হোম > আমার দেশ স্পেশাল

গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে দেশ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট কাল

সৈয়দ আবদাল আহমদ

বাংলাদেশ এখন গণতন্ত্রের সূর্যোদয়ের পথে। নির্বাচন হচ্ছে গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপ। আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি বহুল প্রত্যাশিত সেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ঐতিহাসিক এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে। আর এই নির্বাচিত সরকারের দেশ পরিচালনার মাধ্যমে বাংলাদেশ গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপ পার করবে।

বাংলাদেশ দীর্ঘ দুই দশক ধরে গণতান্ত্রিক শাসন থেকে বঞ্চিত ছিল। ২০০৬ সালে ১/১১-এ সেনাসমর্থিত মইন-ফখরুদ্দিনের জরুরি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে দেশ কার্যত গণতন্ত্রহীন হয়ে পড়ে। জরুরি সরকার দেশকে বিরাজনীতিকরণের পথে নিয়ে যায়। ২০০৮ সালে জরুরি সরকারের অধীনে যে নির্বাচনটি হয়, সেটি ছিল ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর একটি নির্বাচন। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই বলেছিলেন, ১/১১-এর সরকারটি ছিল তাদের আন্দোলনের ফসল। আর আন্দোলনের ফসল সরকারটি ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে ‘৮৭ শতাংশ ভোটে’ বিজয়ী ঘোষিত হয়, যা ছিল অবাক করার মতো ঘটনা। ওই নির্বাচনটিতে কোনো কোনো কেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোটও দেখানো হয়। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে শেখ হাসিনা দেশে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেন। গণতন্ত্রকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। আইনের শাসন ভূলুণ্ঠিত হয়। সুশাসনকে নির্বাসনে পাঠানো হয়। নির্বাচনি ব্যবস্থা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হয়। ২০১৪ সালে হয় ‘বিনা ভোটের নির্বাচন,’ ২০১৮ সালে হয় ‘নিশি রাতের ভোট’ এবং ২০২৪ সালে হয় ‘ডামি নির্বাচন’। নির্বাচনের নামে এগুলো ছিল প্রহসন এবং দেশের জনগণের সঙ্গে তামাশা। শেখ হাসিনা দেশে এমন কর্তৃত্ববাদী অপশাসন চালান, যাকে জংলি শাসনের সঙ্গেই কেবল তুলনা করা যায়। তিনি এমন কৌশল ও নীলনকশা প্রণয়ন করেন যাতে ক্ষমতায় চিরস্থায়ী থাকা যায়।

কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, চব্বিশের জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের ছাত্র-গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন হয় এবং শেখ হাসিনা দলবলসহ ভারতে পালিয়ে যান। সফল জুলাই অভ্যুত্থানের পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। গত দেড় বছর এই সরকারের নিরলস প্রচেষ্টার পর ১২ ফেব্রুয়ারি প্রত্যাশিত নির্বাচনটি হতে যাচ্ছে। ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব গ্রহণ করে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, তিনি দেশে উৎসবমুখর পরিবেশে একটি ইতিহাসসেরা নির্বাচন অনুষ্ঠান করে দেশকে গণতন্ত্রে ফিরিয়ে আনবেন। গতকালও জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারি হতে যাচ্ছে সারা জাতির বহু আকাঙ্ক্ষিত দিন। এই নির্বাচনটি হবে গণতান্ত্রিক যাত্রার একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। স্বৈরাচারবিরোধী দীর্ঘ লড়াই-সংগ্রামের সাফল্যের পর গণতান্ত্রিক উত্তরণের যুগসন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে আছি।

গণতন্ত্রের জন্য ২০ বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশের আকাশে আবার উদিত হতে যাচ্ছে গণতন্ত্রের সূর্য। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন কেবল একটি ভোট নয়, বরং জনগণের ভোটাধিকার পুনরুদ্ধারের এক ঐতিহাসিক ঘটনা হতে যাচ্ছে। ১৫ বছরের ‘নির্বাচনি স্বৈরতন্ত্রের’ পর এটিই প্রথম সুযোগ, যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের পছন্দের প্রতিনিধি নির্বাচনের সুযোগ পাবেন। নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের ওপর একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল সরকার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্রের কাঠামো পরিবর্তনের একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। অবরুদ্ধ গণতন্ত্রকে মুক্ত করার প্রত্যয় নিয়ে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনটির মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে ফেরাকে ঐতিহাসিক সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে সাফল্য নির্ভর করবে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।

সংসদ নির্বাচন ও গণভোট

আগামীকাল ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সঙ্গে সাংবিধানিক গণভোটের মাধ্যমে দেশ একটি গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে যাত্রা শুরু করবে। নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ কোনো ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে। এই নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী প্রধান দুই প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসন, গুম ও গণহত্যা চালানোর জন্য আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় তারা নির্বাচন করতে পারছে না। তাই নির্বাচনে নৌকা প্রতীকও নেই। নির্বাচন কমিশন ১২ ফেব্রুয়ারির ভোটকে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে একটি পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে দেশে এক ধরনের ‘ঈদের আমেজ’ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ভোটারদের স্বাচ্ছন্দ্যে বাড়ি গিয়ে ভোট দেওয়ার সুযোগ করে দিতে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সরকারি দুটি ঘোষণা করে শুক্র ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে মিলিয়ে চারদিনের ছুটির ব্যবস্থা হয়েছে। রাজধানীর বাসটার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনে ঈদে বাড়ি ফেরার মতো মানুষের ভিড় দেখা যাচ্ছে। তারা গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছেন ভোট দিতে। দীর্ঘ ১৫ বছর পর অনেক ভোটার বিশেষ করে তরুণরা প্রথমবারের মতো ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়ে দারুণ উচ্ছ্বসিত।

নির্বাচন কমিশন ক্যারাভ্যান বা ভ্রাম্যমাণ বাহনের মাধ্যমে প্রচার করার সুযোগ দিয়ে নির্বাচনি আমেজ বাড়িয়ে তুলেছে। নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করার জন্য এক লাখ সেনাবাহিনীসহ ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করেছে।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের প্রচারকে এক কথায় বলতে গেলে এটি ছিল নজিরবিহীন উৎসবমুখর ও ডিজিটালনির্ভর। এবারের প্রচারের সবচেয়ে বড় দিক ছিল ফেসবুক, ইউটিউব এবং টিকটকের ব্যবহার। কোনো প্রকার বড় ধরনের সহিংসতা কিংবা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই প্রার্থীরা তাদের প্রচার শেষ করেছেন। আসন্ন নির্বাচনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কয়েকটি কারণে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এবং একটি ‘ঐতিহাসিক মোড়’ হিসেবে বিবেচিত। এবারই প্রথম একই দিনে সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের ওপর একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ভোটাররা দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট পেপার (সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা এবং গণভোটের জন্য গোলাপি) ব্যবহার করবেন। গত তিনটি প্রহসনের নির্বাচনের পর এটিই প্রথম বড় ধরনের অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন। এবারের নির্বাচনে প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার রয়েছেন। যারা মোট ভোটারের এক-তৃতীয়াংশ। কেন্দ্রে সিসিটিভি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য ২৫ হাজার ৭শ ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’ রয়েছে। প্রায় এক হাজার ড্রোন ভোটকেন্দ্রে নজরদারি করবে।

নির্বাচন ও গণতন্ত্রের উত্তরণ সম্পর্কে দুই রাষ্ট্রচিন্তক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও রাষ্ট্রচিন্তক প্রফেসর মাহবুব উল্লাহ বলেন, একটা নির্বাচন হতে যাচ্ছে দৃশ্যত মনে হচ্ছে সেটা ভালো নির্বাচন হবে। তবে, মানুষ মুক্তভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করলেই প্রকৃত গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটবে এটা বলা মুশকিল। গণতন্ত্রের বিষয়ে আমাদের অতীতের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে। দেখা যায়, নির্বাচনে কোনো দল বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসার পর আগের দেওয়া প্রতিশ্রুতি তারা রক্ষা করেন না। এবারও যে ভোটের পর বিজয়ী দল তাদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে তার নিশ্চয়তা কোথায়?

এবারের নির্বাচনি প্রচারণার ট্রেন্ড ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা পোস্ট ও ভিডিও প্রকাশের প্রসঙ্গ টেনে এই রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, আমরা প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেসব তর্ক-বিতর্ক এবার দেখেছি তাতে ভোটারদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে। কাকে ভোট দেবেন ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ কঠিন হবে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ধাপ হচ্ছে নির্বাচন। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হলে আমরা বলতে পারব প্রথম ধাপ সফলভাবে পার হওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে, কেবল নির্বাচন দিয়ে গণতন্ত্রে উত্তরণ সম্ভব নয়। গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকগুলো বিষয় রয়েছে। এটা নির্ভর করছে যারা ক্ষমতায় আসবে তাদের কার্যক্রমের ওপর। সরকার ও বিরোধী দলের ভূমিকা, সরকারের জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, সুশাসন ইত্যাদি বিষয়ের ওপর।

শেখ হাসিনার কলঙ্কিত সেই নির্বাচনি প্রহসন

শেখ হাসিনার আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের তিনটি নির্বাচন ছিল মূলত ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু’ এবং একটি পরিকল্পিত ‘মাস্টার প্ল্যান’-এর অংশ। এই ‘একক মাস্টার প্ল্যান’টি ছিল ক্ষমতায় শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখার একটি কৌশল । এই পরিকল্পনার মূল ভিত্তি ছিল ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা।

এই তিন নির্বাচন নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন তদন্ত করে গত ১২ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন, তাতে এই মন্তব্য করা হয়েছে। হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বে এই কমিশন গঠিত হয়।

কমিশন তাদের রিপোর্টে প্রশাসনের হাতে নির্বাচনি নিয়ন্ত্রণ কীভাবে ছিল তার উল্লেখ করে বলেছে, ২০১৪ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নির্বাচন ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হাত থেকে মূলত সিভিল প্রশাসনের হাতে চলে গিয়েছিল। পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং প্রশাসনের একটি অংশকে ব্যবহার করে নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারিত হতো। ২০১৪ সালের নির্বাচনটি ছিল সম্পূর্ণ বিনাভোটে নির্বাচন। এই নির্বাচনে ১৫৪টি আসন বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়। ২০১৮ সালের নির্বাচনটি ছিল ‘রাতের ভোট’। কমিশনের তদন্তে উঠে এসেছে যে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ ভোট রাতেই কাস্ট করা হয়েছিল। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির হার দেখানো হয়েছিল ১০০ শতাংশের বেশি এবং সে সব ভোট শুধু ‘নৌকা’ প্রতীকেই পড়েছিল। ২০২৪ সালে ছিল ‘ডামি নির্বাচন’। এই নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় জনগণের কাছে প্রতিযোগিতামূলক দেখানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে ‘ডামি প্রার্থী’ দাঁড় করানোর কৌশল নেওয়া হয়েছিল।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, এই তিনটি নির্বাচন কোনোভাবেই নির্বাচনি সংজ্ঞায় পড়ে না। ত্রুটিপূর্ণ জঘন্য প্রশাসনের এই নির্বাচনের মাধ্যমে আসলে দেশের গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে কলুষিত ও দুর্বল করা হয়েছে, যা ধীরে ধীরে ফ্যাসিবাদের পথ প্রশস্ত করেছে। নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি মামলা, গ্রেপ্তার এবং গুম করার মতো হাতিয়ার ব্যবহার করা হয়েছে। সাধারণ ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো এবং ভোট কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া ছিল একটি নিত্যনৈমিত্তিক চিত্র। নির্বাচনের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দলীয় নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বিশেষ ‘ইলেকশন সেল’ গঠিত হয়েছিল। ২০০৮ সালে নির্বাচনেও ইঞ্জিনিয়ারিং করা হয়েছে। ওই নির্বাচনটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।

শেখ হাসিনা আমলের গুমের বিভীষিকা

গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গত ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে কমিশন বিগত ১৫ বছরের গুমের ঘটনাগুলোকে একটি ‘সুপরিকল্পিত এবং কাঠামোগত অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কমিশন মোট ১,৯১৩টি অভিযোগ গ্রহণ করেছে যার মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১,৫৬৯টি ঘটনাকে গুম হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বর্তমানে অন্তত ২৫১ ব্যক্তি এখনো নিখোঁজ রয়েছে। গুম কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না; এটি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার একটি প্রধান রাষ্ট্রীয় হাতিয়ার। গুমের শিকার ব্যক্তিকের বড় অংশই ছিল বিএনপি ও জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। গুমের ঘটনায় র‌্যাব, ডিবি, ডিজিএফআই এবং সিটিটিসির মতো সংস্থাগুলোর সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে। র‌্যাবের গোয়েন্দা উইংকে গুমের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কমিশন প্রমাণ পেয়েছে যে, কিছু ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীদের অপহরণ করে সীমান্তের ওপারে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে, যেখানে বিজিবি এবং বিএসএফ সহায়তা করেছে। গুমের পর হত্যার শিকার ব্যক্তিদের লাশ সবচেয়ে বেশি ফেলা হয়েছে বরিশালের বলেশ্বর নদীতে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা, মুন্সীগঞ্জ ও সুন্দরবনের নদীতেও লাশ ফেলা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের সাক্ষ্যে মধ্যযুগীয় কায়দায় নির্যাতনের লোমহর্ষক বর্ণনা, যেমন- যৌনাঙ্গে বৈদ্যুতিক শক, ঘূর্ণায়মান চেয়ার, ওয়াটার বোর্ডিং, শারীরিক বিকৃতের মতো নিষ্ঠুরতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। গোপনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়ার যন্ত্র ব্যবহার করে নির্যাতন করা হয়েছে। ঘূর্ণায়মান চেয়ারে বসিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ঘোরানো হতো যাতে ভুক্তভোগী বমি, মলমূত্র ত্যাগ এবং জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। মুখ তোয়ালে দিয়ে ঢেকে তার উপর অনবরত পানি ঢেলে শ্বাসরুদ্ধ করে নির্যাতন করা হতো। ভুক্তভোগীদের নখ উপড়ে ফেলা, উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো, ঠোঁট সেলাই করে দেওয়ার মতো নৃশংসতা চালানো হয়েছে। বন্দিদের দিনভর চোখ ও হাত বেঁধে রাখা, পচা খাবার খেতে দেওয়া হতো এবং দিনের পর দিন টয়লেটে বন্দি করে রাখা হতো। নারী বন্দিদের হাত-পা বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে এবং নির্যাতনের চোটে অসুস্থ হয়ে পড়লেও তাকে বিদ্রূপ করা হতো।

গণহত্যা হাসিনার নির্দেশে

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে চারটি বড় ধরনের গণহত্যা হয়েছে। এর মধ্যে চব্বিশের ছাত্র গণঅভ্যুত্থান চলাকালে ‘জুলাই গণহত্যা’ ছিল ভয়াবহতম। শেখ হাসিনার নির্দেশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনগুলো জড়িত হয়। জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস অফিসের তদন্তে জুলাই গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা ১৪০০ জন। এছাড়া ৩০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। তাদের একটি বড় অংশ পঙ্গু। কারও পা নেই, হাত নেই, চোখ নেই।

২০১৩ সালের ৫ ও ৬ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদের উপর র‌্যাব-বিজিবি-পুলিশের যৌথ হামলায় অন্তত ৩০০ জন নিহত হয়েছে। ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ফাঁসির রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনে হাসিনার নির্দেশে গুলিতে গণহত্যার শিকার হন ১৫৫ জন। ২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহের সময় ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। ২০২১ সালের ২৬ থেকে ২৮ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে কেন্দ্র করে ১৭ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়।

শেখ হাসিনার আমলে আলোচিত টাকা পাচার

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে বলে সরকারি শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই শ্বেতপত্র প্রণয়ন করে। এই সময়ে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের তথ্য মতে, শুধুমাত্র ব্যাংকিং খাত থেকেই ১৭-১৮ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। ওভার ইনভয়েসিং (আমদানিতে বেশি দাম দেখানো) এবং আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের (রপ্তানি কম দাম দেখানো) মাধ্যমে বাণিজ্যের আড়ালে বিপুল অর্থ পাচার হয়। ইনফরমাল চ্যানেলের মাধ্যমে (হুন্ডি ও হাওয়ালা) অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপ-আমেরিকায় টাকা পাচার হয়। বিভিন্ন অবকাঠামোর প্রকল্পের ব্যয় কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে (ইনফ্লেটেড কস্ট) দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়। পাচারকৃত এই অর্থের বড় একটি অংশ দুবাই, যুক্তরাজ্য, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়ায় স্থাবর সম্পত্তি ও ব্যবসায়ে বিনিয়োগ হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

ব্যাকিং খাতের কেলেঙ্কারি

শেখ হাসিনার শাসনামলে ব্যাংকিং খাতে বড় ধরনের বেশ কয়েকটি কেলেঙ্কারি ও অর্থ লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। সিপিডির তথ্য অনুযায়ী অন্তত ২৪টি বড় ব্যাংকিং কেলেঙ্কারিতে ৯২ হাজার ২৬১ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর মধ্যে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ৪৫০০ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার নামে আত্মসাৎ করা হয়। সোনালী ব্যাংক হলমার্ক কেলেঙ্কারির মাধ্যমে ৩৫০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়। ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক দখলের পর এস আলম গ্রুপ এবং তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো সেখান থেকে প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার নামে অর্থ লোপাট করে। এই গ্রুপটি বিভিন্ন ব্যাংকের পর্ষদ দখল করে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার পাচার করেছে। ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও জনতা ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ৩৪০০ কোটি টাকা সরিয়ে নেওয়া হয়। এছাড়া আনন ট্যাক্স গ্রুপকেও একক ঋণসীমা লঙ্ঘন করে জনতা ব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল যা লুটপাট হয়। বিসমিল্লাহ গ্রুপ কেলেঙ্কারিতে ৫টি ব্যাংক থেকে ভুয়া এলসি দেখিয়ে ১২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

অর্থনীতি যেভাবে ধ্বংস হয়েছে

শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধি ও দৃশ্যমান অবকাঠামো উন্নয়নের নামে ব্যাপক দুর্নীতি, অর্থ পাচার এবং ঋণের বোঝা বেড়ে যাওয়ার মতো গভীর সংকট সৃষ্টি হয়। এ সময় বিশাল ঋণের বোঝা দেশের উপর চাপানো হয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস পায়। পরিসংখ্যান জালিয়াতি হয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যে চরম আকার ধারণ করে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও অর্থ পাচার একটি ভঙ্গুর অবস্থা সৃষ্টি করে। শেয়ারবাজারে বেশ কয়েকবার বড় ধরনের ধস ও কারসাজি হয়। শেয়ারবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০১০-১১ সালের শেয়ারবাজারের ধস ছিল সবচেয়ে বড় কেলেঙ্কারি। এতে বাজার মূলধনের প্রায় ২৭ বিলিয়ন ডলার বা ২ লাখ কোটি টাকার বেশি হারিয়ে যায়। লাখ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হন। এই শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির মাস্টারমাইন্ড ছিলেন শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান। তার প্রভাবে শিবলি রুবাইয়াত উল ইসলাম বিএসইসির চেয়ারম্যান থাকাকালে প্রায় ৬ হাজার ৬ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

সুশাসন ও বিচারবিভাগ

শেখ হাসিনার আমলে বিচারবিভাগ সম্পূর্ণ ছিল সরকারের কব্জায়। বিচারবিভাগকে ব্যবহার করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন শেখ হাসিনা। উচ্চ ও নিম্নআদালতে বিচারক নিয়োগ, পদায়ন এবং পদোন্নতির উপর হাসিনা সরকারের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ থাকায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলে কোনো কিছু ছিল না। বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, হামলা-মামলা এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে সীমাহীন। ভিন্নমত দমনের জন্য ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং পরবর্তীতে সাইবার নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে সাংবাদিকসহ নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ২০২৪ সালে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৬৫তম। হাজার হাজার গায়েবি মামলা দিয়ে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের হয়রানি করা হয়েছে। এক কথায় গণতন্ত্রহীন পরিবেশের এক জংলি শাসন ছিল বাংলাদেশে। সেই শাসনের অবসানের পর এসেছে এক উৎসবমুখর নির্বাচন, যার ফলে দেশের মানুষ উপহার পেতে যাচ্ছেন গণতন্ত্র। এই গণতন্ত্রের জন্য রাজনীতির কিংবদন্তি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শুরু করা গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন সফল হয়েছে। এখন হবে গণতন্ত্র মজবুত করার সংগ্রাম।

ভোটের নিরাপত্তায় মাঠে আট বাহিনীর ৯ লাখ সদস্য

বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য থাকবে বিশেষ নিরাপত্তা

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে মিলবে যেসব সুফল

হাসিনার জালিয়াতির তিন নির্বাচন

৪৩ জেলায় ৭০০০ কিমি ঘুরে নির্বাচনি প্রচার জামায়াত আমিরের

১৯ দিনে তারেক রহমানের ৪৩ জনসভা

ভোট ডাকাতির পথপ্রদর্শক শেখ মুজিব

ঘরে বসেই যেভাবে জানবেন ভোটকেন্দ্র ও বুথের তথ্য

দুবার সংসদ নির্বাচন হয়েছিল যে বছর

কেমন ছিল ১২টি সংসদ নির্বাচন