হোম > আমার দেশ স্পেশাল

আতঙ্কের জনপদ মোহাম্মদপুর সক্রিয় অর্ধশত অপরাধী চক্র

মাহমুদা ডলি

মোহাম্মদপুরে এক নারীর ব্যাগ ছিনতাইয়ের চেষ্টা। ফাইল ছবি

চাঁদাবাজিতে অস্থির হয়ে উঠেছে দেশের মানুষ। ফুটপাত থেকে শুরু করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, নদীর ঘাট, পরিবহন, বালুমহাল— এমন কোনো সেক্টর নেই, যেখানে চাঁদাবাজি হচ্ছে না। আগে চাঁদাবাজিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী বা মাফিয়া গডফাদারদের আধিপত্য ছিল, এখন টোকাইও চাঁদাবাজিতে নেমেছে। চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শ্যামলী এলাকা পরিণত হয়েছে আতঙ্কের জনপদে।

চাঁদা না দিলে মারধর, হুমকি-ধমকি এবং নানা হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বাড়ি করতে চাঁদা দিতে হয়, ব্যবসা শুরু করতে চাঁদা দিতে হয়, মাছ ধরতে গিয়েও চাঁদা দিতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রকাশ্যে খুনের শিকার হচ্ছেন খোদ রাজনৈতিক কর্মীরাও।

জানা গেছে, গত ৮ জুন মৌচাকে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করতে গিয়ে খুন হন স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা বিল্লাল হোসেন। মোহাম্মদপুর ও ধানমণ্ডি এলাকার ফুটপাত ও পরিবহনে এককভাবে চাঁদাবাজি করে আসছিল টিটিন। এই চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করেই তাকে গুলি করে হত্যা করে প্রতিপক্ষ। সংবাদ সম্মেলনে এমনটি দাবি করেছিল তার পরিবার।

এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দীর্ঘকাল কারাবাস শেষে একে একে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী। জেল থেকে বেরিয়েই তারা বিভিন্ন এলাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ফলে আন্ডারওয়ার্ল্ড আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এবং শুরু হয়েছে একের পর এক নৃশংস ও রক্তাক্ত খুনোখুনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয়তা এবং অপরাধীদের দমনে দৃশ্যমান ব্যর্থতার কারণে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, মিরপুর, পল্লবী, ভাষানটেক, কেরানীগঞ্জ, যাত্রাবাড়ীসহ বেশকিছু এলাকা এখন সাধারণ মানুষের জন্য মৃত্যুকূপ ও চরম আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে।

পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সারা দেশে চাঁদাবাজির কারণে ৬৯৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। আর এসব মামলার ৮২৩ আসামিকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত চার মাসে রাজধানীতে চাঁদাবাজির ঘটনায় ২৩৬টি মামলা দায়ের হয়েছে। এর মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে ৪২টি, মার্চে ৫৮, এপ্রিলে ৭১ এবং মে মাসে ৬১টি মামলা দায়ের হয়েছে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, যখন কোনো দলের নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজিসহ আধিপত্য বিস্তারের কাজগুলো করে, তখনই আসলে সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলো ঘটে। চাঁদাবাজি নিয়ে সংঘাত কমার কোনো লক্ষণ তো দেখি না, বরং জ্যামিতিক হারে বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিক, জনপ্রতিনিধি ও পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকা অস্ত্রের ঝনঝনানিতে অশান্ত । চাঁদাবাজি, অবৈধ মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ, বাজার-ফুটপাত-প্রতিষ্ঠান দখলে নিতে মরিয়া একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ। হত্যা, ছিনতাই, গুলিবিনিময় নৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত দুই মাসে রীতিমতো আতঙ্কের জনপদ হয়ে উঠেছে মোহাম্মদপুর ও মিরপুর-পল্লবী এলাকা।

পুলিশ দাবি করছে, পুলিশে বদলির পর নতুন যারা যোগদান করেছেন, তারা মোহাম্মদপুরের অনেক অলিগলি চেনেন না। ফলে অপরাধীরা সহজে ঘটনা ঘটিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকায় পুলিশ, র‌্যাবের পাশাপাশি স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী সেনাক্যাম্প।

কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের সংগঠন থেকে জানানো হয়, চাঁদাবাজদের জন্য অতিষ্ঠ তারা। কারওরান বাজারে পণ্য আনার পর দুই ধাপে চাঁদার টাকা দিতে হয় বলে জানান গাড়িচালক ও ব্যবসায়ীরা। তারা আরো জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সবজি, মসলা, মাছসহ নানা পণ্য প্রতিদিন শত শত ট্রাক ও পিকাপভ্যানে আসে ঢাকার বড় কাঁচাবাজারগুলোতে। পণ্য আনার পথে একাধিক জায়গায় চাঁদা দিতে হয়।

গ্যাংস্টারদের অভয়ারণ্য মোহাম্মদপুর-শ্যামলী

ছিনতাইকারী, মাদক কারবারি ও গ্যাংস্টারদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও শ্যামলী। এসব এলাকায় দিন-দুপুরে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ও মালামাল লুটের ঘটনা ঘটছে, অথচ কেউ প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছে না। কিশোরগ্যাং ও মাদক কারবারিদের অবাধ বিচরণে সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছেন এলাকার বাসিন্দারা। পুলিশ, র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব), গোয়েন্দা পুলিশ ও যৌথবাহিনী এলাকাটিতে প্রায় প্রতিদিনেই বিশেষ অভিযান চালালেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

মোহাম্মদপুরের আদাবরে গত মঙ্গলবার বিকাশ এজেন্টকে কুপিয়ে টাকা ছিনতাইয়ের পর অভিযানে গেলে পুলিশের ওপরও হামলা চালায় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় আদাবর থানার ওসিসহ দুই পুলিশ সদস্য আহত হন। র‌্যাব ওই ঘটনায় কবজিকাটা আনোয়ার গ্রুপের সেকেন্ড ইন কমান্ড এক্সেল বাবুসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের নতুন কাঁচাবাজারের ব্যবসায়ী এনামুল হক রবিন আমার দেশকে বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে মোহাম্মদপুরের আদাবর ও শেরেবাংলা নগরসহ পুরো এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে শীর্ষ সন্ত্রাসীরা। ফ্যাসিবাদী আমলে যারা চাঁদাবাজি করত, তারা ৫ আগস্টের পরে জামিনে কারাগার থেকে বের হয়ে নতুন রাজনৈতিক ট্যাগ লাগিয়েছে। এরা রাস্তায় ভ্যানগাড়ি রাখা থেকে শুরু করে রাস্তার ঝাড়ুদারের কাছ থেকেও চাঁদা তুলছে। বৈদ্যুতিক খুঁটি থেকে তার চুরি করা লোকজনের কাছ থেকেও টাকা তুলছে। এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে চাঁদাবাাজি হচ্ছে না। আমরা মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা সবচেয়ে বেশি নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছি সন্ত্রাসীদের জন্য।

অর্ধশতাধিক অপরাধী সক্রিয়

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় অর্ধশতাধিক অপরাধী গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ১৭টি বড় অপরাধী চক্র নিয়মিতভাবে ছিনতাই, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, মাদক ব্যবসা ও ভাড়াটে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত।

পুলিশ বলছে, প্রতিটি গ্রুপের সদস্য ১৫-২০ জন। তাদের আয়ের প্রধান উৎস মাদক কারবার, ছিনতাই ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। বড় গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে কবজিকাটা আনোয়ার গ্রুপ, পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই গ্রুপ, ডাইল্লা গ্রুপ, অ্যালেক্স গ্রুপ, গাংচিল গ্রুপ, লেও ঠেলা গ্রুপ, ফরহাদ গ্রুপ, আর্মি আলমগীর গ্রুপ, নবী গ্রুপ, আকবর গ্রুপ। এছাড়াও রয়েছে অর্ধশতাধিক কিশোরগ্যাং।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মোহাম্মদপুর–আদাবর এলাকায় চাঁদাবাজি ও ছিনতাইসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ায় অপরাধী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান জোরদার করা হয়েছে।

নিরাপদ আদাবর ও মোহাম্মদপুর দাবি

পুলিশের ওপর হামলা ও ধারাবাহিক ছিনতাই রোধসহ নিরাপদ আদাবর ও মোহাম্মদপুরের দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা। ‘মোহাম্মদপুর কমিউনিটি অ্যালায়েন্স’র ব্যানারে গত বুধবার বিকালে আদাবর থানার সামনে এ মানববন্ধন হয়।

এ সময় এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কিশোরগ্যাং সদস্যরা নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা হলেও এ অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জনবল তুলনামূলক কম।

মানববন্ধন থেকে মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানায় পুলিশ সদস্য বৃদ্ধি, টহল জোরদার, সিসিটিভি ও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোসহ বিভিন্ন দাবি জানানো হয়।

পুলিশের মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের এআইজি এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, ‘চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত অভিযান চলছে। চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী ও মাদক কারবারিদের ধরতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। চাঁদাবাজকে গ্রেপ্তার করা, মামলার তদন্ত থেকে শুরু করে যেসব কাজ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আওতার মধ্যে, সেটুকু করছে তারা। এরপরেও অপরাধীরা জামিন পেয়ে গেলে পুলিশের কিছু করার থাকে না।’

এডিশনাল পাবলিক প্রসিকিউটর মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা সুমন আমার দেশকে বলেন, ‘সিএমএম কোর্টে সহজে কোনো চাঁদাবাজের জামিন হয় না। চাঁদাবাজরা উচ্চ আদালতে আপিল করে বের হয়ে যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে মামলার বাদী বা সাক্ষীদের পাওয়া যায় না। তারা আসামিদের ভয়ে হোক বা অন্য কোনো কারণে হোক আর খোঁজখবর রাখেন না। অনেক সময় তাদের ফোন করে ডেকে নিয়ে আসতে হয়।’

ঢাকা-বেইজিং কৌশলগত সম্পর্কের নতুন ভিত্তি

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগে রাজনীতিকীকরণ

উন্নয়ন প্রকল্প বিশ্বব্যাংকের, চাঁদা দিতে হয় স্থানীয় বাসিন্দাদের

অব্যবস্থাপনায় রোগীর ভোগান্তি চরমে

গতিশীল ইন্টারনেট সরবরাহে ফাইবার লাইন আন্ডারগ্রাউন্ডে নেওয়ার পরিকল্পনা

সরকারি বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ বিরোধীদলীয় এমপিদের

ছোট ছোট ঝাঁকুনিতে বড় বিপদের আভাস

পলাতক ৫৭ পুলিশ কর্মকর্তার অবস্থান শনাক্তের প্রক্রিয়া শুরু

ভাইরাল হওয়ার নেশায় বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনা

সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চালের বাজারে অস্থিরতা