হোম > আমার দেশ স্পেশাল

বস্ত্রশিল্পের ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ গিলে খাচ্ছে ভারত

সৈয়দ মিজানুর রহমান

দেশীয় বস্ত্র খাতের প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ মারাত্মক ঝুঁকির মুখে। ভারত থেকে আসা সস্তা সুতা ও নিম্নমানের কাপড়ের আগ্রাসী আমদানি এই সংকটকে আরো গভীর করে তুলেছে। হাসিনার আমলে বাংলাদেশকে লক্ষ্য করে ভারতীয় সীমান্তের ওপারে অন্তত অর্ধ শতাধিক ওয়্যারহাউস স্থাপন করা হয় সুতা রপ্তানির জন্য। বর্তমান সরকার স্থলপথে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করলে, প্রাইস ডাম্পিংয়ের আশ্রয় নেয় ভারত। ফলে কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও ভারত নিজেদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষায় অতিরিক্ত ভর্তুকি দিয়ে সুতা ও কাপড় রপ্তানি করছে। খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, ভারতীয় সস্তা সুতা দেশের পোশাক খাতকে সাময়িকভাবে স্বস্তি এনে দিলেও দেশীয় বস্ত্রকলগুলো বন্ধ হয়ে গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের রপ্তানি খাতে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) জানিয়েছে, ২০২২ সাল থেকে দেশে হঠাৎ করে সুতা ও কাপড় আমদানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। ভারতীয় কটন টেক্সটাইল কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী ওই বছর বাংলাদেশে ৪২৯ মিলিয়ন ডলার সমপরিমাণের সুতা রপ্তানি করে ভারত। তবে ২০২৩ সালে তা প্রায় ১.১১ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। ২০২৪ সালে ভারত থেকে সুতা আমদানি হয়েছে প্রায় ২ দশমিক ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এর সঙ্গে তুলা, সিন্থেটিক বা কৃত্রিম ফাইবার, এমএমএফ বা ফাইবারের কাঁচামাল মিলিয়ে মোট সুতা খাতের আমদানির পরিমাণ ছাড়িয়েছে ৩ দশমিক ২৬ বিলিয়ন ডলার। বিটিএমএ জানিয়েছে, দেশে মোট সুতার ৯৫ শতাংশ এখন ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে।

প্রাইস ডাম্পিং হচ্ছে ভারতীয় সুতার

স্থানীয় বস্ত্রকলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, বর্তমানে ভারতীয় সুতা বাংলাদেশের বাজারে আগ্রাসী মূল্যে বা ‘ডাম্পিং প্রাইসে’ প্রবেশ করছে। বর্তমান সরকার স্থলপথে ভারত থেকে সুতা আমদানি নিষিদ্ধ করে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট। তবে প্রাইস ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে সমুদ্রপথে নিম্নমানের সুতা আমদানি হচ্ছে ভারত থেকে।

বিটিএমএ সূত্র মতে, ভারতীয় সুতা এখন প্রতি কেজি ২ দশমিক ১৯ ডলারে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় মিলগুলোর উৎপাদন খরচই ২ দশমিক ৩৯ ডলার।

দেশের বৃহৎ বস্ত্র উৎপাদক প্রতিষ্ঠান জাবের অ্যান্ড জুবায়ের-এর শীর্ষ কর্মকর্তা সিফাত হোসেন ফাহিম আমার দেশকে জানিয়েছেন, ভারতীয় সুতা রপ্তানিকারকরা ২০২২ সাল থেকে একচেটিয়া বাংলাদেশের বাজারকে টার্গেট নিয়ে সীমান্তবর্তী এলাকায় অন্তত অর্ধ শতাধিক ওয়্যারহাউস স্থাপন করেছেন। রিমিশন অব ডিউটিজ অ্যান্ড ট্যাক্সেস অন এক্সপোর্টেড প্রোডাক্টস’-এর আওতায় প্রতি কেজি সুতা রপ্তানিতে তারা ভর্তুকি পাচ্ছেন ৩ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

তিনি জানান, বাংলাদেশের সুতার বাজারকে টার্গেট করে ভারত সরকারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সীমান্তের চারটি স্থলবন্দরের কাছে গুদাম স্থাপন করায় তাদের ‘লিডটাইম’ বা পণ্য রপ্তানির সময় কমে গেছে। সেই সঙ্গে দেশীয় বস্ত্রকলগুলোর দামের তুলনায় সস্তা হওয়ায় পোশাক শিল্প মালিকরা স্থানীয় বস্ত্রকলের সুতা কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন। এটি ভয়াবহ হুমকির মুখে ফেলেছে দেশীয় বস্ত্রকলগুলোকে।

বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, দেশের বস্ত্রকলগুলোর সুতা উৎপাদন ক্ষমতার অর্ধেকও কাজে লাগানো যাচ্ছে না। বিটিএমএর সদস্য ৫২৭ সুতাকল, ৯৯৪ কাপড় ও ৩৪২ ডাইং-প্রিন্টিং কারখানা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। এই খাতে বর্তমানে মোট বিনিয়োগ রয়েছে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। তিনি জানান, গত প্রায় তিন বছরে বস্ত্রখাতে একটি নতুন বিনিয়োগও আসেনি, উল্টো ৩০টির বেশি টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের দাবি জানান।

একাধিক বস্ত্রকলের মালিক বলেছেন, স্থলবন্দরে যথাযথ তদারকির অভাবে ঘোষণার চেয়ে বেশি সুতা দেশে প্রবেশ করত। এমনকি ৩০ কাউন্টের সুতার চালানের ভেতরে ৮০ কাউন্টের সুতা ঢুকিয়ে আনা হতো (সুতার সূক্ষ্মতা ও স্থূলতা কাউন্টের মাধ্যমে পরিমাপ করা হয়)। বন্ড সুবিধায় আমদানি করা এসব সুতা অসাধু ব্যবসায়ী ও আমদানিকারকরা স্থানীয় বাজারে কম দামে বিক্রি করতেন। এর ফলে দেশীয় সুতাকলগুলো বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়ে।

নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে বলেন, স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ হওয়ায় ভারত থেকে সুতা আনতে সময় বাড়ছে, ফলে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমছে। তার মতে, স্থলপথে সুতা আমদানি বন্ধ হলেও ভারতীয় সুতার দাম বাংলাদেশের তুলনায় কেজিতে ২০-৩০ সেন্ট কম, আর দেশি সুতা ব্যবহারে নগদ সহায়তা কমায় এই ব্যবধান আরো বেড়েছে। তিনি জানান, ভারত থেকে ২ ডলার ১২ সেন্টে যে সুতা পাওয়া যায়, বাংলাদেশে সেটির দাম ২ ডলার ৬৫ সেন্ট। তবে বিকেএমইএ সভাপতি মনে করেন, দেশীয় বস্ত্রকলগুলোকে প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় টিকে থাকতে হবে নিজস্ব কৌশলে।

সূত্রগুলো জানায়, ভারতের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে উৎপাদিত সুতা খুবই নিম্নমানের। স্থানীয় সুতা এবং চীন, তুরস্ক ও উজবেকিস্তানের মতো দেশ থেকে আমদানিকৃত সুতার তুলনায় ভারতীয় সুতা দামে সস্তা। মানহীন ভারতীয় এসব সুতায় উৎপাদিত কাপড় ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রায়ই পুরো চালান রিজেক্ট হচ্ছে। এতে দীর্ঘ মেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে দেশের তৈরি পোশাক রপ্তানিতে।

দাতা সংস্থাগুলোর পরামর্শে হাসিনার আমলে বন্ধ হয় ‘সেইফগার্ড’

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আমার দেশকে জানান, বিগত হাসিনা সরকারের সময় ২০২৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে দেশীয় বস্ত্র খাতের জন্য দেওয়া সব ধরনের ভর্তুকি, যাকে শিল্পে সেইফগার্ড সুবিধা বলা হয়, তা প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। বাংলাদেশ এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে—এই যুক্তিতে মূলত বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের পরামর্শেই এ সিদ্ধান্ত হয়। শিল্প মালিকদের পাশ কাটিয়ে সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদও করা হয় সে সময়। সরকারকে জানানো হয়েছিল, বাংলাদেশে এ সুবিধা বন্ধ করা হলেও ভারতে তা বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী আমলে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের দাবি আমলে নেওয়া হয়নি।

তিনি জানান, ভারতীয় সুতার মান নিয়ে আমাদের প্রশ্ন নেই, কিন্তু তারা যেভাবে ভর্তুকি মূল্যে বাংলাদেশের বাজার দখল করে নিয়েছে, তা আমাদের জন্য যথেষ্ট হুমকির বিষয়। এখন ক্ষেত্রবিশেষে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ ভর্তুকি পাচ্ছেন বস্ত্র খাতের উদ্যোক্তারা। কিন্তু এই সামান্য সুবিধার জন্য কেউ সময় নষ্ট করেন না। তিনি মনে করেন, দেশীয় বস্ত্র খাতের স্বার্থে ব্যাংক ঋণের হার কমানো ও দ্রুত নীতি সহায়তা ঘোষণা করা উচিত।

সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা প্রত্যাহারের প্রস্তাবে স্পিনারদের স্বস্তি

বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধার আওতায় ১০ থেকে ৩০ কাউন্টের নির্দিষ্ট কিছু সুতার শুল্কমুক্ত আমদানি বন্ধের সুপারিশ করেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) পাঠানো এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে স্থানীয় স্পিনিং মিলগুলো। তবে তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠনগুলো আশঙ্কা করছে, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মতে, বিশেষ করে ভারত থেকে কম দামে সুতা আমদানির ফলে দেশের স্পিনিং মিলগুলো মারাত্মক চাপের মুখে পড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুতা আমদানি অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় আমদানির পরিমাণ ৬৮ শতাংশের বেশি এবং মূল্য ৪৬ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে অন্তত ৫০টি স্পিনিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে বলে মন্ত্রণালয়ের দাবি।

বিটিএমএ বলছে, ভারতীয় প্রণোদনার কারণে সুতা ‘ডাম্পিং’ দামে আমদানি হচ্ছে, যা স্থানীয় শিল্পকে সংকটে ফেলেছে। তাদের মতে, বছরে ব্যবহৃত মোট সুতার বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় দেশীয় মিলগুলো প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।

সুতা আমদানিতে শুল্ক আরোপের প্রস্তাবে আপত্তি

ভারত থেকে সুতা আমদানির খরচ তুলনামূলক কম উল্লেখ করে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাক খাতের দুই শীর্ষ সংগঠন—বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) ও বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)। সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিলের সুপারিশ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠন দুটি সরকারের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।

গত সোমবার রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান বলেন, দেশীয় স্পিনিং মিল থেকে সুতা কিনলে আমদানির তুলনায় প্রতি কেজিতে প্রায় ৪৬ টাকা বেশি গুনতে হয়। তার অভিযোগ, শিল্প রক্ষার নামে আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে সুতার কৃত্রিম একচেটিয়া বাজার তৈরি করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মান ও প্রতিযোগিতামূলক দামে সুতা দিতে পারলে পোশাক মালিকরা দেশীয় মিল থেকেই কিনতে প্রস্তুত, এমনকি প্রতি কেজিতে ১০-১৫ সেন্ট বেশি দাম দিয়েও।

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাকশিল্প কম মুনাফায় পরিচালিত হয়। বেশি দামে কাঁচামাল কিনতে বাধ্য হলে খাতটি আরো সংকটে পড়বে। তার মতে, একটি শিল্প বাঁচাতে গিয়ে আরেকটি রপ্তানিমুখী শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।

বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ নেতারা জানান, পোশাক খাত মোট সুতার প্রায় ৬০ শতাংশ স্থানীয় মিল থেকে নেয়, বাকি অংশ আমদানিনির্ভর। অনেক ধরনের সুতা দেশে উৎপাদন হয় না এবং আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য না থাকলে বিদেশি ক্রেতারা পোশাকের দাম মেনে নেয় না।

এবার ভোটযুদ্ধের প্রস্তুতি

প্রশাসনজুড়ে স্থবিরতা, নতুন সরকারের অপেক্ষা

অপরাধীদের চটকদার ডাকনাম

সাইবার সন্ত্রাসের কবলে উদীয়মান নারী নেত্রীরা

দ্বৈত নাগরিকত্বের ফাঁড়া কাটল অধিকাংশ প্রার্থীর

শহীদদের ৮০ ভাগই তরুণ, সাধারণ মানুষ

ভোটের দায়িত্বে কেউ আগ্রহী, কেউ নারাজ

মুজিববন্দনার নামে সৃজনশীল প্রকাশনা খাতে ব্যাপক লুটপাট

ফুটপাতের অস্তিত্ব শেষ, সড়কের অর্ধেকই হকারের পেটে

খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের কুশীলবেরা