বন বিভাগের সাড়ে আট একর জমি অবৈধভাবে দখল করে রেখেছে প্রবর্তক সংঘ নামে একটি সংগঠন। চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর মৌজায় অবস্থিত বিপুল পরিমাণ এ জমির বর্তমান বাজারদর প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। অবৈধভাবে এ জমি দখলে নিতে প্রবর্তক সংঘকে সামনে রেখে ইসকন ও স্থানীয় একটি ডেভেলপার কোম্পানি পুরো জমি দখলের সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে বলে জানা গেছে।
বন অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম রেঞ্জের কর্মকর্তারা আমার দেশকে জানান, প্রবর্তক সংঘসহ একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট বন বিভাগের মূল্যবান এ জমি দখলে নিতে জালিয়াতির মাধ্যমে ভুয়া দলিল ও নথিপত্র তৈরি করেছে। ভূমি অফিসসহ সরকারের কোনো দপ্তরে এসব নথিপত্রের হদিস পাওয়া যায়নি। সরকারি গেজেটভুক্ত এ জমি রক্ষা করতে জালিয়াতদের বিরুদ্ধে আমরা আদালতে মামলা করেছি।
সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে রক্ষিত নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ থানার মুরাদপুর মৌজার আরএস খতিয়ান নম্বর ২৮৮, আরএস দাগ নং ৫৬৩-এর ৮ দশমিক ৩৩ একর জমি চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের নামে রক্ষিত বন হিসেবে ঘোষিত।
বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এ টিলাভূমি নয়াবাদ খাসমহালের অংশ হিসেবে ভারত সম্রাটের সম্পত্তি ছিল। ১৯৩৪ সালের ১৪ জুন ৫৬ নম্বর কলকাতা গেজেটে এ সম্পত্তির দাগ নম্বরসহ উল্লেখ রয়েছে। ১৯২৭ সালের বন আইনের ২৯ ধারার ক্ষমতাবলে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার চট্টগ্রাম জেলার পাঁচলাইশ, বোয়ালখালী, ডবলমুরিং ও পটিয়া থানার বিভিন্ন তফসিলের মুরাদপুর
মৌজাসহ মোট ২২টি মৌজার প্রায় দুই হাজার ১১৯ একর পাহাড়ি জমি বন বিভাগের নামে গেজেটে অন্তর্ভুক্ত করে। পরে পাকিস্তান শাসনামল ও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আগের গেজেটের অংশ হিসেবেই ৫৬৩ নম্বর দাগের ৮ দশমিক ৩৩ একর জমি বন বিভাগের তত্ত্বাবধানেই রয়েছে। পরে জরিপের সময় প্রবর্তক সংঘ জালিয়াতির মাধ্যমে ৫৬৩ নম্বর দাগ বসিয়ে বিএস ১৮৬ নম্বর খতিয়ানের মাধ্যমে নিজেদের নামে রেকর্ডভুক্ত করিয়ে নেয়। ৫৬৩ নম্বর দাগের কাছেই পূর্ব পাশে আরএস ৫৬০ নম্বর দাগের জমিতে আগেই থাকা একটি আশ্রমকে ঠিকানা দেখিয়ে প্রবর্তক সংঘ জাল দলিল তৈরি করে।
যেভাবে ধরা পড়ে জালিয়াতি
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পুরো জমি বন বিভাগের অধীন ও তত্ত্বাবধানে থাকলেও এটি নিয়ে দুটি সংগঠন মামলায় জড়িয়ে পড়ে। প্রথমে বন বিভাগের এ জমির মালিকানা দাবি করে গোপাল চন্দ্র সর্ববিদ্যা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ২০০৩ সালে প্রবর্তক সংঘের বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়। ২০০৩ সালের ১৯ মার্চ ডিসি অফিসের সলিসিটরের মাধ্যমে বন বিভাগ পক্ষভুক্ত হয়ে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল (সিভিল রুল-৪৯৯/(এফ.এম)/২০০৩) দায়ের করে।
বন কর্মকর্তারা আরো জানান, প্রবর্তক সংঘের পক্ষ থেকে আদালতে যেসব নথি উপস্থাপন করা হয়, তার সবগুলোই ভুয়া। সেখানে উল্লেখ করা হয়, জনৈক ফুল কুমারী দেবী উক্ত নালিশিভুক্ত ভূমি ১৯৩০ সালের ২৭ মে খাসমহালের কাছ থেকে বন্দোবস্ত নেন। সরকারি সেরেস্তায় কিংবা ডিস্ট্রিক্ট কালেক্টরের দপ্তরে কিংবা খাসমহালে কিংবা রেজিস্ট্রি অফিসে এ ধরনের বন্দোবস্ত-সংক্রান্ত দলিলের কোনো অস্তিত্ব না পাওয়া গেলেও ফুল কুমারী দেবীর কাছ থেকেই ১৯৩১ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ৩৫৯ নম্বর কবলা দলিলের মাধ্যমে আশ্রম কর্তৃক খরিদ করা হয় বলে দাবি প্রবর্তকের। আশপাশের অন্যান্য খতিয়ান পর্যালোচনা করেও তাদের দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি।
বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, প্রবর্তক সংঘ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে সংরক্ষিত বনের দামি এ জমি দখল করতে ব্যর্থ হওয়ার পর স্থানীয় ডেভেলপার কোম্পানি আরএফ প্রোপার্টিজকে সঙ্গে নেয়। এ বিষয়ে বন বিভাগের চট্টগ্রাম রেঞ্জ কর্মকর্তা (চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ) যুগ্ম জেলা জজ তৃতীয় আদালতে বন বিভাগের পক্ষে একটি মামলা দায়ের করেন। এছাড়াও পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ও ম্যাজিস্ট্রেট মুনির চৌধুরী প্রবর্তক সংঘ কর্তৃক বন বিভাগের জায়গা থেকে টিলা ও গাছ কাটার দায়ে প্রায় সাত লাখ টাকা জরিমানা করেন।
তবে আদালতের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে প্রবর্তক সংঘ ও তাদের সহযোগী সংগঠন ইসকন জোরপূর্বক পাহাড় কেটে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে। এ বিষয়ে বন বিভাগ পুনরায় পাঁচলাইশ থানায় জিডি করেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় এক কর্মকর্তা।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, পাহাড় কাটার বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে বেশ কয়েকবার জানানো হয়। সর্বশেষ পরিবেশ অধিদপ্তরকে জানানো হলে তারা সরেজমিন পাহাড় কাটার প্রমাণ পায় এবং অভিযুক্তদের আটক করে। তবে এর পরও প্রর্বতক সংঘ, ইসকন ও আরএফ প্রোপার্টিজ হাইকোর্টের রায় অমান্য করে পাহাড় ও গাছ কেটে ভবন নির্মাণের কাজ অব্যাহত রেখেছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
স্থানীয় অধিবাসীরা যা দেখছেন
বন বিভাগ ও প্রবর্তক সংঘের মধ্যে জমির মালিকানা নিয়ে যে বিরোধ চলছে, তার পাশেই বসবাস করেন লোকমান হোসেন নামে এক ব্যবসায়ী। ৭০ বছর বয়সি স্থানীয় এই অধিবাসী আমার দেশকে বলেন, আমার পূর্বপুরুষও এই এলাকার বাসিন্দা। শিশুকাল থেকেই দেখে আসছি এ জমি বন বিভাগের। বনকর্মীরা এ জমি দেখভাল করে আসছেন। এরপর এখানে একটি ছাপড়াঘর নির্মাণ করা হয়। পরে ধীরে ধীরে প্রবর্তক সংঘের নামে এখানে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়। এখানে উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা জারি রয়েছে বলে শুনেছি।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে বন বিভাগের এ জমির দাম কমপক্ষে দেড় হাজার কোটি টাকা হবে। মূল্যবান এ জমি দখলে নিতে বিভিন্ন ধরনের জাল কাগজপত্র তৈরি করা হয়েছে। এতে ইসকন ও আরএফ প্রোপার্টিজও সহযোগিতা করছে বলে জানতে পেরেছি।
জেলার ফটিকছড়ি থানার মুহাম্মদ ইউনুছ আমার দেশকে বলেন, ছোটবেলা থেকেই আমি দেখে আসছি প্রবর্তক মোড়ের পাহাড়টি সরকারি সম্পত্তি হিসেবে বন বিভাগের দখলে রয়েছে এবং সেখানে বন বিভাগের লোকজন নিয়মিত আসা-যাওয়া করতেন। সেখানে বন বিভাগের একটি স্টাফ কোয়ার্টার ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১০-১১ সালের দিকে প্রবর্তক সংঘ বন বিভাগের জায়গা অবৈধভাবে দখলে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মাণ করেছে। এতে ইসকনের স্থানীয় নেতারা সহায়তা করছেন।
আরএফ প্রোপার্টিজের বক্তব্য
বন বিভাগের জমিতে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে আরএফ প্রোপার্টিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আহাম্মেদ শফিক আমার দেশকে বলেন, আমরা দরপত্রের মাধ্যমে প্রবর্তক সংঘের কাছ থেকে কাজ পেয়েছিলাম। সাইনিং মানি হিসেবে চার কোটি টাকা দিয়েছি এবং অনেক উন্নয়নকাজ ও স্থাপনা নির্মাণ করেছি। এর পরই এখানে আদালত নিষেধাজ্ঞা দেয়। গত ১৩ বছর ধরে আমাদের এই টাকা আটকে রয়েছে। এতে প্রতিদিন আমাদের অনেক ক্ষতি হচ্ছে। আদালত যে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, আমরা সেটা মেনে কাজ বন্ধ রেখেছি। এখন আদালতের চুড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় আছি।
প্রবর্তক সংঘের সভাপতির দাবি
প্রবর্তক সংঘের সভাপতি ইন্দু নন্দন দত্ত বন বিভাগের জমি দখলের অভিযোগের জবাবে আমার দেশকে বলেন, আমরা এখানে ৮০ বছরের বেশি সময় ধরে আছি। এতদিন কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি। জনস্বার্থের কথা বলে বন বিভাগ এর আগেও হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেছিল। সেটি নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এখন আবার চট্টগ্রাম আদালতে মামলা করা হয়েছে। আমরা সব নথিপত্র আদালতে জমা দিয়েছি। আমাদের দলিল ও নথিপত্র সঠিক বলে আমরা মনে করি।
বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জমি প্রবর্তক সংঘের নামে কীভাবে এলোÑএমন প্রশ্নের জবাবে সংঘের সভাপতি বলেন, আমাদের সব কাগজপত্র বৈধ ও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর কর্তৃক অনুমোদিত। আমাদের কাগজের কোনো ঘাটতি নেই। আমরা ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি। আমাদের এখানকার আশ্রমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বহু বিপ্লবী আশ্রয় নিয়েছিলেন। ইতিহাস ও সাহিত্যে এসব তথ্য রয়েছে।