মহেশপুর সীমান্ত
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের মহেশপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ অংশে ৩৬ বাংলাদেশিকে হত্যা করেছে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। গত ১০ বছরে গুলিবর্ষণে এবং অপহরণের পর নির্যাতনের ঘটনায় নিহত হয়েছেন এসব নিরীহ নাগরিক। একই সময়ে বিএসএফের হাতে মারধরে আহত হয়েছেন সীমান্ত এলাকা মহেশপুরে বসবাসকারী আরো শতাধিক মানুষ।
এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম সীমান্ত। এর মধ্যে ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায় রয়েছে ৭২ কিলোমিটার সীমান্ত। কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে এখানকার প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায়। এছাড়া উন্মুক্ত সীমান্ত রয়েছে প্রায় ১২ কিলোমিটার। বাংলাদেশ
অংশের মহেশপুর উপজেলায় রয়েছে যাদবপুর, মান্দারবাড়ীয়া, শ্যামকুঁড়, নেপা, কাজীরবেড় ও স্বরূপপুর ইউনিয়ন। ভারতীয় অংশে রয়েছে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার হাসখালী ও উত্তর ২৪ পরগনা জেলা।
অভিযোগ রয়েছে- মহেশপুরের বাঘাডাঙ্গা সীমান্তের ওপারে ভারতের বরণবাড়ীয়া, শীলবাড়ীয়া, গৌড়া, কাজীরবেড়ের বিপরীতে হাবাসপুর-সুন্দরপুর, মাইলবাড়ীয়া সীমান্তের ওপাশে পাখিউড়া, স্বরূপপুরের বিপরীতে নোনাগঞ্জ ও বেণীপুর, খোসালপুরের ওপারে রামনগর-কুমারী এবং শ্যামকুঁড় সীমান্তের বিপরীতে ভারতের ছুটিপুর, ফতেপুর ও ভজনঘাট বিএসএফ ক্যাম্পের সীমান্তরক্ষীদের নির্বিচার গুলিতে বেশি হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।
গত ১০ বছরে এসব এলাকায় বিএসএফ প্রায় ৩৬ বাংলাদেশিকে গুলি করে ও পিটিয়ে হত্যা করে। মূলত ভারতীয় এ বাহিনীর কারণে ঝিনাইদহের মহেশপুরের পুরো সীমান্ত এলাকাটি এখন মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, সর্বশেষ গত ৩ নভেম্বর ভোরে উপজেলার পলিয়ানপুর সীমান্তে গুলিতে মৃত্যুবরণ করেন বাউলি গ্রামের কাসেম আলীর ছেলে আবদুর রহিম। ভারতের নদীয়া জেলার ধানতলী থানার হাবাসপুর ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যদের গুলিতে রহিম নিহত হন।
এ ছাড়া সীমান্তে গত কয়েক বছরে নিহতদের মধ্যে বাঘাডাঙ্গা গ্রামের আবদুস সামাদের ছেলে আলম মিয়া, রমজান আলীর ছেলে ওয়াসিম আলী, পাঞ্জাব আলীর ছেলে আবদুল মান্নান, করিম মিস্ত্রির ছেলে আত্তাব আলী, নয়ন মণ্ডলের তিন ছেলে ফজলুর রহমান, আবু সালেহ ও লিপু হোসেন, সলেমানপুর গ্রামের দাউদ হোসেনের ছেলে ইব্রাহিম হোসেন, নবীছদ্দিনের ছেলে মিজানুর রহমান, খোসালপুর গ্রামের শহিদুল হোসেনের দুই ছেলে সোহেল ও রাশিদুল, মাটিলা গ্রামের মনোয়ার মাস্টারের ছেলে আশা মিয়া, মাটিলা গ্রামের হামেদ আলীর ছেলে হারুন মিয়া, আশাদুলের ছেলে জসিম, লেবুতলা গ্রামের নিজাম উদ্দিনের ছেলে লান্টু মিয়া, মিয়ারাজ হোসেনের ছেলে আমিরুল ইসলাম, মনির উদ্দিনের ছেলে আন্টু মিয়া, জলুলী গ্রামের শাহাদাত হোসেনের ছেলে খয়জেল হোসেন, গোপালপুর গ্রামের হানেফ আলীর ছেলে ওবাইদুর রহমান, যাদবপুর গ্রামের দুলাল মিয়ার ছেলে জাহিদুল ইসলাম, বাঁকোশপোতা গ্রামের জাহাঙ্গীর হোসেনের ছেলে হাসান আলী, বাঘাডাঙ্গা জিনজিরাপাড়ার আবদুল আলীর ছেলে খালেক মিয়া, কাজীরবেড় গ্রামের আকবর আলীর ছেলে আশাদুল ইসলাম এবং মাইলবাড়িয়া গ্রামের আবদুস সাত্তারের ছেলে শফিউদ্দিন উল্লেখযোগ্য।
সূত্রমতে, ২০১৪ সালের ৯ জুলাই অস্থায়ী টিনশেড ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে ৫৮ বিজিবি ব্যাটালিয়নের কার্যক্রম শুরু হয়। একই বছরের ১৪ জুলাই এ বাহিনীর রিজিয়ন কমান্ডার হাবিবুল করিম ৫৮ ব্যাটালিয়নের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ২০১৫ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহম্মেদ আনুষ্ঠানিকভাবে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে মহেশপুরে ৫৮ বিজিবি ক্যাম্প উদ্বোধনের ঘোষণা দেন। এর আগে মহেশপুরের দীর্ঘ ৭২ কিলোমিটার সীমান্ত পাহারায় নিযুক্ত ছিল যশোর ৪৯ ব্যাটালিয়ন ও চুয়াডাঙ্গাস্থ ৬ ব্যাটালিয়ন।
বিজিবির একটি সূত্র দাবি করেছে, ৫৮ বিজিবি ক্যাম্প স্থাপনের পরে সীমান্ত হত্যা কিছুটা কমেছে। আগে দূরত্বের কারণে নজরদারি ব্যবস্থা ছিল অনেকটা ঢিলেঢালা। এখন অবৈধ অনুপ্রবেশ রোধে সীমান্তে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি। কোনো অপরাধী যেন ভারতে পাড়ি দিতে না পারে সে জন্য টহল জোরদার করা হয়েছে। সীমান্ত এলাকার সড়কে চলছে প্রতিনিয়ত তল্লাশি। সেই সঙ্গে স্থানীয়দের সচেতন করছে বিজিবি।
সূত্রটি আরো দাবি করেছে, ভারতে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর কার্যক্রম চালমান রয়েছে। এই কার্যক্রমের অধীনে সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক পুশইন রোধ, অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ না করা অর্থাৎ শূন্য লাইন অতিক্রম না করা, সন্ধ্যার পর শূন্যে লাইনে গমন না করা বা অবস্থান না করা, চোরাকারবারিদের সামাজিকভাবে প্রতিহত করা, শূন্য লাইন বরাবর গরু-ছাগল না চরানো, সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের অভ্যন্তরে ঘাস কাটতে না যাওয়াসহ ভারতীয়দের জমি লিজ নেওয়া বা চাষ করতে না যাওয়ার ব্যাপারে স্থানীয়দের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে বিজিবি।
১৯৭৩ সালের বাংলাদেশ পাসপোর্ট অধ্যাদেশ আইন অনুযায়ী, বাংলাদেশিরা পাসপোর্ট ছাড়া সীমান্ত অতিক্রম করার সময় আটক হলে মামলা করে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এই আইনে তিন মাস সাজা অথবা ৫০০ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। ভারতীয় বা অন্য দেশের নাগরিক সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে এসে আটক হলে দ্য কন্ট্রোল অব এন্ট্রি অ্যাক্ট-১৯৫২ আইনে মামলা হয়। আইনে এক বছর কারাদণ্ডের বিধান থাকলেও জরিমানার পরিমাণ উল্লেখ নেই। দুটি মামলাই জামিনযোগ্য। আইনজীবীদের মতে, লঘুদণ্ডের কারণে আসামিরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যান।
অপরদিকে নিহতদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারত অংশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা বাংলাদেশিদের সঙ্গে শত্রু মনোভাবাপন্ন আচরণ করে। কারণে-অকারণে দেখামাত্র গুলি করে। যে কারণে বাংলাদেশিরা সীমান্ত লাগোয়া নিজেদের জমি ঠিকমতো চাষ করতে এবং গরু-ছাগল চরাতে যেতে পারছেন না।
বিশেষ করে চব্বিশের আন্দোলনের পরে বিএসএফ এখন সীমান্তে মারমুখী আচরণ করছে। ভারতীয় এ বাহিনী ঠান্ডা মাথায় অব্যাহতভাবে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিকদের পাখির মতো হত্যা করছে। বিজিবির পক্ষ থেকে বিএসএফের এসব হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও ভারত তা বন্ধ করছে না। ফলে প্রতিবেশী দেশের এই একগুঁয়েমির কারণে দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
মহেশপুর ৫৮ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. রফিকুল আলম পিএসসি জানিয়েছেন, সীমান্ত হত্যা ও সীমান্ত অপরাধ রোধে বিজিবি শক্ত অবস্থানে আছে। স্থানীয়দের মাঝে এ ব্যাপারে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে দুই দেশের পতাকা বৈঠকে এ ব্যাপারে বিজিবির পক্ষ থেকে জোরালো প্রতিবাদ জানানো হয়।