কথায় আছে, কোনো বিপ্লবই বিফলে যায় না কিংবা বৃথা যায় না কোনো রক্তদান। তাই হয়তো সুভাষ বসু বলেছিলেন, ‘রক্ত দাও স্বাধীনতা দিচ্ছি’। আর সে কারণেই রাজপথে স্লোগান ওঠে, শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেব না। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ’২৪-এর জুলাই-আগস্টের রক্তাক্ত বিপ্লবও বৃথা যাওয়ার কথা নয়, যাবেও না। পৃথিবীর ইতিহাসে যতগুলো বিপ্লব ঘটেছে তাতে দেখা যাচ্ছে, বিপ্লব-উত্তর সমাজে ব্যাপক পরিবর্তন ও রূপান্তর ঘটে গেলেও তা আর পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। বাংলাদেশে সংঘটিত তরুণ সমাজের জুলাই বিপ্লবসহ বিভিন্ন দেশের বিপ্লব-উত্তর পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে সেটাই পরিলক্ষিত হয়। অর্থাৎ বিপ্লবের নেতারা ব্যর্থ হলেও মানুষ আর পুরোনো ধ্যান-ধারণায় ফিরে যেতে চায় না। সমাজে একটি আমূল পরিবর্তন ঘটে যায়। সেটা অতীতের রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিপ্লব হোক কিংবা পরবর্তীতে বা হাল আমলের ফ্যাসিবাদী শাসন কিংবা স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজের বিপ্লব হোক। এমনকি বিপ্লব-উত্তরকালে চরম অস্থিতিশীলতা কিংবা ক্ষমতার পরিবর্তন ঘটলেও পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ঘটনা আর দেখা যায় না।
তাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, কোনো বিপ্লবী কিংবা নির্দিষ্ট কোনো বিপ্লবী সরকার ব্যর্থ হতে পারে কিন্তু বিপ্লব সমাজের গভীরে যে পরিবর্তন এনে দেয়, তাকে আর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ইতিহাসবিদরা এ পরিস্থিতিকে সামাজিক ও রাজনৈতিক ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’ বলে অভিহিত করে থাকেন। কারণ, বিপ্লব মানুষের মনের ভেতর থেকে শাসকের অধিকার চিরস্থায়ী—এ অন্ধবিশ্বাস দূর করে দেয়। সাধারণ মানুষ যখন বুঝতে পারে, তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত কোনো ক্ষমতাকে উপড়ে ফেলতে পারে, তখন তাদের সে রাজনৈতিক সচেতনতা আর কখনো মুছে ফেলা যায় না।
তাই বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বিপ্লবের ফলে পুরোনো বন্দোবস্ত, সংঘবদ্ধ সুবিধাভোগী শ্রেণি এবং অনুগত বিভিন্ন বাহিনী সম্পূর্ণ ভেঙে যায়। পরে পুরোনো কোনো শক্তি বা নতুন কোনো স্বৈরাচার ফেরত এলেও তারা আর পুরোনো শাসন কাঠামো জোড়া লাগাতে পারে না। নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে তাকে খাপ খাইয়েই চলতে হয়।
তাই ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, বিশ্বের বড় বড় বিপ্লবের পর ক্ষমতার পরিবর্তন, তীব্র অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল। পুরোনো ব্যবস্থা পতনের পর নতুন শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে প্রতিটি দেশেই এক ধরনের অস্থিতিশীলতা ও রূপান্তরের ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছে। যেমন ১৭৮৯ সালে সংঘটিত ফরাসি বিপ্লবের কথাই ধরা যাক। ওই বিপ্লবের পর অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিপ্লবের প্রধান নেতা ম্যাক্সবিলিয়ান রোবসপিয়ার যে চরম রক্তক্ষয়ী ও ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন, তাতে তার পতন ঘটলেও ওই বিপ্লবের ফলে ফরাসি সমাজে সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার যে চেতনা মানুষের অন্তরের গভীরে প্রোথিত হয়েছিল, তার মৃত্যু কখনো ঘটেনি। বরং ওই সাম্য, মৈত্রী ও স্বাধীনতার বাণী বাকি ইউরোপের মানুষদের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল।
পরবর্তীতে দেখা গেল, রোবসপিয়ারের পতনের পর নেপোলিয়নের উত্থান ঘটে। আবার নেপোলিয়নের পতনের পর ১৮১৪ সালে আবার রাজতন্ত্র ফিরে আসে এবং অষ্টাদশ লুই সিংহাসনে বসেন। কিন্তু ১৮১৫ সালে নেপোলিয়ান নির্বাসন থেকে ফিরে এসে ক্ষমতা নেন এবং কিন্তু তিনি মাত্র ১০০ দিন ক্ষমতায় থাকতে পেরেছিলেন। কারণ, ওয়াটার লু যুদ্ধে পরাজিত হয়ে নেপোলিয়নের চিরবিদায় ঘটে। এরপর ফ্রান্সে আবার রাজতন্ত্র ফিরে আসে, তবে তার রূপ পরিবর্তন করে প্রতিষ্ঠিত হয় সাংবাদিক রাজতন্ত্র। কিন্তু সেটা হলেও ফ্রান্স আর কখনোই ফরাসি বিপ্লব-উত্তর সময়ে ফিরে যায়নি। বরং ১৮৪৮ সালে আরেকটি বিপ্লবের মাধ্যমে রাজতন্ত্রের চিরবিদায় ঘটে এবং দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানে উল্লেখ করতে হয়, ফ্রান্সে প্রথম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিপ্লবের পর ১৭৯২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। এরপর দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৭০ সালে এবং তা স্থায়ী ছিল ১৯৪০ সাল পর্যন্ত। আর চতুর্থ প্রজাতন্ত্রের স্থায়িত্ব ছিল ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত। এরপর জেনারেল চার্লস দ্য গল পঞ্চম প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে চলছে। আর এই প্রজাতন্ত্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ।
ঠিক একইভাবে ১৯৯২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়া আর সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ফিরে যায়নি। তবে সেখানে একটি বাজার অর্থনীতি ও কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে, যেটা পুঁজিবাদী কাঠামো ও শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এ ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে।
এমনকি বাংলাদেশে শেখ হাসিনা একটি ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করলেও তিনি আর তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান প্রতিষ্ঠিত সেই একদলীয় শাসনের ফিরে যেতে পারেননি। কারণ, সময় ও কালের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন করে যায়, যা আর পূর্বতন জায়গায় ফিরে যেতে পারে না। ঠিক একইভাবে বাংলাদেশে ’২৪-এর জুলাই-আগস্টে ছাত্র তথা তরুণ সমাজের নেতৃত্বে যে গণঅভ্যুত্থান বা বর্ষা বিপ্লব ঘটেছিল, সেক্ষেত্রেও ওই ঐতিহাসিক সত্যটি প্রযোজ্য। সে কারণে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বিপ্লবের পর রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার অদলবদল বা প্রাতিষ্ঠানিক চড়াই-উতরাই যাই হোক না কেন, ওই অভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লব বাংলাদেশের সমাজ ও তরুণ প্রজন্মের মনস্তত্ত্বে এমন কিছু স্থায়ী পরিবর্তন এনে দিয়েছে, যা কখনোই আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
তারা বলেন, প্রায় দেড় দশকের একটি একচ্ছত্র ও কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তরুণরা প্রমাণ করেছে, সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ একত্রিত হলে যেকোনো আপাতত স্থায়ী ক্ষমতার পতন ঘটানো সম্ভব। ভয়ের যে সংস্কৃতি সমাজে চেপে বসেছিল, তা চিরতরে ভেঙে গেছে। ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনা বা যেকোনো সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবের বিরুদ্ধে তরুণদের এই ভয়হীনতা একটি স্থায়ী সামাজিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।
আজ এটি প্রমাণিত সত্য যে, দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জেন-জি ও সাধারণ মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য একত্র হয়েছিল। এ ঘটনা দেশের গতানুগতিক রাজনৈতিক মেরূকরণকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। ভবিষ্যতে আবার কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে তরুণ সমাজ একইভাবে ঐক্যবদ্ধ শক্তি হিসেবে দাঁড়াবে না—এমন কথা নিশ্চিত করে বলা যায় না।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন



