ইলিশের আকাল

ইলিশের আকাল

জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদনে উদ্বেগজনক নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সরকারি জরিপ অনুযায়ী, টানা দুই অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন কমেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশঙ্কা, চলতি অর্থবছরে উৎপাদন আরো কমতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদীর নাব্য হ্রাস, পলি জমে ডুবোচর সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রতিকূল আবহাওয়া, প্লাস্টিক দূষণ, অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ আহরণ, জাটকা নিধন, ট্রলিং বোটের অনিয়ন্ত্রিত শিকার এবং নদী-সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাবে দেশের ইলিশ উৎপাদন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা সূত্রে এসব তথ্যের সত্যতা মিলেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কয়েক বছর ধরে ইলিশ উৎপাদনে স্থবিরতা থাকলেও সম্প্রতি তা স্পষ্টভাবে নিম্নমুখী হয়েছে। মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য সম্পদ জরিপ বিভাগের উপপরিচালক মনিষ কুমার মণ্ডল আমার দেশকে বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে মোট পাঁচ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৭ টন ইলিশ উৎপাদিত হয়েছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ২৮৮ টনে। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে উৎপাদন কমেছে প্রায় সাড়ে পাঁচ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

চলতি অর্থবছরের চূড়ান্ত হিসাব এখন পর্যন্ত প্রকাশ না হলেও মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক তথ্য বলছে, এবারের পরিস্থিতি আরো আশঙ্কাজনক। মৎস্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত ইলিশ উৎপাদন চার লাখ টনের কাছাকাছি, যা কোনোভাবেই আগের বছরের লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে পারবে না। কারণ এরপরই আবার ইলিশ নিধনে সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আষাঢ়-শ্রাবণের ভরা মৌসুমেও উপকূলীয় অঞ্চলের জেলেদের জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা পড়ছে না। বঙ্গোপসাগর থেকে মেঘনা, যমুনা ও তেঁতুলিয়াসহ বিভিন্ন নদীপথে একই চিত্র। মাছের সংকটের পাশাপাশি দাদন ও ঋণের চাপে বিপাকে পড়েছেন জেলেরা। ফলে উপকূলীয় অর্থনীতিতেও স্থবিরতা নেমে এসেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কার্যকর সংরক্ষণ ও কঠোর আইন প্রয়োগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। তাদের মতে, ইলিশের বর্তমান সংকট দীর্ঘায়িত হলে তা দেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য এবং জাতীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

গবেষণা অনুযায়ী, ইলিশের জীবনচক্র ও প্রজনন সম্পূর্ণভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নির্ভরশীল। ডিম ছাড়ার জন্য পূর্ণবয়স্ক ইলিশ গভীর সমুদ্র থেকে মিঠাপানির নদ-নদীতে আসে। দেশে এ ধরনের ছয়টি প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হলেও বর্তমানে এসব পথে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ মৎস্য বিভাগের পরিচালক ড. মোতালেব হোসেন আমার দেশকে বলেন, একটি পূর্ণবয়স্ক মা ইলিশ ২০ থেকে ২৫ লাখ পর্যন্ত ডিম ছাড়তে পারে। ইলিশের সহজাত বৈশিষ্ট্য হলো, যেখানে জন্ম হয়েছে বা পূর্বপুরুষেরা ডিম ছেড়েছে, সেখানেই ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করা। কিন্তু নদীর মোহনায় পলি জমে ডুবোচর সৃষ্টি হওয়ায় অনেক স্থানে পানির গভীরতা কমে গেছে। ফলে ইলিশ আগের মতো সহজে প্রজননস্থলে পৌঁছাতে পারছে না; অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্য হয়ে সমুদ্রে ফিরে যাচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, নদী ও মোহনায় প্লাস্টিক-পলিথিন দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শুধু প্রজননক্ষেত্রই নয়, ইলিশের প্রধান খাদ্য প্ল্যাঙ্কটনের উৎসও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আশ্বিনের পূর্ণিমাকে ঘিরে পরিচিত ‘ইলশা বৃষ্টি’ সময়মতো না হওয়াও ইলিশের প্রজননে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মনিষ কুমার মণ্ডল বলেন, পর্যাপ্ত বৃষ্টি ও নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকলে ইলিশের প্রজনন ব্যাহত হয়। একই সঙ্গে নদীর সিলটেশন, অতিরিক্ত আহরণ, জাটকা নিধন, ডিমওয়ালা মাছ ধরা ও অবৈধ জালের ব্যবহার ইলিশের স্বাভাবিক জীবনচক্রকে বাধাগ্রস্ত করছে। সমুদ্রে বড় হওয়ার আগেই অনেক মাছ ধরা পড়ে যাচ্ছে।

গবেষকদের মতে, প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি মানবসৃষ্ট চাপও ইলিশের পপুলেশন ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ এবং ইলিশ গবেষক আনিছুর রহমান আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে বাজারে বড় ইলিশের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গিয়ে ছোট ইলিশ বা জাটকার আধিক্য দেখা যাচ্ছে, যা প্রজাতিটির অভিভাবকশূন্য বা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ার স্পষ্ট লক্ষণ।

উপকূলীয় জেলে ও আড়তদাররাও একই ধরনের সংকটের কথা জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, শিল্প ট্রলারের অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা, ছোট ফাঁসের জালের ব্যবহার এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত আহরণ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ফলে জেলে, ট্রলারমালিক ও ব্যবসায়ী—সবারই লোকসান বাড়ছে।

মানিকগঞ্জের জেলে মিজান আমার দেশকে বলেন, এবার সারা রাত জাল ফেলেও ১০ থেকে ২০টির বেশি ইলিশ পাচ্ছেন না তারা। অতিবৃষ্টির কারণে মাছ উজানে আসছে না। পাশাপাশি মৌসুমের বাইরে জাটকা নিধনেরও প্রভাব পড়েছে। বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার জেলে আলমগীর খলিফা অভিযোগ করে আমার দেশকে জানান, সমুদ্রে ট্রলিং বোটের অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরা সবচেয়ে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ট্রলারগুলো সমুদ্রতল ঘেঁষে অত্যন্ত ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার করে ডিমওয়ালা মাছ ও ছোট মাছ পর্যন্ত ধরে ফেলছে। ফলে ইলিশের প্রাকৃতিক পুনরুৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

ভোলার ইলিশের আড়তদার ইসমাইল আমার দেশকে বলেন, গত বছর যেখানে পাঁচ থেকে ১০ দিনে ৫০ থেকে ১০০ মণ মাছ পাওয়া যেত, এবার একই সময়ে পাঁচ মণ মাছও ওঠেনি। অথচ প্রতিটি ট্রলারের পেছনে ১০ লাখ টাকারও বেশি দাদনের দায় রয়েছে। মাছ না পাওয়ায় জেলে ও ট্রলারমালিক উভয়েই বড় ধরনের লোকসানে পড়েছেন।

এ প্রসঙ্গে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. তায়েফা আহমেদ আরো বলেন, জুন-জুলাইয়ে স্বাভাবিকভাবেই ইলিশের একটি অংশ সমুদ্রে অবস্থান করে বড় হয়। তাই এ সময় কিছুটা সংকট দেখা দেওয়া অস্বাভাবিক নয়। সামনের মৌসুমে পরিস্থিতি কেমন হয়, সেটি দেখার পরই চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা যাবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ব্যবস্থাপনার অতীত ও বর্তমান: বেগম জিয়া সরকারের উদ্যোগ

বাংলাদেশের মৎস্য খাতে ইলিশের গুরুত্ব অনুধাবন করে এর সুরক্ষায় কার্যকর আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা বলয় তৈরির ইতিহাস বেশ পুরোনো বলে জানিয়েছেন মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। কেউই নতুন করে বর্তমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পদক্ষেপ নেয়নি। ফলশ্রুতিতে ভরা মৌসুমেও ইলিশের আকাল দেখা দিয়েছে।

জানা যায়, ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ‘ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট অ্যাকশন প্ল্যান’ প্রণয়ন করেন। এই অ্যাকশন প্ল্যানের অধীনেই প্রজনন মৌসুমে নির্দিষ্ট সময় ইলিশ আহরণ নিষিদ্ধ, জাটকা সংরক্ষণ, অভয়াশ্রম ঘোষণা এবং ক্ষতিগ্রস্ত নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ভিজিএফ ও বিকল্প জীবিকার কর্মসূচি চালু করা হয়। পরবর্তী সরকারগুলোও মূলত সেই নীতিমালার ধারাবাহিকতায় সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

তবে ইলিশের বর্তমান সংকট কাটিয়ে উঠে দেশের এই রুপালি সম্পদকে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিতে গবেষক ও খাতসংশ্লিষ্টরা জরুরি ভিত্তিতে বেশ কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। এগুলো হচ্ছে—অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত শিল্প ট্রলিং বন্ধ করা, শিল্প ট্রলারের জন্য নির্ধারিত গভীরতার সীমা কঠোরভাবে নিশ্চিত করা, নদী ও মোহনার নাব্য ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় ড্রেজিং করা, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

ইলিশ প্রকল্পের সাবেক প্রকল্প পরিচালক মোল্লা এমদাদুল্লাহ আমার দেশকে বলেন, বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ট্রলিং বোট নিয়ন্ত্রণ। এসব ট্রলারের ৪০ মিটারের বেশি গভীরতায় মাছ ধরার কথা থাকলেও অনেক সময় তারা কম গভীরতায় চলে আসে। সেখানে ছোট মাছ ও জাটকা বেশি থাকায় বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, কয়েক বছর ধরে সমুদ্রে অতিরিক্ত আহরণ হচ্ছে। এটি নিয়ন্ত্রণ না করলে ভবিষ্যতে উৎপাদন আরো কমবে। সংরক্ষণ কার্যক্রমের সুফল আছে। তবে আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতা থাকলে, সেই সুফল টেকসই হয় না।

অন্যদিকে, ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমানের মতে, কেবল স্বল্পমেয়াদি সামাজিক কর্মসূচি দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ইলিশের জীববিজ্ঞান, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে সমন্বিত গবেষণার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন