বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনে (পিএসসি) পতিত আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী ও আস্থাভাজনদের সদস্য নিয়োগের অভিযোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে তোলপাড় চলছে। বিশেষ করে তিনজনের নিয়োগ নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন মহলের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এরই মধ্যে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ছয় সদস্যের শপথ স্থগিত হয়ে গেছে। এ ছাড়া অভিযুক্তদের ব্যাকগ্রাউন্ড রিভিউ করা হচ্ছে বলে পিএসসি সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে পিএসসির বিতর্কিত তিন সদস্যের নিয়োগ অবিলম্বে বাতিলে আজ সংবাদ সম্মেলন করে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেবে ছাত্র-জনতা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যান্টিনে বেলা ১১টায় এই সংবাদ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। এ ছাড়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে বর্তমান সরকারের উপদেষ্টাদের সঙ্গে আলোচনাসহ নানা তৎপরতা চালানো হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সূত্র মতে, গত ২ জানুয়ারি পিএসসিতে নতুন ছয় সদস্য নিয়োগ দেয় সরকার। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার উপসচিব আবুল হায়াত মো. রফিক স্বাক্ষরিত আলাদা প্রজ্ঞাপনে এই নিয়োগের কথা জানানো হয়।
নতুন এই সদস্যরা হলেন- ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ এফ জগলুল আহমেদ, মো. মুনির হোসেন, অধ্যাপক ড. শাহনাজ সরকার, ড. মো. মিজানুর রহমান, সাব্বির আহমেদ চৌধুরী ও অধ্যাপক ডা. সৈয়দা শাহিনা সোবহান। এ নিয়ে পিএসসির সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে নতুন চেয়ারম্যানসহ ৯ সদস্য নিয়োগ পান।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনজনকে নিয়ে বিতর্ক ও অভিযোগ উঠেছে। তারা হলেন- ডা. সৈয়দা শাহিনা সোবহান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এএফ জগলুল আহমেদ ও ড. মো. মিজানুর রহমান।
এ বিষয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সংগঠক জালাল আহমেদ গতকাল শনিবার আমার দেশকে জানান, পিএসসিতে বিতর্কিত তিন সদস্যের নিয়োগ বাতিলের দাবিতে আমরা রোববার সংবাদ সম্মেলন করব। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই নিয়োগ বাতিলের জন্য আলটিমেটাম দেওয়া হবে। এরপরও বাতিল না করলে আরও কর্মসূচি দেওয়া হবে। জালাল জানান, নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের মধ্যে তিনজন বিগত আওয়ামী সরকারের সুবিধাভোগী। এদের একজন দুর্নীতিবাজ ও আরেকজন নারী কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত।
ডিজিএফআইয়ের একজন কর্মকর্তা আমার দেশকে জানান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এএফ জগলুল আহমেদ পতিত সরকারের খুবই আস্থাভাজন ও আজ্ঞাবহ ছিলেন। তাকে পিএসসির সদস্য নিয়োগ দেওয়ার খবরে তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন। যদিও নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এএফ জগলুল আহমেদ অস্বীকার করেছেন বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে। তার দাবি, আওয়ামী লীগের আমলে তিনি কোনো সুবিধা নেননি।
নিয়োগপ্রাপ্ত অপর সদস্য জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) অধ্যাপক ডা. শাহীনা সোবহানের বাবা জামালপুর-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি)। অভিযোগ রয়েছে, ডা. শাহীনা পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের নানা সুবিধা ভোগ করেছেন। তার পিতা আওয়ামী লীগের মনোনয়নে এমপি হয়েছিলেন বলেও ছাত্রনেতা জালাল আহমেদ জানান। অবশ্য ডা. শাহীনা সোবহান তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ অস্বীকার করে নিজেকে বিএনপি ঘরানার ব্যক্তি এবং আওয়ামী সরকারের সময়ে নানাভাবে বঞ্চিত বলে দাবি করেছেন। তার পিতা শহীদ জিয়াউর রহমান মনোনীত বিএনপির এমপি ছিলেন বলেও গতকাল আমার দেশকে জানান তিনি। আরেক সদস্য বিসিএস ৮৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা ড. মো. মিজানুর রহমান আওয়ামী লীগের সময়ে বিয়াম ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিষয়ে জানতে চাইলে বিয়াম স্কুলের একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আমার দেশকে বলেন, ড. মিজানুর রহমান আওয়ামী লীগ সরকারের খুবই আস্থাভাজন ও সুবিধাভোগী ছিলেন। তাকে বর্তমান সরকার কীভাবে পিএসসির সদস্য করেছে তা অবাক লাগছে।
এ বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক সাদিক কাইয়ুম আমার দেশকে বলেন, আওয়ামী ফ্যাসিস্টের পতনের পরও তাদের দোসরদের পিএসসিতে নিয়োগ দেওয়ায় আমরা উদ্বিগ্ন, শঙ্কিত। আমরা চাই ফ্যাসিস্টদের সরিয়ে দেশপ্রেমিকদের বসানো হোক, যারা সত্যিকারের মেধাবীদের নিয়োগ দিতে পারবেন।
জানা গেছে, এর আগে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ডা. মো. জালাল উদ্দিনকে পিএসসির সদস্য নিয়োগ দেওয়া নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়। পরে তার নিয়োগ বাতিল করে সরকার। এবারও সরকার বিতর্কিতদের নিয়োগ বাতিল করবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
বিতর্কিতদের নিয়োগে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের পিএসসির সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত না করার আহ্বান জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, পিএসসিতে নিয়োগ দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত যেসব নাম গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে তা দেখে জনগণ বিস্মিত। মাত্র কিছু দিন হলো ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ ফ্যাসিস্ট সরকারের কবল থেকে মুক্তি লাভ করেছে। জনগণের প্রত্যাশা হলো সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক লোকদের পাবলিক সার্ভিস কমিশনে নিয়োগ দিয়ে নিয়োগপ্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করা হবে। কিন্তু তার স্থলে ফ্যাসিবাদের দোসরদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা জনগণকে হতাশ করেছে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের চুক্তি ও বৈদেশিক নিয়োগ শাখার উপসচিব আবুল হায়াত মো. রফিক গতকাল শনিবার আমার দেশকে জানান, পিএসসির নতুন সদস্যদের বিষয়ে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত জানা নেই।
পিএসসির সচিব ড. মো. সানোয়ার জাহান ভূঁইয়া বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অভিযোগ ও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার খবরে বিতর্কের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে। পরিপ্রেক্ষিতে নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের ব্যাকগ্রাউন্ড রিভিউ করছে সরকার। যে কারণে বৃহস্পতিবার তাদের শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও তা স্থগিত করা হয়েছে। এটি কবে হবে তা এখনও ঠিক হয়নি।