হোম > আমার দেশ স্পেশাল

গবেষণাপত্র চুরিতে পটু নিপসমের সারোয়ার

আজাদুল আদনান

গোলাম সারোয়ার

গবেষণাপত্র চুরিতে হাত পাকিয়েছেন গোলাম সারোয়ার। দেশি-বিদেশি চার গবেষকের গবেষণাপত্রে নিজের নাম বসিয়ে বাগিয়েছেন বিভিন্ন পদ। গবেষণাপত্রে সহ-লেখক হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের একজনের অস্তিত্বই পাওয়া যায়নি। শুধু তা-ই নয়, অভিজ্ঞতার সনদও জালিয়াতি করেছেন এই কর্মকর্তা। এমন নানা ছলচাতুরির মাধ্যমে তিনি বসে আছেন জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের (নিপসম) কীটতত্ত্ব বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের পদে। যোগ্যতা ছাড়া নিয়েছেন ‘অধ্যাপক’ হিসেবে পদোন্নতি।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরামর্শকের কাজ করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। মূলত মশাবাহিত রোগের এনটোমোলজি ও মহামারি নিয়ে কাজ করে দেশব্যাপী পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। প্রায় তিন দশকের অভিজ্ঞতায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃত এই বিজ্ঞানী সম্প্রতি আদালতের দারস্থ হয়েছেন তার একটি গবেষণাপত্র চুরি নিয়ে।

গবেষণাপত্র চুরির বিষয়টি ড. বাশার জানতে পারেন মাস দুয়েক আগে বিদেশি এক গবেষক বন্ধুর মাধ্যমে।

চলতি বছরের অক্টোবরে অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করে তাদের কর্মস্থলে লিগ্যাল নোটিসও পাঠান তিনি। যদিও জবাব মিলেছে দায়সারা। এ অবস্থায় গবেষণা নিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের কথা চিন্তা করে অভিযুক্ত সারোয়ারের শাস্তি দাবি করেছেন তিনি। একইসঙ্গে নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) কীভাবে এমন ব্যক্তিকে নিয়োগ দিল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন ড. বাশার।

অভিযোগ অনুযায়ী ড. বাশারের ২০১৪ সালে ইন্টার‌ন্যাশনাল জার্নাল মসকুইটো রিসার্চে প্রকাশিত ‘সার্ভিলেন্স অব মসকুইটোস ইন সাম সিলেক্টেড পার্কস অ্যান্ড গার্ডেন অব ঢাকা সিটি, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণাপত্রটি প্রায় সম্পূর্ণ নকল করে ২০১৭ সালে ‘প্রগ্রেসিভ এগ্রিকালচার’জার্নালে প্রকাশ করা হয়। ‘ডিভারসাইটিস অব মসকুইটো স্পেসিস অব ডিফরেন্ট লোকেশন ইন ঢাকা সিটি’শিরোনামে প্রকাশিত নকল নিবন্ধে লেখক হিসেবে প্রকাশ করেন নিপসমের সারোয়ার ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. এম এ লতিফ।

ড. বাশার জানান, দুটি গবেষণাপত্র পাশাপাশি তুলনা করলে দেখা যায়, তার লেখার ভূমিকা, গবেষণার পদ্ধতি, ফলাফল, টেবিলচিত্র, মানচিত্র এবং তথ্য হুবহু নকল করা হয়েছে। ‘আইথেন্টিকেট সফটওয়্যারে যাচাই করে গবেষণাপত্র দুটির মধ্যে ৯৮ শতাংশই মিল পাওয়া গেছে, যা স্পষ্টত চৌর্যবৃত্তি প্রমাণ করে।

এখানেই শেষ নয়, ডেঙ্গু মশা প্রতিরোধ-সংক্রান্ত সারোয়ারের একটি গবেষণার নিবন্ধ ২০১৮ সালে প্রকাশ করে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। তাতে সহ-লেখক হিসেবে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. লতিফ। তবে অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা।

একই গবেষণাপত্র ২০১৩ সালে প্রকাশ করে একাডেমিয়া জার্নাল অব মেডিসিনাল প্ল্যান্টস। নিবন্ধটি নাইজেরিয়ান গবেষক অ্যাডওয়েল জ্যাক ও তার দলের। দেখা যায়, শিরোনাম ও লেখকের নাম পরিবর্তন করে সারোয়ার ও লতিফ গবেষণাপত্রটি নিজেদের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। বিষয়বস্তু ‘ম্যালেরিয়ার’ স্থলে লেখা হয়েছে ‘ডেঙ্গু’।

ভারতীয় গবেষক এমএস শিভকুমার ও তার দলের গবেষণাটি ছিল সারোয়ার ও লতিফের দ্বিতীয় চৌর্যবৃত্তি। যেটি ২০১৩ সালে প্রকাশ করে এশিয়ান জার্নাল অব ফার্মাসিউটিক্যাল অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল রিসার্চ। ২০১৫ সালে হুবহু নকল করে সেই নিবন্ধ তারা এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে প্রকাশ করেন।

ভুয়া গবেষক তৈরি

নাইজেরিয়ান আরেক গবেষক সিমন ওক এবং তার দলের গবেষণা প্রতিবেদন একইভাবে চুরি করেছেন সারোয়ার ও লতিফ। যেটি ২০১৫ সালে প্রকাশ করে জার্নাল অব বায়োলজি অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড হেলথকেয়ার। শিরোনাম ও লেখকের স্থলে কিছু পরিবর্তন-পরিমার্জন করে এশিয়াটিক সোসাইটির জার্নালে ২০২০ সালে সেই গবেষণাপত্র নিজেদের নামে প্রকাশ করেন তারা। এখানে নতুন করে সহ-লেখক হিসেবে এসএম উদ্দিনের নাম যুক্ত করা হয়েছে।

সারোয়ার তার গবেষণা প্রতিবেদনে সহ-লেখক হিসেবে এসএম উদ্দিনের কর্মস্থলের ঠিকানা দেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) কার্যালয়। মাঠ পর্যায়ে অনুসন্ধানে গেলে এসএম উদ্দিনের নামে কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। উল্লিখিত কর্মস্থল ডিএনসিসি কার্যালয়ে গিয়েও এমন কোনো ব্যক্তির হদিস মেলেনি।

জানতে চাইলে ডিএনসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা জোবায়ের হোসেন আমার দেশকে জানান, ‘এই দপ্তরে এসএম উদ্দিন নামে কারো অস্তিত্ব নেই। অতীতের রেকর্ড ঘেঁটেও এমন কাউকে পাওয়া যায়নি। কেউ প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে নামটি ব্যবহার করতে পারেন।’

প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকের নকল সনদ

পেশাজীবনের অভিজ্ঞতায় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টসের (ইউল্যাব) সাধারণ শিক্ষায় প্রভাষক এবং পরবর্তীতে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে চাকরির কথা জীবনবৃত্তান্তে উল্লেখ করেছেন সারোয়ার। চাকরির মেয়াদ দেখিয়েছেন ২০০৪-১২ সাল পর্যন্ত। ১০ বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতার দাবি করেছেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়েও। যেখানে ভয়াবহ জালিয়াতি করেছেন সারোয়ার। সরেজমিনে এসব অভিজ্ঞতার অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

গত ২ ডিসেম্বর ইউল্যাব বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) ফয়জুল ইসলাম আমার দেশকে জানান, ‘২০০৪ থেকে ১২ সাল পর্যন্ত সাধারণ শিক্ষা শাখায় সারোয়ার নামে কোনো শিক্ষক ছিলেন না। বিষয়টি আমরা কয়েকবার যাচাই করেছি, কোথাও এই নাম পাওয়া যায়নি।’

অন্যদিকে দেশসেরা আরেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নর্থ সাউথে গিয়েও সারোয়ারের উল্লিখিত অভিজ্ঞতার বিপরীত তথ্য পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. আহমেদ তাজমিন লিখিতভাবে জানান, ‘সম্প্রতি সারোয়ারের গবেষণাপত্রের বিষয়ে বেশকিছু অভিযোগ পেয়েছি আমরা। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তদন্ত করছে।’

তিনি আরো জানান, ‘২০১২ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির পাবলিক হেলথ বিভাগের একটি কোর্সের এক ভাগ পড়িয়েছিলেন সারোয়ার। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে তার কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ নেই।’

গবেষণা প্রতিবেদন চুরি থেকে শিক্ষকতার সনদ জালিয়াতি। এসব অপকর্ম দিয়েই নিপসমের মতো একটি প্রতিষ্ঠানের অধ্যাপক পদে বসেছেন সারোয়ার। বাগিয়েছেন বিভাগীয় প্রধানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদও। জাল-জালিয়াতিতে ভরা এ একই নথিপত্র নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠান পিএসসিতেও জমা আছে।

অনুন্ধানে জানা গেছে, মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনে প্রতারকের মাধ্যমে জাল সনদ তৈরি করেছেন সারোয়ার। জাল সনদ তৈরির কথা স্বীকারও করেছেন তিনি।

সরানো হয়েছে চুরির গবেষণাপত্র

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গবেষণা চুরির বিষয়টি আলোচনায় আসার পর শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য লতিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তার প্রোফাইল থেকে ওই গবেষণা প্রতিবেদনসহ আরো কয়েকটি নিবন্ধ সরিয়ে নিয়েছেন। তবে একেবারে মুছে ফেলার সুযোগ না থাকায় রয়ে গেছে গবেষণার সারাংশ।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সারোয়ারের জালিয়াতিতে সহযোগিতার পাশাপাশি উপাচার্য লতিফের গবেষণা চুরির বিষয়টিও। এখন পর্যন্ত ৬৭টি গবেষণা প্রবন্ধ আছে ড. লতিফের। এর মধ্যে ছয়টিতে চৌর্যবৃত্তির প্রমাণ মিলেছে। যার কোনোটিতে তার এক শিক্ষার্থী আগে প্রকাশিত গবেষণার ফলাফল চুরি করেছেন, আবার কোনোটিতে তিনি নিজেই শিক্ষার্থীর সম্পূর্ণ গবেষণা নিজের নামে চালিয়ে দিয়েছেন। তার এসব নিবন্ধ আগে প্রকাশিত একইরকম গবেষণার সঙ্গে ৯২ থেকে ৯৮ শতাংশ মিলে যায়। এর মধ্যে বাদ যায়নি সরাসরি ফলাফল চুরিসহ সাধারণ লেখাও। এছাড়া ২০১৩ সালে আবদুর রাজ্জাক নামে এক শিক্ষার্থীর করা থিসিস সম্পূর্ণ নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ জার্নাল অব এন্টোমোলজিতে প্রকাশ করেন ড. লতিফ।

এ ব্যাপারে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘সার্ভার নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, তাই ওই থিসিসটি ডিলিট হয়ে যায়। পরে সংযোজন করা হয়েছে।’

গবেষণা চুরির বিষয়ে জানতে চাইলে উপাচার্য লতিফ আমার দেশকে বলেন, ‘এসব পেপার প্রকাশের আগে জার্নাল এবং সারোয়ার আমাকে জানাননি। এ কারণে সমস্যা হয়েছে।’নিজের জীবনবৃত্তান্তে যুক্ত করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন সেগুলো নেই। ডিলিট (মুছে দেওয়া) করা হয়েছে।’

প্রতারণার পরও ব্যবস্থা নিতে পারছে না নিপসম

কীটতত্ত্ব বিভাগের প্রধানের এসব জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাইলে নিপসমের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জিয়াউল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘এটি সুস্পষ্ট প্রতারণা, যা কখনই হওয়া উচিত নয়। কিন্তু তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো ক্ষমতা নিপসমের হাতে নেই। কারণ, নিয়োগ দিয়েছে পিএসসি, শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ারও তাদের হাতে।’

গবেষণা চুরির বিষয়ের জানতে চাইলে সারোয়ার শুরুতে সংবাদ না করার অনুরোধ করেন। পরে বলেন, ‘বিষয়টি মীমাংসিত, এগুলো নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করার কী দরকার।’

সনদ জালিয়াতির বিষয়টিও স্বীকার করেন তিনি। সারোয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘এক লোকের মাধ্যমে ইউল্যাব থেকে অভিজ্ঞতা সনদ বানিয়ে নেন তিনি।’

বিশ্লেষক ও আইনজ্ঞরা বলছেন, গবেষণাপত্র চুরি ও জাল অভিজ্ঞতা দেখিয়ে যে পদপদবি বাগিয়েছেন সারোয়ার, তা ফৌজদারি অপরাধ। শাস্তি হিসেবে কারাদণ্ড হতে পারে তার।

বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সচিব ড. ফখরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে, এটি খতিয়ে দেখা হবে। সত্যতা পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা নিয়োগ দিই না; কিন্তু কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে গবেষণা চুরি ও সনদ জালিয়াতির মতো গুরুতর অপরাধের অভিযোগ এলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয় ইউজিসি, এখানেও তা-ই হবে।’

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব সাইদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, ‘গুরুতর অভিযোগ। অবশ্যই মন্ত্রণালয় তদন্ত করবে। অভিযোগ সত্য হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বস্ত্রশিল্পের ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ গিলে খাচ্ছে ভারত

প্রশাসনজুড়ে স্থবিরতা, নতুন সরকারের অপেক্ষা

অপরাধীদের চটকদার ডাকনাম

সাইবার সন্ত্রাসের কবলে উদীয়মান নারী নেত্রীরা

দ্বৈত নাগরিকত্বের ফাঁড়া কাটল অধিকাংশ প্রার্থীর

শহীদদের ৮০ ভাগই তরুণ, সাধারণ মানুষ

ভোটের দায়িত্বে কেউ আগ্রহী, কেউ নারাজ

মুজিববন্দনার নামে সৃজনশীল প্রকাশনা খাতে ব্যাপক লুটপাট

ফুটপাতের অস্তিত্ব শেষ, সড়কের অর্ধেকই হকারের পেটে

খালেদা জিয়াকে বাড়ি থেকে উচ্ছেদের কুশীলবেরা