হোম > আমার দেশ স্পেশাল

বন্ধের পথে জনতা ব্যাংকের আরব আমিরাত কার্যক্রম

আবু আলী

মূলধন সংকটের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএইচ) চারটি শাখা বন্ধের পথে। স্থানীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে মূলধন ঘাটতি পূরণের ৮১.৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেল-ইন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ব্যাংকটির আমিরাতভিত্তিক কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া তদারকি করার জন্য নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘ক্রাউ ইউএই’কে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ৫২ বছর ধরে পরিচালিত এই শাখাগুলোর মাধ্যমে প্রতি বছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার (৮০ থেকে ১০০ বিলিয়ন টাকা) রেমিট্যান্স দেশে আসত, যা বন্ধের উপক্রম হওয়ায় বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই) ই-মেইলে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি জানিয়েছে। গত ৮ অক্টোবর থেকে এ নিয়োগ কার্যকর হয় বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ তথ্য উঠে এসেছে।

অর্থ বিভাগ সূত্র জানিয়েছে, মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় জনতা ব্যাংকের ঢাকা প্রধান কার্যালয় থেকে ৩০০ মিলিয়ন দিরহাম, যা প্রায় ৮১.৬৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ, পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান পরিপালনে ঘাটতির কারণ দেখিয়ে সিবিইউএই এ অর্থ মূলধন সহায়তা হিসেবে গ্রহণে সম্মতি দেয়নি। একই সঙ্গে ব্যাংকটির মূলধন বাড়ানোর আবেদন নাকচ করে ইউএইতে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে।

জানা গেছে, গত ৬ অক্টোবর ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য পাঠানো অর্থ ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় নিউ ইয়র্কে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে জনতা ব্যাংকের নস্ট্রো হিসাবে স্থানান্তর করা হয়েছে। একই সঙ্গে পরবর্তী নির্দেশনা না পাওয়া পর্যন্ত অর্থটি অন্য কোনো কাজে ব্যবহার না করতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের ট্রেজারি বিভাগকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ইউএইতে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া এবং ক্রো ইউএইকে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়টি জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও অর্থ বিভাগের সচিব এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে চিঠি পাঠানো হয়েছে।

এর আগে ইউএই কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সিবিইউএই) তাদের কাছে থাকা জনতা ব্যাংকের এই শাখাগুলোর অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলার ওপর (ডেবিট লেনদেন) নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। একই সঙ্গে নতুন গ্রাহক হিসাব খোলা বন্ধ রাখতে বলেছে এবং বিদ্যমান ব্যবসা ধাপে ধাপে গুটিয়ে ফেলার প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে ইউএইতে ব্যাংকটির কার্যক্রম সচল রাখতে অর্থ বিভাগের কাছে ২ বিলিয়ন দিরহাম সমপরিমাণ মূলধন জোগানের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি চেয়েছিল জনতা ব্যাংক। তবে মূলধন সহায়তা এবং ঘাটতি পূরণে জনতা ব্যাংকের উদ্যোগ সত্ত্বেও ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি। প্রশাসক নিয়োগের ফলে ব্যাংকটির কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া আরো এক ধাপ এগিয়েছে। এ প্রক্রিয়ার ব্যয়ও জনতা ব্যাংককে বহন করতে হবে।

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান ফজলুর রহমান আমার দেশকে বলেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। মূলধন ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নেওয়ার পরও তারা আমাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

জানা গেছে, ১৯৭৪ সাল থেকে ইউএইতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে জনতা ব্যাংক। বর্তমানে দেশটিতে ব্যাংকটির চারটি শাখা ও একটি প্রধান নির্বাহী কার্যালয় রয়েছে। শাখার সংখ্যার হিসাবে এটি ইউএইতে পরিচালিত বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম বলে সংশ্লিষ্ট মূল্যায়নে উল্লেখ করা হয়েছে।

ব্যাংকটির ইউএই কার্যক্রমের সঙ্গে প্রায় ৭০ হাজার আমানতকারী, ৩,৮০০ ঋণ ও অগ্রিম গ্রহীতা এবং প্রায় ১০ লাখ রেমিট্যান্স প্রেরক যুক্ত রয়েছেন। ফলে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি প্রবাসীদের ব্যাংকিং সেবা এবং দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

জানা গেছে, জনতা ব্যাংক বর্তমানে ইউএই থেকে বছরে আনুমানিক ৮,০০০ থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার রেমিট্যান্স দেশে পাঠায়। তবে কার্যক্রম বন্ধের পর এসব গ্রাহকের হিসাব, আমানত ও রেমিট্যান্স সেবা কীভাবে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা এখনো জানা যায়নি।

জানা গেছে, ২০২১ সালে ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশি ব্যাংকগুলোর ন্যূনতম মূলধনের শর্ত ৪০ মিলিয়ন দিরহাম থেকে বাড়িয়ে ৪০০ মিলিয়ন দিরহাম করে। কিন্তু জনতা ব্যাংকের ইউএই ইউনিটের পরিশোধিত মূলধন ছিল ১০০ মিলিয়ন দিরহাম। এর সঙ্গে ৮৩ মিলিয়ন দিরহাম অবণ্টিত মুনাফা থাকলেও নতুন নির্ধারিত সীমার তুলনায় বড় ঘাটতি থেকে যায়।

এ ঘাটতির পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ জুলাই ২০২৬ থেকে জনতা ব্যাংকের ইউএইর কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রক্ষিত রিজার্ভ হিসাব থেকে ডেবিট লেনদেনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এর এক সপ্তাহ পর, ১৫ জুলাই, ব্যাংকটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে তিন বছরের মধ্যে তা সম্পন্ন করার নির্দেশ দেয় ইউএইর নিয়ন্ত্রক সংস্থা। একই সঙ্গে প্রশাসক নিয়োগের নির্দেশনাও দেওয়া হয়।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রশাসক নিয়োগ ও কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু না করলে ১৪ সেপ্টেম্বরের পর ব্যাংকটির রিজার্ভ হিসাব স্থায়ীভাবে স্থগিত করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার পক্ষ থেকে প্রশাসক নিয়োগের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছিল।

পরিস্থিতি সমাধানের লক্ষ্যে গত ১৮ আগস্ট ইউএইতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহকারী গভর্নরের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে জনতা ব্যাংকের জন্য ২ বিলিয়ন দিরহাম মূলধন সহায়তার প্রতিশ্রুতি এবং প্রতিটি শাখার জন্য ন্যূনতম ১০০ মিলিয়ন দিরহাম মূলধন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এরপর ১ সেপ্টেম্বর জনতা ব্যাংকের ইউএই কার্যক্রমের প্রধান নির্বাহী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করবে। পাশাপাশি প্রশাসক নিয়োগ ও অন্যান্য নিয়ন্ত্রক শর্ত পরিপালনের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে বলেও জানানো হয়।

সব মিলিয়ে মূলধন ঘাটতি, নিয়ন্ত্রক বিধিবিধান পরিপালনে ব্যর্থতা এবং মূলধন বাড়ানোর উদ্যোগে সাড়া না পাওয়ায় ইউএইতে জনতা ব্যাংকের দীর্ঘদিনের কার্যক্রম এখন বন্ধের মুখে। এর প্রভাব ব্যাংকটির গ্রাহক, প্রবাসী বাংলাদেশি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের ওপর কতটা পড়বে, তা নির্ভর করবে কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হয় তার ওপর।

অবৈধ রিসোর্টে আগুন কেড়ে নিল ১০ জীবন

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা

বিপুল বকেয়া ও অবকাঠামোগত দুর্বলতায় ধুঁকছে টেলিটক

চিকিৎসার মানচিত্রে অন্ধকারে উপজেলা

যুদ্ধের ভয়াবহতায় জ্বালানির বিকল্প উৎস খুঁজছে সরকার

কুকি-চিনের নাথান বম আবার আলোচনায়

কৃষির বি-স্ট্রং প্রকল্পে পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতি

গণহত্যাকারী দল হিসেবে আ.লীগের বিচার কতদূর

তালিকায় নাম, আছে মামলাও—তবু অধরা ছিনতাইকারীরা

টানা ফ্লাইট বাতিলে আর্থিক চাপে এভিয়েশন খাত