ইসলামি রাজনীতিবিদ মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ধর্মীয় ও দলীয় কর্মকাণ্ডেই বেশির ভাগ সময় পার করেন। অথচ ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে মামলা করা হয় তার বিরুদ্ধে। সেই মামলায় জামিন নেওয়ার পরও বিনা ওয়ারেন্টে তাকে গ্রেপ্তার করে নতুন নতুন মামলা দিয়ে কারারুদ্ধ করে পতিত আওয়ামী সরকার। দেশের বড় একটি দলের একজন কেন্দ্রীয় নেতা হলেও গ্রেপ্তারের পর তার সঙ্গে আচরণ করা হয় খুনের আসামিদের মতো। বিনা অপরাধে দুই দফায় গ্রেপ্তার হয়ে প্রায় চার বছর জেল খাটেন তিনি। এ সময় দেড় মাস রিমান্ডের অমানসিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয় তাকে। চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদের সময় চরম দুর্ব্যবহারের পাশাপাশি কারেন্টের চেয়ারে বসানোরও হুমকি দেয় পুলিশ।
দীর্ঘদিন কারাভোগের পর হাইকোর্ট থেকে জামিনে মুক্তির মুহূর্তে কয়েক দফায় জেলগেট থেকে গ্রেপ্তারের ঘটনা ছিল তার জন্য আরও অমানবিক। এ ছাড়া হ্যান্ডকাপ ও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে আদালতে আনা-নেওয়া করা হয় তাকে। জেলে থাকা অবস্থায়ও বাইরের কথিত সহিংস ঘটনার অভিযোগে মামলার ঘটনায় বেশ হতবাক হয়েছিলেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। মূলত, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে যারাই কথা বলেছেন, তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের স্টিম রোলার পরিচালনা করা হয়েছে বলে মনে করেন এই আলেম।
আওয়ামী দুঃশাসনে দেশের আলেম-ওলামাদের নির্যাতন প্রসঙ্গে রফিকুল ইসলাম খান আমার দেশকে বলেন, ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচন ছিল একটি ষড়যন্ত্র এবং সমঝোতার নির্বাচন। এই নির্বাচন হয়েছিল মঈনুদ্দিন-ফখরুদ্দিন, হাসিনা এবং ভারতের ত্রিপক্ষীয় সমঝোতার ভিত্তিতে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য। বাস্তবে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। সরকার গঠনের পর থেকেই তারা কয়েকটা এজেন্ডা নিয়ে কর্মকাণ্ড পরিচালনা শুরু করে। প্রথমেই তারা হাত দেয় দেশপ্রেমিক চৌকস সেনাবাহিনীর গণহত্যায়। সে সময় মেজর জেনারেল থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের লাইনে দাঁড় করিয়ে ঠান্ডা মাথায় পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
এরপরই তারা হাত দেয় ইসলামপন্থি লোকদের ওপর। ইসলামপন্থি লোকদের প্রধান রাজনৈতিক বা ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বকে শেষ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই যুদ্ধাপরাধের নামে হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করা হয়েছে। বিচারের নামে তামাশা করা হয়েছে। অন্যায়ভাবেই জামায়াত নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচার কোন ধরনের ষড়যন্ত্র ছিল তা বোঝা যায়, ওই তালিকায় ৫/৬ নম্বরে আমার নাম থাকায়। অথচ মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ৪/৫ বছর। শেষ পর্যন্ত তারা পিছিয়ে এসেছে। এই বিচারটাই ছিল ইসলামি নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার জন্য।
ইসলামপন্থিদের ওপর আওয়ামী সরকারের নির্যাতনের ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালের জুলাইয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে অভিযোগের মামলায় গ্রেপ্তার করা হয় মাওলানা রফিকুল ইসলাম খানকে। আর সেই মামলাটি করেছিল আওয়ামী জোট সরকারের শরিক বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশনের মহাসচিব রেজাউল হক চাঁদপুরী। ‘নিজামীকে মহানবীর সঙ্গে তুলনার’ অভিযোগে ওই মামলার আগেই গ্রেপ্তার হন জামায়াতের তৎকালীন আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও নায়েবে আমির মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, এ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে আমি একটানা ৩০ দিন রিমান্ডে ছিলাম। ওই সময় সর্বোচ্চ রিমান্ড দেওয়া হয় আমাকে। সম্পূর্ণ বিনা অপরাধে সেবার দীর্ঘ এক বছর কারাভোগ করতে হয় আমাকে।
তিনি বলেন, ২০১০ সালে গ্রেপ্তারের সময় তার নামে থাকা কয়েকটা মামলায় জামিনে ছিলেন। কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ছিল না, গ্রেপ্তারের কোনো কারণও ছিল না। তাকে গ্রেপ্তারের সময় মিরপুর-১০ নম্বরের বাসায় গিয়ে পুলিশ জানায় মিরপুর থানার ওসি সাহেব সালাম দিয়েছেন। এ সময় তিনি ওসির সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করেন, আইজিপির সঙ্গে কথাও বলেন। তিনি বলেছিলেন, আমার নামে তো কোনো মামলা নেই। আইজিপি বললেন, মামলা না থাকলে তো গ্রেপ্তারের কথা না, দেখছি বিষয়টা। কিন্তু পরে আর তিনি ফোন ধরেননি।
রফিকুল ইসলাম খান বলেন, আটকের পর তাকে মিরপুর থানায় নেওয়া হয়। থানায় আনার কারণ জানতে চাইলে ওসি এবং ডিসি কোনো জবাব দেননি। পরে তাকে নেওয়া হয় ডিবিতে। তখন ডিবিতে ছিলেন মনিরুল। রোজার দিন তাকে সেখানে বসিয়ে রাখা হয়। নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি ডিবি অফিসারদের বললেন, ধর্মের জন্যই আমাদের লড়াইÑ অথচ সেই ধর্ম অবমাননার অভিযোগে আমাদের নামে মামলা দেওয়া হয়েছে। সেই মামলায়ও আমি জামিন নিয়েছি। তখন তারা কাগজপত্র দেখাতে বললেন, কাগজপত্র দেখে ফোনে সম্ভবত কোনো মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন, তার সব মামলায় তো জামিন আছে। তখন অন্য প্রান্ত থেকে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধের সঙ্গে জড়ানো যায় না? তখন ডিবি অফিসার বলেন, তখন তো তার বয়স কম ছিল, কীভাবে জড়াব? তাহলে অন্য মামলায় জড়াতে বলেন ওই ব্যক্তি, সে অনুযায়ী নতুন মামলা দেওয়া হয়।
এভাবে একটার পর একটা মামলা দেওয়া হয় এই আলেমের বিরুদ্ধে। একটাতে জামিন নিলে আরেকটা মামলা দেওয়া হয়। এসব মামলায় ৫, ১০ দিন করে একটানা ৩০ দিন রিমান্ডে কাটাতে হয় তাকে। তিনি বলেন, আমাকে আরও মামলা দেওয়ার এবং রিমান্ডে নেওয়ার পরিকল্পনা তাদের ছিল। কিন্তু সর্বশেষ আমার বিরুদ্ধে মামলা দেয় যে, নটর ডেম কলেজের সামনে আমি সরাসরি গাড়ি থেকে মানুষ নামিয়ে পিটাই এবং গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিই। অথচ ওই সময় আমি জেলে ছিলাম। এ মামলায় আবার ১০ দিন রিমান্ডও চাওয়া হয়। আদালতে আমার আইনজীবী ম্যাজিস্ট্রেটকে বিষয়টি জানান, জেলে থেকে গাড়ি পোড়ালেন আর মানুষ মারলেন কীভাবে? তখন ম্যাজিস্ট্রেট হেসে বললেন, খান সাহেব খুব পাওয়ারফুল লোক। জেলে থেকেও তিনি গাড়ি পোড়ান, মানুষ মারেন! সরকারি এপিপিকেও বিষয়টি জিজ্ঞাসা করেন, জেলে থেকে মানুষ মারলেন কীভাবে? তাকে ম্যাজিস্ট্রেট আরও বলেন, উনি পরিচিত লোক, জেলে থাকলে তো মামলা দেওয়া ঠিক হয়নি।
আমার আইনজীবী মামলাটি খারিজ চেয়েছিলেন, কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট খারিজ করেননি। তিনি এতটুকু করেছেন, এই মামলায় আর রিমান্ড না দিয়ে জেলে পাঠান। এতে আমি কিছুটা স্বস্তি পেলাম এই কারণে যে, রিমান্ডে না গিয়ে জেলে গেলেও কিছুটা বাঁচা গেল। সেবার প্রায় এক বছর জেলে ছিলাম।’
রিমান্ডে নির্যাতন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘রিমান্ডে আমার সঙ্গে খুবই দুর্ব্যবহার করেছে। আমার চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসা করে। এ সময় কারেন্টের চেয়ারে বসানোর হুমকিও দেওয়া হয়। আমি তাদের বলি, আমাদের মতো লোকদের সঙ্গে আপনারা যে আচরণ করছেন, বিষয়টা আপনাদের তো ভাবা দরকার। কারণ এ সরকারই তো আর শেষ সরকার নয়। তখন একজন বলেন, এ লোক তো বাইরেও লম্বা লম্বা কথা কয় আবার আমাদের সামনে এসে একই ধরনের কথা বলছে। আমি বললাম, মরার আগ পর্যন্ত আমি এ কথা বলব। কারণ আমি তো চুরি করে জেলে আসিনি। আপনারা তো জুলুম করছেন। তখন একটু চুপ হয়। এভাবে আমাদের সঙ্গে তারা খুবই খারাপ আচরণ করেছে।’
দীর্ঘ এক বছর জেল খেটে মুক্তির পরও দলীয় কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন রফিকুল ইসলাম খান। জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। তবে গ্রেপ্তার এড়াতে অত্যন্ত সতর্কভাবে চলাফেরা করতেন। এরই মধ্যে ২০১৩ সালে শাপলা চত্বরের নৃশংস হত্যাকাণ্ডসহ আলেম-ওলামা নির্যাতনের বহু ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে ২০২১ সালে মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং ইসলামবিরোধী বিভিন্ন ইস্যুতে ধর্মীয় দল ও আলেম-ওলামারা সোচ্চার হলে তাদের ওপর দমন-পীড়নের মাত্রা বেড়ে যায়। এমনই পরিস্থিতিতে দ্বিতীয় দফায় গ্রেপ্তারের শিকার হন মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।
সে সময় আলেম-ওলামা নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ২০২১ সালে আমাদের গ্রেপ্তার করে প্রায় তিন বছর জেলে আটক করে রাখা হয়েছিল। এ সময় জেলখানায় বড় আলেমদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যারা শুধু ইসলামপন্থি হওয়ার কারণে, হক কথা বলার কারণে জেলখানায় আটকে রাখা হয়েছে। বড় আলেমদের ওপর অত্যাচার করা হয়েছে। ডিবি অফিসে আমাকে তো রিমান্ডের সময় চোখ বাঁধা হয়েছিল। অবশ্য ওই নির্যাতনের মূল নায়ক যিনি ছিলেন, তিনি এখন জেলে। বহু মামলার আসামিও।
তিনি বলেন, এভাবে ইসলামপন্থি ও আলেমদের ওপর পতিত স্বৈরাচারী সরকারের আলাদা একটা আক্রোশ ছিল। তাদের এজেন্ডাই ছিল বাংলাদেশ থেকে ইসলাম নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। ইসলামি দল নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। বিশেষ করে জামায়াত-শিবিরকে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছিল। আর জামায়াত-শিবিরকে নিশ্চিহ্ন করতে তার লিডারশিপকে নিশ্চিহ্ন করার ধারাবাহিকতায় তথাকথিত যুদ্ধাপরাধের নামে ট্রাইব্যুনাল করে শীর্ষ নেতাদের ফাঁসির এই কাণ্ড করা হয়। আমরা বিশ্বাস করি, জাতি তাদের কথা কেউ বিশ্বাস করেনি। বরং আমাদের নেতাদের যখন পায়ে ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে কোর্টে নেওয়া হতো, তখন জনগণের চোখে পানি পড়তে দেখা যায়। অথচ এখন যাদের গ্রেপ্তার করে কোর্টে আনা হচ্ছে, তখন সেই জনগণই তাদের কিল-ঘুষি ও লাথি মারছে। এতে বোঝা যায়, আমাদের ওপর জুলুম করা হয়েছে। এখন যারা গ্রেপ্তার হচ্ছে, তারা জালেম। এ জন্য তাদের সঙ্গে আচরণ সম্পূর্ণ আলাদা।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তারা যে পরিবেশ বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, তা আর তৈরি হবে বলে আমরা বিশ্বাস করি না। ইসলামের ওপর জুলুম-নির্যাতন, ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা দীর্ঘ করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তা আর কেউ করতে পারবে না। কেউ চেষ্টা করলে হাসিনা যেভাবে অপমান-লাঞ্ছিত হয়ে বিদায় নিয়েছেন, তার চেয়েও পরিণতি হবে ভয়াবহ।
মাওলানা রফিকুল ইসলাম খাঁনের জন্ম ১৯৬৬, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার নওকৈড় গ্রামে। স্থানীয় মাদরাসা দাখিল ও বিভিন্ন মাদরাসা থেকে কামিল পর্যন্ত পড়েছেন। এরপর তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামি শিক্ষা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির সিনেট সদস্যও হয়েছেন তিনি। কেন্দ্রীয় ছাত্ররাজনীতি থেকে আসেন জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে।