জুলাই বিপ্লবের মামলার বিচার কোন পথে

আবু সুফিয়ান ও সাইদুর রহমান রুমী

জুলাই বিপ্লবের মামলার বিচার কোন পথে

জুলাই বিপ্লবে আবু সাঈদ হত্যা ও চানখাঁরপুল গণহত্যার মতো নৃশংস ঘটনার রায় ঘোষণা করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। তবে এসব যুগান্তকারী রায়ের সমান্তরালে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের জামিনে মুক্তি এবং সরকারের পক্ষ থেকে মামলা পুনঃযাচাইয়ের নির্দেশ বিচারপ্রক্রিয়ার চূড়ান্ত লক্ষ্য নিয়ে জনমনে সৃষ্টি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।

এই প্রেক্ষাপটে গত ২৬ এপ্রিল জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী বিশেষ দূত ড. অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস আমার দেশকে বলেন, জুলাই গণহত্যার বিচারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলামও গত ২২ এপ্রিল আমার দেশকে বলেন, ‘বিচার প্রক্রিয়া আমাদের কাছে অস্বচ্ছ মনে হচ্ছে। চিফ প্রসিকিউটর চেঞ্জ করে দেওয়া হয়েছে। কেন চেঞ্জ করা হয়েছে সেটা আমরা জানি না। নতুন চিফ প্রসিকিউটর এসেছেন এবং আমরা এরকম কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাইনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত পাঁচ মাসে চারটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় ঘোষণা করেছে। এতে ১৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে গত ১৬ মার্চ আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর ঘটনায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ছয় আসামির মৃত্যুদণ্ডের ৫৯১ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে।

তবে বিচারের এই গতির পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও মাঝারি সারির অনেক নেতা জামিনে মুক্ত হচ্ছেন। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিল করছেন এবং কারামুক্তির পর বিএনপি নেতাদের মাধ্যমে ফুল দিয়ে বরণের ঘটনাও ঘটছে। এই পরিস্থিতিকে ‘বিপ্লবের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে দেখছেন জুলাই যোদ্ধারা।

গত ফেব্রুয়ারিতে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল করে মো. আমিনুল ইসলামকে নতুন দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই পরিবর্তনকে ওহাইও ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং ইন্টারন্যাশনাল রিসার্চ স্কলার মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান নেতিবাচকভাবে দেখছেন। তিনি বলেন, ‘নতুন চিফ প্রসিকিউটরের মানবতাবিরোধী অপরাধের জটিল মামলা সামলানোর অভিজ্ঞতার অভাব উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের শাস্তি নিশ্চিতের পথে অন্তরায় হতে পারে।’

যদিও নতুন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সব আশঙ্কা নাকচ করে দিয়ে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বলেন, ‘বিচারাধীন এবং নিষ্পত্তি হওয়া সব মামলা আমি ব্যক্তিগতভাবে খতিয়ে দেখব। তদন্তে কোনো ফাঁক থাকলে তা সংশোধন করে জাতির প্রত্যাশা অনুযায়ী বিচার নিশ্চিত করা হবে।’

সংশয়ের মেঘ জমেছে যেভাবে

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে সব অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঘোষণা করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দায়ের হওয়া মামলাগুলো পুনরায় যাচাই-বাছাই করতে পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ঘোষণার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন।

পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ৫ আগস্টের পর দায়ের করা কিছু মামলায় সাধারণ ও নিরীহ মানুষকে ব্যক্তিগত সুবিধা চরিতার্থের জন্য আসামি করা হয়েছে। কিছু সুবিধাবাদী শ্রেণি এসব মামলা করেছে, যা সরকারের নজরে এসেছে। এসব মামলা যাচাই-বাছাই করে সঠিক তথ্য বের করার প্রক্রিয়া চালানো হবে।

গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তাজুল ইসলামের নিয়োগ বাতিল এবং নতুন চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলামের নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। নিয়োগ বাতিলের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ব্রিফিংয়ে তাজুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মনে করি, কোনো শঙ্কার কারণ নেই। এটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে চাইব বিচার প্রক্রিয়া চলমান থাকুক এবং বাংলাদেশে পুনরায় এ ধরনের অপরাধ যেন ফিরে না আসে।’ তাজুল ইসলামকে ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর চিফ প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার।

জুলাইযোদ্ধা ও ভুক্তভোগীদের প্রতিক্রিয়া

এসব বিষয়ে এনসিপির সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব এবং বর্তমানে গণবিপ্লবী উদ্যোগ-এর প্রতিনিধি আরিফ সোহেল আমার দেশকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের আমলে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়িত সামরিক এবং বেসামরিক অভিযুক্তদের বিচার বন্ধ হয়ে যাবে কিনা এই মুহূর্তে বোঝা যাচ্ছে না। মনে হয় না এটা একেবারেই বন্ধ হবে, তবে এটি ব্যাপকভাবে সীমিত হয়ে পড়বে। অভিযুক্তদের মধ্যে যারা বিএনপির সঙ্গে যুক্ত, তাদের বাঁচানোর চেষ্টা করা হতে পারে। অথবা যারা বিএনপির আনুকূল্য পেতে সক্ষম বা বিএনপির স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে, তাদের হয়তো রেহাই দেওয়া হবে। এর বাইরে যারা থাকবে, তাদের বিচার হয়তো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে হবে। সুতরাং, বিচার বন্ধ হবে না, তবে রাজনৈতিক প্রভাবে ন্যায়বিচার নাও হতে পারে।’

২০২০ সালে গুমের শিকার প্রকৌশলী মাসরুর আনোয়ার চৌধুরী বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘জুলাই গণহত্যা মামলায় অনেক আসামি জামিন পেয়ে যাচ্ছে। সরকারে থাকা কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগের অপরাধে নমনীয়তা দেখা যায়। জুলাইয়ে শহীদ হওয়া মানুষের রক্তের ক্ষতিপূরণ ছাড়া প্রহসনের বিচার মেনে নেওয়া যাবে না। যারা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল, তাদের সাক্ষী ও ভুক্তভোগীরা এখনো জীবিত। কোনো ফাঁকফোকর দেখিয়ে প্রকৃত অপরাধীদের ছাড় দেওয়া যাবে না।’

ফেসবুকে লেখালেখির দায়ে গুম হওয়া জিয়া সাইবার ফোর্সের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘মামলা পুনরায় যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নীতিগতভাবে অগ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গণহারে দায়ের হওয়া মামলায় নিরীহ মানুষ যেন ভুক্তভোগী না হন, তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’

মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা

গত পাঁচ মাসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চারটি মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রায় ঘোষণা করেছে। আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল হয়েছে ২৪টি মামলায়। এর মধ্যে ট্রাইব্যুনাল-১-এ ১৮টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২ এ ছয়টি মামলার অভিযোগ দাখিল হয়। বর্তমানে ২১টি মামলা বিচারাধীন।

চলমান মামলাগুলোতে আসামির সংখ্যা ৪৫৭। এর মধ্যে গ্রেপ্তার ১৬১ জন এবং পলাতক ২৯৩। এছাড়া জামিন পেয়েছেন একজন, মৃত্যুবরণ করেছেন একজন এবং খালাস পেয়েছেন একজন। গ্রেপ্তারদের মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-এমপি ও অন্যান্য সিভিলিয়ান ৭৪ জন, পুলিশ ৬৫ জন, সেনা ২০ জন এবং আনসার একজন।

ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, মামলা পুনঃযাচাই ও ট্রাইব্যুনালে রদবদল কি সত্যিই নিরীহ মানুষকে রক্ষার পদক্ষেপ, নাকি বৃহত্তর বিচার প্রক্রিয়ার ভেতরেই নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে?

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন