হোম > আমার দেশ স্পেশাল

নামহীন আট শহীদের কবরে ফিরল পরিচয়

রায়েরবাজার কবরস্থান

ওয়াসিম সিদ্দিকী

রাজধানীর রায়েরবাজারে সোমবার সন্তানের কবরের পাশে জুলাইযোদ্ধার মায়ের আহাজারি। ছবি: আমার দেশ

রাজধানীর রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, ৫ জানুয়ারি ২০২৬। দিগন্তবিস্তৃত মাটির বুকে এতদিন যে কংক্রিটের স্ল্যাবগুলো দাঁড়িয়ে ছিল, তাতে লেখা ছিল শুধুই নম্বর অথবা নির্মম ‘অজ্ঞাতনামা’ শব্দটি। জুলাই ২০২৪-এর অগ্নিগর্ভে রদিনগুলোতে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হওয়ার পর বহু প্রাণ নিথর হয়ে আশ্রয় নিয়েছিল এই মাটির নিচে—রিচয়হীন, স্বজনহীন অবস্থায়। ডিএনএ প্রযুক্তির কল্যাণে এবং পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) নিরলস প্রচেষ্টায় রায়েরবাজারের সেই নামহীন কবরগুলো ফিরে পেতে শুরু করেছে, তাদের হারানো মর্যাদা।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহযোগিতায় পরিচালিত এ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘মিনেসোটা প্রটোকল’ অনুসরণ করা হয়েছে। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন মানবিক ও ফরেনসিক উদ্যোগ। গতকাল সোমবার কবরস্থানে আয়োজিত এক ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানে ১১৪ জন শহীদের পরিচয় শনাক্তকরণ প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং কবর চিহ্নিতকরণ কার্যক্রম পরিদর্শন করা হয়। উত্তোলিত লাশগুলোর ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের মাধ্যমে আবেদনকারী ৯টি পরিবারের মধ্যে আট শহীদের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে, অন্যটির কাজও দ্রুত এগিয়ে চলছে।

২০২৪ সালের জুলাই। কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এক দফার দাবি তখন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিয়েছে। রাজধানী ঢাকা তখন এক অগ্নিকুণ্ড। সেই আগুনের ফুলকি আর ধোঁয়ার কুহেলিকায় হারিয়ে গিয়েছিল হাজারো মুখ। কেউ জীবিকার তাগিদে রাস্তায় বেরিয়েছিলেন, কেউবা বুকে দেশপ্রেম নিয়ে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু দিন শেষে অনেকেই আর ঘরে ফেরেননি। হাসপাতালগুলোর মর্গ উপচে পড়েছিল লাশের স্তূপে। চরম বিশৃঙ্খলা আর আতঙ্কের সেই দিনগুলোতে পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় অনেককেই দাফন করা হয়েছিল বেওয়ারিশ হিসেবে। দীর্ঘ দেড় বছরেরও বেশি সময় পর স্বজনদের সেই অপেক্ষার প্রহর ফুরোল।

সিআইডির প্রধান, অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহর নেতৃত্বে এই পুরো প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়েছে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে। জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ মরিস টিডবল-বিন্জ এবং ফরেনসিক নৃবিজ্ঞানী ড. লুইস ফনডেরিডারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। রায়েরবাজার কবরস্থানে অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করে গত বছরের ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত লাশ উত্তোলন কার্যক্রম চলে। এটি কেবল একটি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা ছিল না, বরং ছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়ার এক অঙ্গীকার।

কবরস্থানের এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিলেন শেরপুরের শ্রীবরদী থানার শহীদ আসাদুল্লাহর (৩১) স্বজনরা। পেশায় ড্রাইভার আসাদুল্লাহ উত্তরা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন ১৯ জুলাই। উত্তাল সেই দিনে জীবিকার সন্ধানে বের হওয়া আসাদুল্লাহ আর ফেরেননি। তার মৃত্যুর তারিখ ছিল ২২ জুলাই। আসাদুল্লাহর বৃদ্ধ মা আয়েশা বেগম আর স্ত্রী ফারজানার চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। আসাদুল্লাহ রেখে গেছেন ১১ বছরের এক ছেলে আর পাঁচ বছরের এক মেয়ে। যে মেয়েটি বাবা আসবে বলে প্রতিদিন দরজায় দাঁড়িয়ে থাকত, সে আজ জানাল তার বাবা শুয়ে আছেন রায়েরবাজারের এই মাটিতে। পরিবারের উপার্জনক্ষম একমাত্র মানুষটিকে হারিয়ে আজ তারা দিশেহারা, তবুও বাবার কবরের হদিস পাওয়া তাদের মনে এক বিষাদময় শান্তি এনেছে।

একটু দূরেই শোনা যাচ্ছিল শহীদ মাহিমের (৩২) পরিবারের কান্না। ময়মনসিংহের ফুলপুরের এ যুবক ঢাকায় গাড়ি চালাতেন। তার পোস্টারে লেখা ছিল ‘নিখোঁজের তারিখ: মনে নাই’। জুলাইয়ের সেই পরিস্থিতিতে কবে তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন, তা হয়তো পরিবারের স্মৃতির পাতা থেকেও আতঙ্কে মুছে গেছে। তবে মৃত্যু তার পিছু ছাড়েনি। ১৮ জুলাই মোহাম্মদপুরে তিনি শহীদ হন। মাহিম রেখে গেছেন দুই স্ত্রী—সুইটি ও জেসমিনকে এবং প্রায় দুই বছর বয়সী দুটি ফুটফুটে ছেলে সন্তান। যারা এখনো বাবার অর্থ বোঝে না, অথচ তাদের মাথার ওপর থেকে ছাদ সরে গেছে চিরতরে।

থামানো যাচ্ছে না সোহেলের মায়ের কান্না

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার লাল মিয়ার বড় ছেলে সোহেল রানার (৩৮) কবরের সামনের দৃশ্যটি ছিল সবচেয়ে হৃদয়বিদারক। কবর দেখতে গিয়ে সোহেল রানার মায়ের সেই বুকফাটা কান্না উপস্থিত উপদেষ্টা ও কর্মকর্তাদেরও চোখ ভিজিয়ে দেয়। বারবার বৃদ্ধা রাশেদা বেগম কবরের পাশে বসে বিলাপ আর আহাজারি করছিলেন। কিছুতেই তার কান্না থামছিল না। এ দৃশ্য দেখে উপস্থিত অনেককেই আবেগাপ্লুত হতে দেখা যায়। পেশায় কাপড়ের ব্যবসায়ী সোহেল রানা ১৮ জুলাই নিখোঁজ হন এবং ওইদিনই যাত্রাবাড়ীর দক্ষিণ কাজলা এলাকায় শহীদ হন। অবিবাহিত সোহেল রানার কাঁধেই ছিল পুরো পরিবারের দায়িত্ব। চার ভাই ও এক বোনের সংসারে তিনি ছিলেন বটবৃক্ষ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত সোহেল রানার মা রাশেদা বেগম কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

একইভাবে পরিচয় মিলেছে রফিকুল ইসলাম নামের দুই ব্যক্তির । ফেনীর টাইলস মিস্ত্রি রফিকুল ইসলাম (২৯) ১৮ জুলাই নিখোঁজ হয়ে, ১৯ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে শহীদ হন। তিন ভাই এক বোনের সংসারে তিনিই ছিলেন মূল উপার্জনক্ষম। অন্যদিকে পিরোজপুরের নাজিরপুরের কম্পিউটার প্রশিক্ষক রফিকুল ইসলাম (৫৫) ১৯ জুলাই নিখোঁজ হয়ে গোলাপবাগে শহীদ হন। তিনি অনেক গরিব ছাত্রকে বিনামূল্যে কম্পিউটার শেখাতেন। তার তিন ভাই ও তিন বোনের পরিবারে আজ শুধুই শূন্যতা।

জুলাই বিপ্লবের শেষ সময়ে শহীদ হন কাবিল হোসেন (৫৮)। ১ আগস্ট তিনি নিখোঁজ হন এবং ২ আগস্ট মাদারটেক এলাকায় শহীদ হন। পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন—একজন ৫৮ বছর বয়সী মানুষ, যিনি ব্যবসার কাজে বেরিয়েছিলেন, তাকেও কেন মরতে হলো?

অন্যদিকে চাঁদপুরের মতলবের ফার্নিচার নকশা মিস্ত্রি পারভেজ ব্যাপারী (২৩), যিনি ১৯ জুলাই বাড্ডায় শহীদ হন। তিনি ছিলেন এক ভাই ও তিন বোনের একমাত্র অবলম্বন। বাবা সবুজ ব্যাপারী গতকাল ছেলের কবরের মাটি ছুঁয়ে দেখেন। কুমিল্লার দেবীদ্বারের ফয়সাল সরকার (২৬), পেশায় ছাত্র ও পরিবহন সুপারভাইজার, ১৯ জুলাই উত্তরা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন। গতকাল তারও নাম ফিরেছে কবরের ফলকে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক-ই আজম বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর আটজন অজ্ঞাতনামা শহীদের পরিচয় সফলভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এ শনাক্তকরণের ফলে শহীদদের পরিবারগুলো তাদের প্রিয়জনের লাশ গ্রহণ করে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলতে পারবেন এই ভেবে যে, এখন তারা জানেন তাদের প্রিয়জন ঠিক কোন স্থানে শায়িত আছেন। যা তাদের জন্য এক বিরাট মানসিক শান্তির কারণ হবে।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, এই শনাক্তকরণের ফলে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। যদিও আমরা জানি, এই শোক কোনোদিন পুরোপুরি মোছা যাবে না, তবু রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সত্য উদঘাটন ও পরিচয় ফিরিয়ে দেওয়ার এই প্রচেষ্টাক শহীদ পরিবারের হৃদয়ে কিছুটা হলেও শান্তি এনে দিবে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ডা. সায়েদুর রহমান বলেন, ময়নাতদন্ত এবং ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের মতো সংবেদনশীল কাজগুলো অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে। ফরেনসিক চিকিৎসকরা প্রতিটি লাশের ময়নাতদন্ত পরিচালনা করেছেন এবং সিআইডির নিজস্ব ফরেনসিক ডিএনএ ও কেমিক্যাল ল্যাবরেটরি ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এটি আমাদের দেশের ফরেনসিক সক্ষমতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ পুরো প্রক্রিয়ার নেতৃত্ব দিতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু লাশ শনাক্ত করছি না। আমরা ইতিহাসকে সংরক্ষণ করছি, ন্যায়বিচারের ভিত্তি তৈরি করছি। এ পর্যন্ত ৯টি আবেদনের মধ্যে আটটির পরিচয় নিশ্চিত হয়েছে এবং বাকিদের প্রক্রিয়াও চলমান।’

সিআইডি জানিয়েছে, মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে এই তদন্ত পরিচালনা করা হয়েছে। এটি সম্ভাব্য বেআইনি বা বিচারবহির্ভূত মৃত্যু তদন্তের জন্য একটি আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা। রায়েরবাজারের এ কার্যক্রম প্রমাণ করে সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে যেকোনো সংবেদনশীল কাজ পেশাদারিত্বের সঙ্গে সম্পন্ন করা সম্ভব।

অনুষ্ঠান শেষে শনাক্ত করা লাশগুলোর কবরে যখন নতুন নামফলক বসানো হচ্ছিল, তখন এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হয়। স্বজনরা পরম মমতায় কবরের মাটি ছুঁয়ে দিচ্ছিলেন। কেউ কেউ বিড়বিড় করে বলছিলেন, ‘অন্তত এখন জানি, ও কোথায় ঘুমিয়ে আছে।’

জকসুতে ভিপি-জিএস-এজিএসসহ ১৬টি পদে ছাত্রশিবিরের বিজয়

সংসদ নির্বাচনে ইসির ব্যয়সীমা কি শুধুই কাগুজে নিয়ম

হাসিনার আমলে অনেক নারীকেও গুম করা হয়

যানজটে দিনে স্থবির ঢাকা, নিস্তার নেই রাতেও

অপরাধ-দুর্নীতির মহারাজ পলাতক পুলিশ কর্মকর্তা মাহবুব

সাত জেলায় সংগঠিত হচ্ছে আওয়ামী লীগ

জকসুতে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ শেষে গণনায় জটিলতা

সেনাকাঠামোর সব স্তর গুমে জড়িত ছিল

ভারতের জন্য বন্দর নির্মাণে পাহাড় কেটে জমি ভরাট

‘দরিয়া-ই-নূর’ নিয়ে দানা বাঁধছে রহস্য