টেলিগ্রাম-হোয়াটসঅ্যাপে সক্রিয় ফ্যাসিবাদীরা
দেশকে অকার্যকর ও অস্থিতিশীল করার লক্ষ্যে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে গোপনে সংগঠিত হচ্ছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা। টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে গড়ে তোলা হয়েছে শতাধিক গোপন গ্রুপ, যেগুলো ব্যবহার করে তারা রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছেন বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো। সবকিছুর নেতৃত্বে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বিশ্বস্ত গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ৩৭টি সক্রিয় টেলিগ্রাম ও ১৪টি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ থেকে নিয়মিতভাবে উসকানিমূলক বার্তা, রাষ্ট্রবিরোধী প্রচার এবং সাংগঠনিক নির্দেশনা পাঠানো হচ্ছে। এসব গ্রুপে সরকারের নীতিনির্ধারণী কাঠামো, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। একাধিক সূত্রের দাবি, এই ডিজিটাল নেটওয়ার্ক পরিচালিত হচ্ছে যুক্তরাজ্য, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট টেলিগ্রাম গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে- ‘আমরা ঐক্যবদ্ধ ৬৪ জেলার বঙ্গবন্ধু সৈনিক’, ‘বঙ্গবন্ধু স্কোয়াড বাংলাদেশ’, ‘ঢাকা ব্লকড (মুজিব ফোর্স)’, ‘আমরা শেখ হাসিনা ভ্যানগার্ড’, ‘ফেসলেস ডেমোক্রেসি’, ‘টিম জয়’, ‘বঙ্গবন্ধু ২৩ এভিনিউ’, ‘ধানমন্ডি ৩২ নম্বর’, ‘বিপ্লবী সিলেট’, ‘চেতনা ৭১’, ‘মব সন্ত্রাস প্রতিরোধ’, ‘জয় বাংলা ৭১’, ‘ওমেন পাওয়ার সেন্ট্রাল’ প্রভৃতি।
হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ‘বঙ্গবন্ধু প্রচার সেল’, ‘মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগ’, ‘শেখ হাসিনার গেরিলা বাহিনী’, ‘চাঁদনীঘাট ইউনিয়ন বঙ্গবন্ধু আদর্শ সৈনিক’ এবং ‘সদর উপজেলা কৃষক লীগ প্রচার সেল’।
এসব কার্যক্রমের অর্থায়ন ও নেতৃত্বে রয়েছেন প্রবাসী নেতারা, যাদের অতীতে দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে প্রভাব ছিল। টেলিগ্রাম গ্রুপ ‘সাপোর্ট জয়বাংলা’-এর একটি ভয়েসবার্তায় আহাদ চৌধুরী নামে এক প্রবাসী সদস্য বলেন, আমরা মৌলভীবাজারে নিপীড়িত আওয়ামী পরিবারের পাশে আছি। ড. ইউনূস আমাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন।
তিনি দাবি করেন, এই গ্রুপে বড় অঙ্কের অনুদান পাঠিয়েছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এমএ রহিম সিআইপি, মৌলভীবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা সাইফুর রহমান বাবুল এবং আওয়ামী লীগ নেতা জহির কাজী জহির। এমনকি শেখ হাসিনা নিজে একটি অনলাইন সভায় উপস্থিত ছিলেন বলে ভয়েস ক্লিপে দাবি করা হয়, যেখানে ১২৯ জন সদস্য অংশগ্রহণ করেন।
তিনি আরো বলেন, যারা অতীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাবস্থায় আত্মীয়স্বজনকে বিভিন্ন পদে বসিয়ে মানুষের বাড়ি দখল করেছিল, সেই দুর্নীতিবাজরাই আজ বিদেশে পালিয়ে গেছে। অথচ প্রকৃত কর্মীরা ত্যাগ স্বীকার করছেন।
মৌলভীবাজার জেলার পুলিশ সুপার এমকেএইচ জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমরা সাইবার পেট্রোলিংয়ের মাধ্যমে এসব ডিজিটাল গ্রুপ পর্যবেক্ষণে রেখেছি। শতাধিক সদস্য শনাক্ত হয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে এসব গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে আনা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক গোষ্ঠী প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল নিয়ে কাজ করলেও আমরা সাইবার টুলস ও ইন্টেলিজেন্স ব্যবস্থারের মাধ্যমে তাদের গতিবিধি নজরে রেখেছি। দেশের ভেতরে এবং বাইরে যারা অর্থায়ন করছেন, তাদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশ সুপারের মতে, আগের সরকারের আমলে যেসব ব্যক্তি দুর্নীতির মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন, তারাই এখন দেশ ও সমাজকে অস্থির করতে নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। আমরা এসব চক্রান্ত প্রতিরোধে সর্বোচ্চ সতর্ক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক তৎপরতা এখন আর নিছক মতপ্রকাশ নয়; বরং তা অনেক সময় রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে পরিণত হচ্ছে। এ ধরনের তৎপরতা প্রতিরোধে সরকারের প্রযুক্তিনির্ভর পদক্ষেপ আরো জোরদার করা প্রয়োজন।