নিউ ইয়র্ক টাইমসে জুলাই মাসে প্রকাশিত একটি চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের গোয়েন্দা সহযোগী (অ্যাসেট) হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে। তাদের লক্ষ্য ছিল, ইরানের শাসন ব্যবস্থার পরিবর্তন—অর্থাৎ ‘ইসলামিক রিপাবলিক’ পরবর্তী ইরানে তাকে ক্ষমতায় বসানো। অভিজ্ঞ অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের একটি দলের লেখা এই প্রতিবেদনে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে গোপন বৈঠক, মোসাদের তৎকালীন প্রধান ডেভিড বার্নিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ, গোপনে তাকে অর্থ প্রদান এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে বোমা হামলার শিকার নিজের বাসভবন থেকে আহমাদিনেজাদকে নাটকীয়ভাবে উদ্ধার করার মতো ঘটনার বিবরণ রয়েছে।
কিন্তু ঠিক এ পর্যায় থেকেই ঘটনাপ্রবাহ ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে পড়ে। অভিযোগ রয়েছে, আহমাদিনেজাদকে ইরানের ভেতরেই মোসাদের একটি গোপন সেফ হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু তিনি ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলেন এবং সেখান থেকে চলে যান। তিনি নিজেই পালিয়েছিলেন নাকি তাকে চলে যেতে দেওয়া হয়েছিল, তা ওই প্রতিবেদনে স্পষ্ট নয়। তবে যেভাবেই হোক, এ ঘটনা যে মোসাদের ইমেজ ক্ষুণ্ণ করেছে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
আহমাদিনেজাদকে নিয়ে তৈরি করা গল্পটি যতই আকর্ষণীয় শোনাক না কেন, গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে এতে অনেক অসংগতি ও অবিশ্বাস্য নানা বিষয় ধরা পড়ে। তাই এই প্রতিবেদন নিয়ে যে হইচই বা প্রচার হয়েছে, তার চেয়ে এটি অনেক বেশি চুলচেরা বিশ্লেষণের দাবি রাখে। যারা ইরানের জটিল ক্ষমতার কাঠামো সম্পর্কে জানেন, তারা বোঝেন যে প্রেসিডেন্ট সেখানে সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী কোনো কর্তৃপক্ষ নন। দেশটির সর্বোচ্চ নেতা (সুপ্রিম লিডার) এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) হাতেই মূল ক্ষমতা থাকে। মূলত তারাই দেশের সংবেদনশীল গোপন তথ্য এবং বিদেশে পরিচালিত কার্যক্রম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখে।
ইসরাইলের প্রকৃত উদ্দেশ্য যদি হতো ইরানের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে নিজেদের সহযোগী হিসেবে নিয়োগ করা, তবে সে ক্ষেত্রে আহমাদিনেজাদ নন, বরং দেশটির সর্বোচ্চ নেতার কোনো সহযোগী, সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের কোনো সদস্য কিংবা আইআরজিসির কোনো শীর্ষ কর্মকর্তাকেই মোসাদের বাছাই করার কথা এবং সেটাই স্বাভাবিক ও যুক্তিসংগত।
এই প্রতিবেদনের সবচেয়ে সন্দেহজনক দিকটি হলো ‘নিয়োগ প্রক্রিয়া’ শুরুর বিবরণ, যেখানে বলা হয়েছে, হাঙ্গেরি সরকারের এক কর্মকর্তা বুদাপেস্টের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের রেক্টরকে অনুরোধ করেছিলেন আহমাদিনেজাদকে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক একটি সম্মেলনে আমন্ত্রণ জানাতে। আর এই সম্মেলনের আড়ালেই মোসাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তার বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছিল।
কিন্তু ইসরাইলের সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারাই প্রকাশ্যে প্রতিবেদনের এই বিবরণের বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। দেশটির সেনাবাহিনীর অভিজাত ইউনিট ‘ইউনিট ৮২০০’-এর সাবেক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হানান গেফেন এ ঘটনার ক্রমধারা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তার মতে, কোনো টার্গেটের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য মোসাদের বর্তমান প্রধানের ব্যক্তিগতভাবে সেখানে যাওয়াটা হবে সংস্থার প্রচলিত কর্মপদ্ধতির চরম লঙ্ঘন। পেশাদার গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সাধারণত তাদের সংস্থার প্রধানকে এমন কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সাক্ষাতের ঝুঁকিতে ফেলেন না, যিনি নির্ভরযোগ্য নন এবং যার সঙ্গে যোগাযোগ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
অস্বাভাবিক দুর্বল আড়াল
বিশ্বজুড়ে গোয়েন্দা সংস্থা ও সাংবাদিকদের কড়া নজরদারিতে থাকা কোনো সাবেক প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য একটি জলবায়ু সম্মেলনকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা বেশ অদ্ভুত ও দুর্বল কৌশল। বিশেষ করে, যখন সেই গোপন কার্যক্রমটি ২০২৪ সাল থেকে চলছে বলে দাবি করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাছাড়া, ইসরাইলের সঙ্গে হাঙ্গেরি সরকারের সম্পর্ক যতই বন্ধুত্বপূর্ণ হোক না কেন, অন্য কোনো সরকারের সঙ্গে এই অভিযানের কোনো অংশ ভাগ করে নেওয়াটা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতো। এ ধরনের পদক্ষেপ অত্যন্ত সংবেদনশীল অভিযানে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকিই শুধু বাড়িয়ে দিত।
গোয়েন্দা কার্যক্রম বা কৌশলগত দিক থেকে আপত্তিগুলো বাদ দিলেও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরবর্তী পর্যায়ে ইরানের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রার্থী হিসেবে আহমাদিনেজাদের নাম বিবেচনা করাটাই ছিল অদ্ভুত। ইরানের সাবেক এই প্রেসিডেন্ট টানা আট বছর উচ্চকণ্ঠে হলোকস্ট বা ইহুদি নিধনযজ্ঞকে অস্বীকার করেছেন, ইসরাইলকে ধ্বংস করার আহ্বান জানিয়েছেন এবং পারমাণবিক কর্মসূচি জোরদারের পক্ষে কথা বলেছেন।
যেকোনো মানদণ্ডেই তিনি গত পঁচিশ বছরের মধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের সবচেয়ে বিতর্কিত ও অগ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন। তিনি সহজেই শনাক্তযোগ্য, পশ্চিমা বিশ্বের বড় অংশে নিন্দিত এবং ইরানের শাসকগোষ্ঠীর সবচেয়ে উগ্র ও কঠোর অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন। ইসরাইলি গোয়েন্দা পরিকল্পনাকারীরা যদি এমন কাউকে খুঁজতেন, যিনি শাসনব্যবস্থা পতনের পর ইরানিদের ঐক্যবদ্ধ, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন এবং ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে পারতেন, তবে আহমাদিনেজাদ হতেন সবচেয়ে অগ্রহণযোগ্য পছন্দগুলোর একটি।
ইরানের শাসকগোষ্ঠী তাকে একাধিকবার নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণা করেছে। সংস্কারপন্থিরাও তার জনতুষ্টিবাদী স্বৈরাচারী আচরণের কারণে এবং কট্টরপন্থিরা সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনির সমালোচনা করায় তাকে বিশ্বাস করত না। ক্ষমতা গ্রহণের জন্য কোনো স্বাভাবিক রাজনৈতিক ভিত্তি বা সমর্থনও তার ছিল না।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই পরিকল্পনাটিকে অবাস্তব মনে করতেন। তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন-পরবর্তী বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফল আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব নয়। তাদের সন্দেহের মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল পরিকল্পনার শেষ ধাপটি—অর্থাৎ আহমাদিনেজাদকে নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা। সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে দেখেছিলেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা করলে ইসরাইলের অবস্থান আরো খারাপ হতে পারে।
অভিযানটি যখন চলমান ছিল বলে বলা হচ্ছে, তখনই যদি ইসরাইলের নিজস্ব সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ এর চূড়ান্ত পরিণতিকে অবাস্তব বলে মনে করে থাকে, তবে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এর অর্থ হলো, বাইরের পর্যবেক্ষকদের উচিত এই পুরো পরিকল্পনার তথাকথিত কৌশলগত যৌক্তিকতা বিচার-বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা।
দীর্ঘদিনের অন্তর্নিহিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা
ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি দিকও এখানে লক্ষণীয়। বিশ্লেষকরা ইসরাইলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা এবং মোসাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং অক্টোবরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের আগের উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেছেন। এসব বিষয়ই হয়তো নির্ধারণ করছে, এ ঘটনাটি কীভাবে এবং কার মাধ্যমে জনসমক্ষে আসছে। এদিকে, আহমাদিনেজাদের কার্যালয় নিউ ইয়র্ক টাইমসে বর্ণিত পুরো ঘটনাটিই প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এই অভিযোগকে ‘হলিউড-সুলভ দাবি’ অভিহিত করেছে, যা আনুষ্ঠানিকভাবে খণ্ডন করারও যোগ্য নয়। তারা নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিরুদ্ধে বানোয়াট তথ্য প্রকাশের অভিযোগ এনেছে।
প্রতিবেদনটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন ও ইরানি কর্মকর্তাদের তথ্যের ওপর নির্ভরশীল, অথচ মোসাদ এ বিষয়ে মন্তব্যের জন্য সংবাদপত্রের অনুরোধে কোনো সাড়া দেয়নি। কোনো নথিপত্র, রেকর্ড বা নাম-পরিচয়সহ কোনো গোয়েন্দা কর্মকর্তার বক্তব্য এখানে নেই। এত বড় একটি ঘটনার ক্ষেত্রে, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছে একটি বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা পারমাণবিক সক্ষমতা-সম্পন্ন আঞ্চলিক প্রতিপক্ষের রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একজনকে বসানোর জন্য বছরের পর বছর ধরে অভিযান চালিয়েছে, সেখানে এর প্রমাণ বা ভিত্তি খুবই দুর্বল। প্রতিবেদনটি যাচাইযোগ্য প্রাথমিক তথ্যের পরিবর্তে শুধু বিভিন্ন বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
প্রতিবেদনে তথ্যের সামঞ্জস্য বা যৌক্তিকতা নিয়েও সমস্যা আছে। প্রতিবেদনটি সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল-ইরান সংঘাতের প্রায় সব উল্লেখযোগ্য ঘটনাকে একটি নাটকীয় বয়ানের সুতোয় গেঁথেছে, যেখানে খামেনির হত্যাকাণ্ড, আহমাদিনেজাদের বাসভবনে সুনির্দিষ্ট টার্গেটে হামলা, তাকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া, কুর্দিদের ব্যর্থ বিদ্রোহ এবং নিহত সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় আহমাদিনেজাদের রহস্যময় উপস্থিতি ও পরে কথিত গৃহবন্দিত্বে চলে যাওয়া।
সতর্কতার প্রয়োজনীয়তা
পাঠক এবং বিশেষ করে নীতিবিশ্লেষকদের জন্য ভালো হবে যদি তারা আহমাদিনেজাদ-সংক্রান্ত এ খবরটিকে একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে না দেখে বরং কৌতূহলোদ্দীপক কিন্তু অত্যন্ত বিতর্কিত একটি বয়ান হিসেবে বিবেচনা করেন। আহমাদিনেজাদকে খামেনির জানাজায় যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই সিদ্ধান্তটিই নিশ্চিত করে যে, ইরানি শাসকগোষ্ঠী তাকে খুব একটা বিপজ্জনক ব্যক্তি বলে মনে করে না।
মিডল ইস্ট আই অবলম্বনে
মোতালেব জামালী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


