ভোটারপ্রতি ১০ টাকা
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থীদের নির্বাচনি ব্যয়ের সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিধি অনুযায়ী, একজন প্রার্থী ভোটারপ্রতি সর্বোচ্চ ১০ টাকা খরচ করতে পারবেন। তবে আসনভেদে ভোটারসংখ্যায় বড় ধরনের ব্যবধান থাকায় প্রার্থীদের ব্যয়ের ক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে পাহাড় সমান বৈষম্য। এর ফলে গাজীপুর-২ আসনের প্রার্থীর ব্যয়ের বৈধতা থাকছে যেখানে ৮০ লাখের বেশি টাকার, সেখানে ঝালকাঠি-১ আসনের প্রার্থীর ব্যয়সীমা মাত্র ২৫ লাখ টাকা। ইসির দায়িত্বশীল সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।
ইসির তথ্যমতে, দেশে বর্তমানে ভোটার প্রায় ১২ কোটি ৭৭ লাখ। এর মধ্যে গাজীপুর-২ আসনে ভোটার সর্বোচ্চ (৮ লাখ ৪ হাজার)। নিয়মানুযায়ী এখানকার প্রার্থীরা ৮০ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ করতে পারবেন। বিপরীতে ঝালকাঠি-১ আসনে ভোটার সবচেয়ে কম (২ লাখ ২৮ হাজার)। ফলে সেখানকার প্রার্থীরা ব্যয়ের সর্বনিম্ন সীমা ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করতে পারবেন।
ইসির ভোটার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাজীপুর-২ ছাড়াও বেশি ভোটারের আসন হচ্ছে ঢাকা-১৯, গাজীপুর-১ ও নোয়াখালী-৪। এর মধ্যে ঢাকা-১৯ আসনে ভোটার ৭ লাখ ৪৭ হাজার ৭০ জন, গাজীপুর-১ আসনে ৭ লাখ ২০ হাজার এবং নোয়াখালী-৪ আসনে ৭ লাখ ৩ হাজার। এসব আসনে ব্যয়ের সীমা ৭০ থেকে ৮৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে প্রায় ২০টি আসনে ভোটার ৩ লাখের নিচে। আসনগুলো হচ্ছে— ময়মনসিংহ-৩, সাতক্ষীরা-৪, নীলফামারী-৩, নড়াইল-১, ঢাকা-৬, নেত্রকোনা-৫, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬, নরসিংদী-২ ও ৩, জামালপুর-২, লক্ষ্মীপুর-১, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১, ঢাকা-৮, মেহেরপুর-২, বাগেরহাট-৩, চট্টগ্রাম-৩, খুলনা-৩, পিরোজপুর-৩, ঝালকাঠি-১ ও যশোর-৬। মাঝারি ভোটারসংখ্যা তথা ৭ লাখের কম ও ৬ লাখের ওপরে ভোটার রয়েছেন ৫২টি আসনে। একইভাবে ৫ লাখের কম ও ৪ লাখের বেশি ভোটারের আসন ১১৩টি। আর ৩০০ আসনের মধ্যে প্রায় ১০৪টি আসনে ভোটার ৩ থেকে ৪ লাখের মধ্যে।
নির্বাচনি ব্যয়ের এই সীমা বাস্তবসম্মত কি না এবং এটি আদৌ কার্যকর হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আমার দেশকে বলেন, কাগজে-কলমে ব্যয়ের একটা সীমা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। আমাদের নির্বাচনি ব্যবস্থায় টাকার খেলা এতটাই প্রবল, ইসির এই ১০ টাকার হিসাব অনেকটাই উপহাসের মতো। এছাড়া আসনওয়ারি ভোটারসংখ্যার এই বিশাল তারতম্য প্রার্থীদের মধ্যে একধরনের অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করে। সঠিক সীমানা পুনর্নির্ধারণ না হওয়ায় এই বৈষম্য দূর হচ্ছে না।
এ ক্ষেত্রে নজরদারির অভাবকেই মূল সমস্যা বলে মনে করেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ইসি ব্যয়সীমা নির্ধারণ করে ঠিকই, কিন্তু প্রার্থীরা হলফনামায় যে হিসাব দেন, তা যাচাই করার শক্তিশালী কোনো মেকানিজম ইসির নেই। কঠোর নজরদারি ও শাস্তির দৃষ্টান্ত না থাকায় প্রার্থীরা কোটি কোটি টাকা খরচ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন। এটি বন্ধ করতে হলে শুধু নির্বাচনি আইন নয়, রাজনৈতিক সদিচ্ছাও প্রয়োজন।
ইসি সচিবালয়ের মতে, প্রশাসনিক অখণ্ডতা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আসনগুলোতে ভোটারসংখ্যার সমতা বজায় রাখা সম্ভব হয় না। কর্মসংস্থানের কারণে মানুষ শহরমুখী হওয়ায় গাজীপুর বা ঢাকার মতো আসনগুলোতে ভোটার বেড়েছে কয়েক গুণ, কিন্তু গ্রামীণ আসনগুলোতে সেই তুলনায় ভোটার কম। ফলে আসনওয়ারি ভোটারের সংখ্যায় বৈষম্য রেখেই সংসদীয় আসনবিন্যাস করা হয়। ফলে কেউ ২৫ লাখ টাকা খরচ করে আবার কেউ ৮৫ লাখ টাকা খরচ করে নির্বাচন করবেন।
আরপিও অনুযায়ী, কোনো প্রার্থী ব্যয়সীমা লঙ্ঘন করলে এবং তা প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এবারের নির্বাচনে ৫৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫১টি দল অংশ নিচ্ছে। এসব দলের মনোনীত ও স্বতন্ত্র হিসেবে ২৫৮২ জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।
এসআই