টানা ১৫ বছর ধরে রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকায় দেশের গণপরিবহন খাত প্রায় পুরোটাই কব্জা করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। বিশেষ করে বাসের মালিক, বাস কোম্পানির মালিক, পরিবহন মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন ও পরিবহন খাতের চাঁদাবাজির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের হাতে। ফলে নিজস্ব বলয় তৈরি করে এ খাত থেকে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে একটি সংগঠিত দুষ্টচক্র। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন গা-ঢাকা দিয়েছেন অনেকেই, কেউ বিদেশে পালিয়েছেন, কেউ বন্দি হয়েছেন। তবে কাঠামোগতভাবে এই চক্র গড়ে ওঠায় এখনো এই খাতে তেমন পরিবর্তন আসেনি।
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকায় পরিবহন খাতে ক্ষমতাকেন্দ্রিক একটি বলয় বা চক্র তৈরি হয়। আওয়ামী লীগের রাজনীতিকরা এই খাতে বিনিয়োগ করেছেন আবার এই খাতের লোকজনও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন। পেশিশক্তি ব্যবহার করে পরিবহন খাত লুটেপুটে খেয়েছে এই চক্রটি। আবার আওয়ামী লীগ সরকারও এই চক্রটিকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেছে, ফায়দা নিয়েছে। ফলে দুষ্টচক্রের দখলে ছিল গণপরিবহন খাত।
বিষয়টি উঠে এসেছে চলতি বছরের গত ৫ মার্চ প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনেও। ‘ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস পরিবহন ব্যবসায় শুদ্ধাচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ যৌথ বা অংশীদারী কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা দলীয় বিবেচনায় নির্বাচিত হন এবং দেশের অধিকাংশ কোম্পানির মালিক শিল্পপতি বা রাজনীতিবিদ। জরিপে অংশগ্রহণকারী ২২টি (১৩.১ শতাংশ) কোম্পানির কাছে ৮১ দশমিক ৪ শতাংশ বাসের মালিকানা রয়েছে। এ অল্পসংখ্যক মালিকের নিয়ন্ত্রণে দেশের অধিকাংশ বাস থাকায় তারা এ খাতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করে।
আরও বলা হয়, জরিপে অন্তর্ভুক্ত এসব বৃহৎ বাস কোম্পানির প্রায় ৯২ শতাংশ ক্ষেত্রে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের সঙ্গে রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। বৃহৎ বাস কোম্পানিগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশের মালিক বা পরিচালনা কমিটির প্রধানের সঙ্গে সরাসরি আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে, যাদের কয়েকজন সাবেক সংসদ সদস্যের কাছের আত্মীয়। আর বৃহৎ কোম্পানির ১২ শতাংশে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন দৈনিক আমার দেশকে বলেন, যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় গণপরিবহন খাত। গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ এটা বেশি করেছে। চাঁদাবাজিসহ নানা রকমের দুর্নীতি-অনিয়ম-লেনদেনের বিষয় আছে এখানে। এখানে এত পরিমাণে টাকা লেনদেন হয় যে, চাঁদা যে তোলে তার থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রী পর্যন্ত বণ্টন হয়। এটা একটা চক্র। এটা কেবল হাত বদল হয়েছে। এটাকে একটা সিস্টেমে পরিণত করেছে তারা।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বায়ক সাইফুল আলম আমার দেশকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১৫ বছরে গণপরিবহন খাত যে দুষ্টচক্রের দখলে ছিল, তা আর বলার অপেক্ষ রাখে না। চাঁদাবাজি থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যবসার দখল— সবখানে তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে তাদের পৃষ্ঠপোষকতাও দিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের দলবাজি আর অনিয়মের কারণে প্রকৃত মালিক-শ্রমিকরা তাদের হাতে জিম্মি। নামসর্বস্ব কোম্পানি খুলে চাঁদাবাজি মেনে নিয়েই বাস চালাতে হতো তাদের।
আওয়ামী লীগ আমলে চাঁদাবাজির বিষয়ে টিআইবির গবেষণা বলেছে, সড়কে বিভিন্ন দলীয় পরিচয়ের ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বাসপ্রতি মাসে গড়ে ২ হাজার ৭৭৯ টাকা চাঁদাবাজি করে। এই রাজনৈতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন মালিক সমিতিও রয়েছে। জরিপের ফল বলছে, বাসমালিক ও কর্মী-শ্রমিকরা বিভিন্ন উপলক্ষ এবং কারণে চাঁদাবাজির শিকার হয় বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দেয়। রাজনৈতিক সমাবেশ, বিভিন্ন দিবস পালন, টার্মিনালের বাইরে (রাস্তায়) পার্কিং এবং সড়কের বিভিন্ন স্থানে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন ও ‘টোকেন বাণিজ্যের’ জন্য বাস মালিক ও কর্মী বা শ্রমিকরা চাঁদা বা নিয়মবহির্ভূত অর্থ দেয় বা দিতে বাধ্য হয়। ফলে দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস পরিবহন খাত থেকে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি ৩৭ লাখ টাকা চাঁদা আদায় হয়। তবে টিআইবির প্রতিবেদনে পরিবহন খাতে বছরে ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজির কথা বলা হলেও বাস্তবে এর পরিমাণ আরও অনেক বেশি।
ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির আহ্বায়ক সাইফুল আলম আমার দেশকে বলেন, পরিবহন খাতের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসছে। সে কারণে হাতবদল কথাটা এখানে প্রযোজ্য নয়। খারাপ লোকরা নেতৃত্বে ছিল, এখন ভালো কিছুর জন্যই আমরা দায়িত্ব নিয়েছি। বিএনপির আগের আমলের মতো এবার হবে না, গুণগত পরিবর্তন আসবে। আমরা যে দলের বা মতেরই হই না কেন, নিয়মতান্ত্রিকভাবে আমরা দায়িত্ব পালন করব।
বেশ কয়েকটি কোম্পানির কর্তারা বলছেন, রাজধানীসহ সারা দেশের বাস মালিকদের নিয়ন্ত্রণ করা হতো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির ব্যানারে। শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করা হতো বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের মাধ্যমে। এসব সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনরা। তাদের কব্জায় ছিল পরিবহন মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতিবিদরা পরিবহন খাতে যুক্ত থাকায় যাত্রী সেবার সেভাবে মানোন্নয়ন না হলেও ইচ্ছেমতো ভাড়া বৃদ্ধি করা হয়েছে। টিআইবির গবেষণা বলছে, যাত্রীদের কাছ থেকে ৬০ দশমিক ৫ শতাংশ অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া আনফিট বাস চালানো, সনদ নবায়ন না করা, অনিয়মের পরেও মামলা এড়ানো এবং পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর গাড়ি চালানোর ক্ষেত্রে অনৈতিক ভূমিকা রেখেছেন আওয়ামী লীগের কিছু নেতা। ফলে কাঙ্ক্ষি সেবা থেকে বঞ্চিত হন সাধারণ যাত্রীরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ছিলেন শাজাহান খান। তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক নৌমন্ত্রী। পরিবহন খাতের বড় নিয়ন্ত্রক ছিল বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব ও ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ। তিনি ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ দক্ষিণ শাখার সহ-সভাপতিও। তারা দীর্ঘদিন ধরে এই তিন সংগঠনের নেতৃত্ব থাকায় গণপরিবহন খাতে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর শাজাহান খান গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকায় এবং খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বিদেশে অবস্থান করায় তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা মসিউর রহমান রাঙ্গা। তিনিও আওয়ামী লীগের সময় প্রভাবশালী পরিবহন নেতা ছিলেন, ব্যবসা আছে পরিবহনে। মশিউর রহমান রাঙ্গা আত্মগোপনে থাকায় তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ক্ষমতার পালাবদলের পর বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীর্ঘদিন ধরে থাকা ওসমান আলী বর্তমানে দেশেই আছেন। একাধিক কোম্পানিতে তার বাস চলাচল করছে। তিনি শাজাহান খানের বলয়ের এখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং হারানো প্রভাব-প্রতিপত্তি ফিরে পেতে তৎপরতা চালাচ্ছেন এবং খন্দকার এনায়েত উল্যাহর পরিবহনের ব্যবসা দেখছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে ওসমান আলী আমার দেশকে বলেন, শাজাহান খানের বলয় না তবে ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সড়ক পরিবহন শ্রমিকদের সংগঠিত করা নৈতিক দায়িত্ব আমাদের। শাজাহান খান ফেডারেশনের কারণে নয়, আওয়ামী লীগের কারণে গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার মুক্তির জন্য চেষ্টা-তদবির করছি না।
গণপরিবহন ব্যবসায় থাকা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের মধ্যে শাজাহান খান ও তার ভাই হাফিজুর রহমান এবং শ্যালক সৈয়দ নুরুল হক নান্নুসহ পরিবারের আরও কয়েক জনের নামে-বেনামে পরিবহন ব্যবসা রয়েছে। খন্দকার এনায়েত উল্যাহরও এই খাতে নামে-বেনামে বড় ধরনের ব্যবসা রয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা ও সাবেক এমপি পঙ্কজ দেবনাথ, নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের নেতা ও সাবেক এমপি এ কে এম শামীম ওসমান পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত আছেন। এ ছাড়া সাবেক সংসদ সদস্যদের পরিবারের সদস্য, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ এবং আওয়ামী লীগের সহযোগী বিভিন্ন সংগঠনের নেতা, ঢাকা সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগ সমর্থক কাউন্সিলরসহ ২০-২৫ জন এই ব্যবসায় রয়েছেন। আওয়ামী লীগের সময় কিছু সরকারি কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তার আত্মীয়রাও বাস ব্যবসায় যুক্ত হন, কয়েকটি কোম্পানিতেও আছেন তারা। এসব নেতা ও লোকজন গত ১৫ বছরে বেশকিছু নতুন পরিবহন কোম্পানি খুলেছেন।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় দলটির নেতাদের দৌরাত্ম বেড়েছে গণপরিবহন খাতে। তারা পরিবহন যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে, তা ছিল জনস্বার্থের বিরুদ্ধে। আর সরকারও রাজনৈতিক কারণে মালিক-শ্রমিকদের তোষামোদি করায় যাত্রীসেবা, পরিবহন খাতের শৃঙ্খলা কাঙ্ক্ষিত ছিল না। দখলদারত্ব, আইন অমান্য করা, ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়ানোসহ নানা অনিয়ম হয়েছে এই খাতে। মোট কথা, দুষ্টচক্রের হাতে বন্দি ছিল গণপরিবহন খাত, এখনো গুণগত তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, গণপরিবহন খাতের চক্রের কারণে ৩২ বছর ধরে নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন করেও সফল হতে পারিনি। গণপরিবহন একটি বিশাল খাত, এখানে সংস্কারে একটা কমিশন হওয়া উচিত।