভিত্তিক সভ্যসমাজ ও কল্যাণরাষ্ট্র সৃজন করা গেছে; ওটা দক্ষিণ এশিয়ায় সম্ভব হয়নি এই উচ্চবর্গ সাজার জন্য লালায়িত ফাঁপা লোকজনের কারণে। অন্যকে তুচ্ছ না করে কেউ উচ্চ হতে পারে না এই ব্যাকওয়ার্ড সমাজে। যেখানে মুখে সাম্য আদর্শ বহন করা অসংখ্য মফিজ অন্যদের নিম্নবর্গ বলে; অগণিত ফাতেমা অন্যকে ইতর বলে তুচ্ছ করে; সেখানে আভিজাত্য ও সভ্যতার আকাঙ্ক্ষা আসলে ইউটোপিয়া।

ব্রিটিশরা শিখিয়ে গিয়েছিল, দালালিই সাফল্যের জনক। সুতরাং পালা করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দালালি করে; ফ্যাসিজম তৈরি করাই এই ছদ্ম প্রগতিশীল মহলটির কাজ। বঙ্কিম নিম্নবর্গের তকমা দেওয়ার পর থেকে পড়িমরি করে বঙ্কিমীয় প্রগতির ঝুঁটি ধরে তফসিলির ঝুলে থাকাই প্রতাপশীল হিসেবে প্রচলিত এই ঘুরে দাঁড়াতে অসমর্থ সমাজটিতে।

হিন্দু ধর্মের কাস্ট সিস্টেমের চক্কর থেকে বেরিয়ে সাম্যচিন্তায় দীক্ষিত হতে না পারলে; সরকারের দালালি করে আপারকাস্টে উত্থিত হওয়ার লোভ এ সমাজ থেকে সরানো যাবে না। পুরোনো ব্যবস্থার কনজারভেটিভ ও লিবারেল বাইনারির জগদ্দল পাথর সরিয়ে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ন্যায়বিচার অর্জনে জুলাই তারুণ্যের নিরন্তর প্রচেষ্টার প্রতি শুভ প্রত্যাশা রইল।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন