ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে থাকা শেখ হাসিনার আমলের আশ্রয়ণ প্রকল্পের বহু ঘর এখন পড়ে আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়। কোথাও ঘরে তালা ঝুলছে, কোথাও ভেঙে পড়েছে চাল-বেড়া, আবার কোথাও চুরি হয়ে গেছে পানির মোটর ও জানালা। বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে অনেক ঘর।
জানা গেছে, দলীয় কর্মী ও সচ্ছল ব্যক্তিদের নামে ঘর বরাদ্দ দেওয়াসহ নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সে সময় জোরালো হলেও তা আমলে নেয়নি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এতে বঞ্চিত হয়েছেন প্রকৃত দরিদ্র ও ভূমিহীনরা। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রকল্প থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে মোট বরাদ্দের অর্ধেক টাকা।
শেখ হাসিনার শাসনামলে বাস্তবায়িত এ কর্মসূচিতে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। তবে প্রকল্পের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠলেও সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় সরেজমিন অনুসন্ধানে ঘর বরাদ্দ, বসবাস ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নানা অসংগতি উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে শেখ হাসিনার প্রথম মেয়াদে হতদরিদ্রদের জন্য ঘর নির্মাণের কর্মসূচি শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে আশ্রয়ণ, গুচ্ছগ্রাম এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারিত হয়, যা ‘আশ্রয়ণ-২’ প্রকল্প নামে পরিচিত।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগ পর্যন্ত এ কর্মসূচিতে ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয় হয়। দেশব্যাপী পাঁচ লাখ ৮২ হাজার ৫৩টি ভূমি ও গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ সেমিপাকা একক ঘর দেওয়া হয়।
২০২২ সালের প্রাথমিক নির্দেশনায় একটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। পরে তা বাড়িয়ে দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা করা হয়। কিন্তু ব্যয় বাড়লেও অনেক স্থানে নির্মাণমান ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের কাজের কারণে কিছু ঘর নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রাথমিকভাবে ২০২২ সালের নির্দেশনায় একটি একক ঘরের নির্মাণ ব্যয় এক লাখ ৭১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও জোড়াতালি দিয়ে কাজ করায় শুরুতেই অনেক ঘর ভেঙে পড়ে। পরে ঘরপ্রতি ব্যয় বাড়িয়ে দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা করা হয়। এর পরও ঘরগুলোর অবস্থা ছিল খুবই করুণ, সামান্য বাতাসে চাল উড়ে যায় এবং বৃষ্টির পানিতে ঘর ভেসে যায়।
প্রকল্পের আওতায় বিপুল পরিমাণ খাসজমিও বরাদ্দ নেওয়া হয়। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে প্রায় ৫,৫১২ একর খাসজমি বরাদ্দ নেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩,০০০ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া শত শত একর জমি নতুন করে কিনে প্রকল্পের আওতাভুক্ত করা হয়।
মাঠপর্যায়ের তথ্য বলছে, ঢাকার কেরানীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, খুলনা, নেত্রকোনা, গাজীপুর, রংপুর, নাটোর, নীলফামারী, রাজশাহী, ফেনী, টাঙ্গাইল ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন জেলার আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধিকাংশ ঘরই এখন খালি পড়ে আছে।
সাতক্ষীরা ও নীলফামারীতে খালি ঘর
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার গাভা ও এল্লারচরে ৭২৪টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত দুস্থদের পরিবর্তে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মীদের অনেকে এসব ঘর পেয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাদের অনেকেই এসব ঘর অন্যের কাছে বিক্রি করে দেন।
সদর উপজেলার গাভা আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরেজমিনে গিয়ে ২২০টি ঘরের মধ্যে প্রায় ৫০টি তালাবদ্ধ দেখা যায়। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রায় ১০০টি ঘরের মালিকানা বা দখল হাতবদল হয়েছে। বাকি ঘরগুলোর কিছুতে লোকজন বাস করছেন।
এল্লারচরেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বাসিন্দা ওলি রহমান আমার দেশকে বলেন, শুরুতে প্রকৃত দরিদ্রদের পরিবর্তে ক্ষমতাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ঘর পেয়েছিলেন। কিছু ঘর বেচাকেনাও হয়েছে। তবে পানি সংকট ও কর্মসংস্থানের অভাবে অনেক বাসিন্দাই কাজের সন্ধানে অন্য এলাকায় চলে যান। এসব ঘর বছরের অধিকাংশ সময়ই তালাবদ্ধ থাকে।
সাতক্ষীরার আশাশুনিতেও বহু ঘর ফাঁকা পড়ে থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ঝুনাগাছ চাপানি এলাকার একটি প্রকল্পে ১০০টি ঘরের মধ্যে প্রায় ৯০টিই ফাঁকা বা তালাবদ্ধ বলে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে।
কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় পাঁচ ধাপে নির্মিত ১৩২টি ঘরের বেশির ভাগেই নিয়মিত বসবাস নেই বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে। জীবিকার প্রয়োজনে অনেকে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় চলে গেছেন। এ কারণে ঘরগুলোতে তালা ঝুলছে।
ফরিদপুর ও গাজীপুরে অব্যবস্থাপনা
ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ইউনিয়নের নতুন বাজারসংলগ্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পে ৫২টি ঘরের মধ্যে মাত্র ১৫টি পরিবার বসবাস করছে। জলাবদ্ধতা, চলাচলের রাস্তার দুরবস্থা, পানি নিষ্কাশনের সমস্যা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ঘাটতিকে বাসিন্দাদের চলে যাওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
গাজীপুরের শ্রীপুরের নয়াপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। সেখানে ২০২৩ সালে ১৪২টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ১০টি ঘরের তালাই খোলা হয়নি। আরো ২৫টি ঘর নিয়মিত বন্ধ থাকে বলে জানা গেছে।
এই প্রকল্প চত্বরে একটি বিদ্যালয় থাকলেও কোনো শিক্ষক না থাকায় পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এছাড়া দীর্ঘদিন বসবাস না করায় কোনো কোনো ঘরের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে এবং মিটার খুলে নেওয়া হয়েছে। কিছু ঘরের চারপাশে আগাছা জন্মেছে; কোথাও পানি তোলার মোটর ও জানালা চুরির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রকল্পের ঘরপ্রতি দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা নির্মাণব্যয় ধরে ১৪২টি ঘরের ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় তিন কোটি ৭৪ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। তবে এ হিসাবের মধ্যে জমি, অবকাঠামো ও অন্যান্য সুবিধার ব্যয় অন্তর্ভুক্ত নয়।
প্রকল্পের সভাপতি আব্দুল লতিফ এসব বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, যাতায়াতব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় অনেকে সেখানে থাকেন না। যাদের নিজস্ব আধুনিক বাড়ি ও সম্পত্তি রয়েছে, তাদের কেউ কেউ আত্মীয়স্বজনকে ঘরে থাকতে দিয়েছেন। আবার কাজের প্রয়োজনে বাইরে থাকা ব্যক্তিরা শুক্রবার এসে হাজিরা দেন বলেও দাবি করেন তিনি।
পাইকগাছায় ঘর বিক্রির অভিযোগ
খুলনার পাইকগাছা উপজেলার পুটিমারী আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর বরাদ্দ ও বিক্রি নিয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, লতা ইউনিয়নের পুটিমারী মৌজায় নির্মিত ৯০টি ঘরের মধ্যে ৩০টি বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ঘর ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে দাবি করেছেন প্রকল্পের সম্পাদক খোকন গাজী।
অভিযোগ রয়েছে, জমি ও অর্থসম্পদ থাকা ব্যক্তিদেরও ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরে তাদের অনেকে সেখানে বসবাস না করায় ঘরগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়ায় অনেক ঘরের চাল ও বেড়া নষ্ট হয়েছে, বাথরুমও ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে স্থানীয় এক বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম শাহাবুদ্দিন, আসাদ ও অন্য একজনের কাছ থেকে তিনটি ঘর কিনে সেখানে ডেকোরেটরের ব্যবসা করছেন। তবে সিরাজুল ইসলাম তা অস্বীকার করে বলেন, তিনি নিজের ঘরেই রয়েছেন এবং অন্য ঘরগুলো ভাড়া নিয়েছেন।
ঘর বিক্রেতা অন্যরা হলেন ইয়াকুব শেখ, নাজুবর, মুজিবর রহমান, আছা সরদার, শহিদুল ইসলাম, মেরিনা বেগম, সেলিনা আক্তার, হরিদাস মণ্ডল, তপন চৌকিদার, সুদীপ্ত মণ্ডল, অনিল মণ্ডল ও হরিচাঁদ প্রমুখ। এদিকে বিল্ডিং বাড়ি রয়েছে এমন ব্যক্তিরা আশ্রয়ণে ঘর বরাদ্দ পেলেও সেখানে থাকেন না। তাদের মধ্যে ভবতোষ মণ্ডল, পরিমল মণ্ডল, অমল মণ্ডল, জগদীশ মণ্ডল, প্রহ্লাদ মণ্ডল ও পাপিয়া মণ্ডলের নাম রয়েছে।
পাইকগাছা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াসিউজ্জামান চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, সরকারি বরাদ্দের ঘর বিক্রির কোনো সুযোগ নেই। কেউ এমন কাজ করে থাকলে এবং তদন্তে তা প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু আমার দেশকে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে শেখ হাসিনার সরকার রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট করেছে। ঘর দেওয়ার উপলক্ষটি ছিল একটি বাহানা। যেসব স্থানে ঘরগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা সমাজ ও পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন এলাকা। মানুষ যে সমাজে বড় হয়েছে, সেখান থেকে তাকে দূরে কোনো এলাকায় ঘর করে দিলে শুধু একটি ঘরই দেওয়া হয়; কিন্তু তার সামাজিক বন্ধন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টি নিশ্চিত হয় না। ওইসব আশ্রয়ণ প্রকল্পে কী ধরনের অনিয়ম হয়েছিল, আমরা তা খতিয়ে দেখব।
[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন পাইকগাছা (খুলনা), শ্রীপুর (গাজীপুর), নিকলী (কিশোরগঞ্জ) ও সাতক্ষীরা প্রতিনিধি]