হোম > আমার দেশ স্পেশাল

অব্যবস্থাপনায় রোগীর ভোগান্তি চরমে

শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল

গোলাম মোস্তফা

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ছবি: সংগৃহীত

২০২১ সালের ২৭ মার্চ থেকে ২০২৬ সালের জুন। কেটে গেছে পাঁচ বছর দুই মাস। দীর্ঘ এ সময় ধরে নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একমাত্র এমআরআই মেশিন। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার কর্তৃপক্ষ মেরামত করার উদ্যোগ নিলেও অনুমোদন মেলেনি। ফলে পুরোপুরি অচল হতে বসেছে ১৮ কোটি টাকার এ যন্ত্রটি। এমন বাস্তবতায় সামর্থ্যবানরা বেশি খরচে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা করলেও সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন অসহায় ও স্বল্প আয়ের রোগীরা। তাদের কাছে জরুরি এমআরআই পরীক্ষা এখন ভোগান্তির নাম।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের এমআরআই (ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিং) যন্ত্র ছাড়াও সিটিস্ক্যান, এক্সরে, ডায়ালাইসিস মেশিন, আইসিইউ ভেন্টিলেটর, ফটোথেরাপিসহ ২০-২৫টির মতো যন্ত্রপাতি অচল হয়ে পড়ে আছে। এর মধ্যে অনেক যন্ত্রপাতির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিছু যন্ত্রপাতি ব্যবহার উপযোগী নয়, আবার কিছু সামান্য নষ্ট, যা ঠিক করে সচল করা যাবে। এছাড়াও হাসপাতালে ভিটামিন-ডি, অ্যালমুবিনসহ ৯৭টি পরীক্ষার কথা থাকলেও এক-তৃতীয়াংশ পরীক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। এজন্য অকেজো যন্ত্রপাতি ও লোকবল সংকটকে দায়ী করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিন দেখা গেছে, রাজধানীর এক হাজার ৩৫০ শয্যার সরকারি এ হাসপাতালটি সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রোগীতে উপচেপড়া ভিড়। টিকিট কাউন্টার, বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ এবং চিকিৎসক কক্ষের সামনে রোগীদের দীর্ঘ সারি। সময়মতো চিকিৎসকরা না আসায় চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম ধীরগতিতে চলছে। দীর্ঘসময় অপেক্ষা করে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে রোগী ও স্বজনদের। করিডোর, সড়ক ও ফ্লোরে বসে থাকতে দেখা গেছে রোগী ও স্বজনদের। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এ ভোগান্তি আরো তীব্র হয়। এছাড়া দালালের মাধ্যমে টাকা দিলে কাজ সহজে হয়ে যায়-এমন অভিযোগও করেন কেউ কেউ।

দেখা গেছে, হাসপাতালের ভেতরে সড়কের দুপাশে বিভিন্ন পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছে একাধিক অস্থায়ী দোকানি। এ অবস্থায় মুমূর্ষু রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘসময় আটকে পড়ে। ফলে জীবন বাঁচানোর আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মুমূর্ষু রোগীরা এখানে এসে পড়েন নতুন সংকটে।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, বহির্বিভাগে প্রতিদিন এক-দেড় হাজার মানুষ চিকিৎসা নিয়ে থাকেন। রোগীর সঙ্গে আসে প্রায় সমসংখ্যক অভিভাবক-স্বজন। নতুন রোগীর মধ্যে হাসপাতালটিতে গড়ে ৩২৩ জন ভর্তির সুযোগ পান। রোগী ভর্তি থাকেন প্রায় সাড়ে তিন হাজার। শয্যাগুলো সব সময় রোগীতে পূর্ণ থাকে। ২০ শয্যার আইসিইউতে একটি সিটের জন্য প্রতিদিন গড়ে ২০টি আবেদন জমা পড়ে।

রোগীদের অভিযোগ, টিকিট কাউন্টার, বহির্বিভাগ, এক্সরে, অস্ত্রোপচার, বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং রোগী ভর্তির সময়ে দীর্ঘক্ষণ সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয় তাদের। এতে কাঙ্ক্ষিত সেবাবঞ্চিত হন দূরদূরান্ত থেকে আসা রোগীরা। এছাড়াও নার্স, ওয়ার্ডবয়, আয়া, বুয়া এবং কর্মচারীদের দুর্ব্যবহার ও প্রতিনিয়ত হেনস্তার শিকার হচ্ছেন রোগী ও স্বজনরা। প্রতিদিনই এমন চিত্র দেখা যায়।

হাসপাতালের নিচতলায় রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, সকাল থেকেই রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে শত শত রোগী আসছেন। সিটিস্ক্যান, এক্সরে রুমের সামনে দীর্ঘলাইন। তাদের অনেকের জরুরি ভিত্তিতে এমআরআই পরীক্ষা করাতে হয়। কিন্তু যন্ত্রটি বিকল থাকার বিষয়টি তারা সেখানে এসেই জানতে পারছেন। ফলে বাইরে থেকেই অতিরিক্ত টাকা দিয়ে তাদের এমআরআই করতে হচ্ছে।

জানা গেছে, গুরুত্বপূর্ণ এ পরীক্ষাটি করতে ধরনভেদে সরকারিভাবে রোগীপ্রতি দুই হাজার থেকে চার হাজার টাকা লাগে। আর বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গুনতে হয় ছয় থেকে ১২ হাজার টাকা।

তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি নূর হোসেন। তার ছেলে নাজমুল হোসেন আমার দেশকে জানান, চিকিৎসকের প্রাথমিক ধারণা, বাবা স্ট্রোক করেছেন। এখন নিশ্চিত হতে এমআরআই টেস্ট দিয়েছেন। তারপর শুরু হবে চিকিৎসা, কিন্তু বাবাকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই। এ অবস্থায় অন্য জায়গায় যাওয়া ছাড়া উপায়ও নেই।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে এমআরআই মেশিনটি কেনা হলেও দেড় বছরের মাথায় বিকল হয়ে যায়। কয়েকবার মেরামত করে ব্যবহারের পর ২০২১ সালের ২৭ মার্চ যন্ত্রটি আবার বিকল হয়ে যায়। প্রতিষ্ঠানটি সরকারের বিধি মোতাবেক একটি কমিটির মাধ্যমে মেরামতের চেষ্টা করে এবং জাপানের মূল কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করে। শুরুতে যন্ত্রটি মেরামতের জন্য দুই কোটি টাকা খরচ হবে বললেও পরে পাঁচ কোটি টাকার কথা জানায়। তাতে অনুমোদন দেয়নি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ফলে পুরোপুরি অচল হয়ে যেতে বসেছে যন্ত্রটি। এছাড়াও এমআরআই মেশিন নষ্ট থাকায় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি রোগীদেরও চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

হাসপাতালের রেডিওলোজি বিভাগের ইনচার্জ (টেকনোলজিস্ট) মালেক শরীফ আমার দেশকে বলেন, এমআরআই মেশিন বেশ কয়েক বছর ধরে নষ্ট হয়ে আছে। মূলত যন্ত্রটির ম্যাগনেটিক ও হিলিয়াম নষ্ট হয়ে গেছে। তাই পরীক্ষা-নিরীক্ষা বন্ধ রয়েছে এবং রোগীরা ফেরত যাচ্ছেন।

নেফ্রোলজি বিভাগে কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিসের ৩১টি মেশিনের মধ্যে ২৬টি সচল রয়েছে বলে জানা গেছে। দৈনিক প্রতি শিফটে ২৫-৩০ জনের ডায়ালাইসিস হয়। এছাড়াও দীর্ঘ মেয়াদে ডায়ালাইসিস প্রয়োজন-এমন রোগীকে ফিস্টুলা (এক ধরনের অস্ত্রোপচার) করতে হয়। কিন্তু হাসপাতালে ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের পাশের কিডনি হাসপাতাল ও হৃদরোগ ইনস্টিটিউটসহ বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে।

হাসপাতালের সেবা নিতে আসা লিয়াকত আলী আমার দেশকে বলেন, ‘টিকেট কাটতে দুই ঘণ্টা, ডাক্তার দেখাতে তিন ঘণ্টা আর রক্ত টেস্টের পরীক্ষা করতে লাগে দুই ঘণ্টা। সব জায়গায় ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। আমরা গরিব মানুষ, প্রাইভেট হাসপাতালে গেলে বেশি টাকা লাগব, কিন্তু আমি এত টাকা পাব কই? তাই এখানে সেবা নিতে আমরা বাধ্য।’

দীর্ঘদিন এমআরআই মেশিন বন্ধ থাকার বিষয়ে হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. নন্দ দুলাল সাহা আমার দেশকে বলেন, ‘আমি এখানে জয়েন করার আগে থেকেই মেশিনটি নষ্ট। আমরা বারবার কর্তৃপক্ষকে মৌখিক ও লিখিতভাবে জানিয়েছি, কিন্তু ঠিক করতে খরচ খুব বেশি, তাই ঠিক করা যায়নি। এখন আমরা নতুন মেশিন কেনার জন্য আবেদন করেছি। আশা করি, দ্রুত ব্যবস্থা হয়ে যাবে।’

রোগীদের ভোগান্তির ব্যাপারে তিনি বলেন, এ হাসপাতাল মূলত ৭৫০ শয্যার। কিন্তু রোগী ভর্তি হচ্ছে এক হাজার ৩৫০ শয্যায়। সক্ষমতার তুলনায় রোগী কয়েকগুণ বেশি। ফলে রোগীদের ভোগান্তি হয়। তবুও আমরা সাধ্যমতো সেবা দেওয়ার চেষ্টা করি।

এএস

গতিশীল ইন্টারনেট সরবরাহে ফাইবার লাইন আন্ডারগ্রাউন্ডে নেওয়ার পরিকল্পনা

সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ বিরোধীদলীয় এমপিদের

ছোট ছোট ঝাঁকুনিতে বড় বিপদের আভাস

পলাতক ৫৭ পুলিশ কর্মকর্তার অবস্থান শনাক্তের প্রক্রিয়া শুরু

ভাইরাল হওয়ার নেশায় বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চালের বাজারে অস্থিরতা

দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় থমকে গেছে বিশ্বমানের চিকিৎসার স্বপ্ন

আলোর মুখ দেখতে পারে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল

বেনজীর গ্রেপ্তারে আ.লীগে আতঙ্ক

কুখ্যাত বেনজীর দুবাইয়ে গ্রেপ্তার