হোম > আমার দেশ স্পেশাল > ডকুমেন্টারি

ঈদ : বাংলার হাজার বছরের সংস্কৃতি

মাহমুদ আহমাদ

দ্বিতীয় হিজরির ঘটনা। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় আগমনের দ্বিতীয় বছর। তিনি মদিনায় এসে দেখলেন–স্থানীয় লোকেরা নিজস্ব রীতি-নীতি এবং পদ্ধতিতে প্রতি বছর দুটি উৎসব পালন করে। একটি হলো নওরোজ অন্যটি মেহেরজান। এই দুটি উৎসবকে কেন্দ্র করে তারা এমন কিছু ক্রিয়াকর্ম এবং রীতি অনুসরণ করে, যেগুলোর অনুমোদন ইসলাম দেয় না। তিনি চাইলেন, সামাজিকভাবে মুসলিমরা স্বতন্ত্রতা অর্জন করুক। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তার নির্দেশনা মোতাবেক মুসলিম জীবনের প্রতিটি পর্ব অতিবাহিত হোক। তাই অমুসলিমদের উৎসবের বিষয়ে গভীর থেকে জানতে এবং এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাতে তিনি আনসার সাহাবিদের প্রশ্ন করলেন, (অমুসলিমদের পালনীয়) এই দুই দিন আসলে কী? এই দুই দিনে কী করা হয়?

সাহাবিরা উত্তর দিলেন, ইসলামপূর্ব জাহিলি সমাজে এই দুই দিন ছিল আমাদের উৎসবের দিন। এই দিন আমরা আনন্দ-উৎসাহের সঙ্গে বিভিন্ন খেলাধুলায় মগ্ন থেকে সময় কাটাতাম।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের জানালেন, আল্লাহতায়ালা তোমাদের জন্য উত্তম বিকল্প নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অমুসলিম সংস্কৃতির সঙ্গে সংযোগহীন স্বতন্ত্র ঈদ-উৎসবের দিন তোমাদের জন্য নির্বাচন করেছেন। আর তা হলো ঈদুল ফিতর বা রোজার ঈদ ও ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ।

এভাবেই ইসলামে ঈদের সূচনা হয়। মুসলিমরা বছরের দুদিন আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নির্দেশনা মনে ধারণ করে আনন্দময় আমেজে উজ্জীবিত থাকে। তারা সবাই একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করে। উদযাপনের বিভিন্ন উপকরণ ও শরিয়ত বিধিত নানা ধরনের আয়োজনের মাধ্যমে তারা ঈদের আনন্দ সবার সঙ্গে ভাগাভাগি করে নেয়।

নবীগৃহে ঈদ

ইসলাম ঈদের দিনটি উৎসবমুখর আমেজে কাটানোর নির্দেশ আমাদের দিয়েছে। উৎসবের এই দিনটি মদিনা মুনওয়ারায় নবীগৃহে কীভাবে উদযাপন করা হতো তার বিবরণ হাদিসে এসেছে। ঈদের দিনটি মদিনা মুনাওয়ারায় আনন্দমুখর পরিবেশে উদযাপন করা হতো। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিবার-পরিজন এবং সাহাবিদের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করতেন। সে সময় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাস গৃহ ছিল মদিনাবাসীর মিলনমেলা। ঈদের সকাল থেকেই লোকেরা সেখানে ভিড় জমাত। সেখানে বিভিন্ন ধরনের আয়োজন করা হতো। কোথাও দফ বাজিয়ে কিশোরীরা গান ধরত। কোথায় হাবশিরা কসরত দেখাত। নেজা বর্শা তির তরোয়াল দিয়ে খেলা দেখাত।

এভাবেই উদযাপিত হতো নবীজির ঈদ, নবীজির শহরের ঈদ। সেখানে আনন্দ থাকত। উৎসব থাকত। উৎসাহ থাকত উদ্দীপনা থাকত। বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা ও বিনোদন থাকত। কাজেই আনন্দ উৎসবের সঙ্গে ঈদের দিনটি কাটানোই হলো আমাদের প্রতি ইসলামের নির্দেশ।

প্রাচীন বাংলায় ঈদ উদযাপন

বাংলা অঞ্চলে ইসলামের আগমনের ধারা অনেক প্রাচীন। বখতিয়ার খিলজির বাংলা আগমনের আগে থেকে এই অঞ্চলের মানুষ ইসলামের সঙ্গে পরিচিত ছিল। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চলে আরব বণিকদের যাতায়াত ছিল। তাদের মাধ্যমে ইসলামের নীতি, আদর্শ ও বিধিবিধান ইত্যাদির সঙ্গে বাংলার মানুষের সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। তাদের অনেকে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। এরপর বিভিন্ন সুফি সাধক এবং বরেণ্য মনীষীদের মেহনত মুজাহাদা ও চেষ্টায় এই অঞ্চলে ইসলাম গণমানুষের পালনীয় ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। ইসলামকে ঘিরে এই অঞ্চলে একটি জনসমাজ গড়ে উঠেছিল। সমাজের প্রয়োজনে এবং ধর্মীয় আচার হিসেবে এ দেশে বিভিন্ন উৎসবের গোড়াপত্তন ঘটেছিল। এর মধ্যে অন্যতম ছিল ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা।

ইসলামের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এ অঞ্চলে মুসলিম সভ্যতা সংস্কৃতির বিস্তার ঘটে। ঈদ যেহেতু মুসলিম সংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ সে হিসাবে খুবই উৎসবমুখর ও আনন্দঘন পরিবেশে এই অঞ্চলে ঈদ উদযাপন শুরু হয়। আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সরাসরি নির্দেশনায় যেহেতু ঈদের প্রচলন ঘটেছিল, সেহেতু এটা অনুমান করা ভুল হবে না যে, ইসলামের গোড়াপত্তনের সঙ্গে সঙ্গেই এই অঞ্চলে ঈদ উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতার সূচনা ঘটেছিল। ইতিহাসের বিভিন্ন গ্রন্থে বিচ্ছিন্নভাবে বাংলা অঞ্চলে ঈদ উদযাপনের আলোচনা স্থান পেয়েছে।

মুসলিম শাসনামলে গণমানুষের ঈদ

ইতিহাসের উৎস গ্রন্থগুলো আমাদের সামনে যে তথ্য এবং চিত্র উপস্থাপন করে তার মাধ্যমে আমরা জানতে পারি, বাংলা অঞ্চলে মোঘলদের আগমনের আগে থেকেই আগ্রহের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা হতো। রমজান থেকে ঈদের আমেজ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ত। রমজানের সংযম ও পরিশুদ্ধতা জনগণের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধর্মীয় আলোচনা এবং ধর্ম প্রচারকদের নিযুক্ত করা হতো। ঈদের নামাজ পরিচালনা করার জন্য স্বতন্ত্রভাবে ইমাম নিযুক্ত করা হতো। ঈদের জামাতের জন্য থাকত স্বতন্ত্র ব্যবস্থাপনা। শহরের বাইরে উন্মুক্ত প্রান্তরে সাধারণত ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতো। গ্রামের দিকেও গুরুত্বের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করা হতো।

তাবাকাত-ই-নাসিরির রচয়িতা মিনহাজ-ই-সিরাজ জুজজানি বলেন, ‘সুলতানগণ রমজান মাসে দৈনন্দিন ধর্মীয় আলোচনার ব্যবস্থা করেন এবং এ উদ্দেশ্যে ধর্মপ্রচারক নিযুক্ত করেন। তারা ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল আজহারর নামাজ পড়ার জন্যে ইমামও নিযুক্ত করেন। শহরের বাইরে বিরাট উন্মুক্ত জায়গায় অথবা গ্রামে ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হতো এবং এসব স্থানকে ঈদগাহ বলা হতো।’

বাংলা অঞ্চলে ঈদ উদযাপনের মধ্যে বিভিন্ন অনুষঙ্গ থাকত। নানা ধরনের আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হতো। আকাশে ঈদের নতুন চাঁদ উদিত হলে চারদিকে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ত। বিভিন্ন দিক থেকে রাজকীয় নাকারা বেজে উঠত। সৈনিকরা ঈদের ঘোষণা দিয়ে তোপধ্বনি তুলত। রাতের শেষ প্রহর পর্যন্ত তোপধ্বনি চলতে থাকত। এরপর শোনা যেত ভারী কামানের আওয়াজ।

মোঘল সেনাপতি আলাউদ্দিন ইসফাহান–যিনি মির্জা নাথান নামে পরিচিত, তিনি বাংলা অঞ্চলে ঈদ উদযাপনের বিবরণ দিয়ে বাহারিস্তান-ই-গায়েবি গ্রন্থে লেখেন, ‘দিনের শেষে সন্ধ্যা সমাগমে নতুন চাঁদ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিবিরে রাজকীয় বাজনা বেজে উঠল এবং আগ্নেয়াস্ত্র ক্রমাগত অগ্নি উদগিরণ করে চলল। রাত্রির শেষভাগে আগ্নেয়াস্ত্রের শব্দ থেমে গেল। এর স্থলে ভারী কামানের অগ্নি উদগিরণ শুরু হলো। এটা ছিল দস্তুরমতো একটা ভূমিকম্প।’

ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে থাকত আনন্দের আমেজ। ঈদের দিন সকালবেলা ছোট-বড় সবাই নিজেদের সাধ্যমতো পরিচ্ছন্ন অন্যতম পোশাক পরিধান করত। দলবেঁধে সবাই ঈদগাহে গমন করত। ঈদগাহে যাওয়ার সময় অবস্থাসম্পন্ন ও ধনী শ্রেণির ব্যক্তিরা টাকা-পয়সা ও উপহার সামগ্রী দান করত।

শরিয়ত নির্ধারিত ফেতরার (সাদাকাতুল ফিতর) চেয়েও তাদের দানের পরিমাণ যে অধিক হতো এ কথা বলাই বাহুল্য। ঈদগাহে যাওয়ার সময় সাধারণ মুসলমানরাও ফেতরা আদায় করে দিত। এর অতিরিক্ত দানও তরা করত। এক বড় জামাতে মুসলমানরা ঈদের নামাজ আদায় করত। নামাজ শেষে একজন অন্যজনের সঙ্গে মুসাফাহা মুয়ানাকা করত।

বাংলা অঞ্চলে ঈদ উদযাপন প্রসঙ্গে ‘নওবাহার-ই-মুর্শিদকুলী খান’ গ্রন্থের রচয়িতা আজাদ হোসেন বিলগ্রামী বলেন, ‘নবাব সুজাউদ্দিনের অধীনে ঢাকার সহকারী শাসনকর্তা ‘ঈদগাহ’ ময়দানের দিকে শোভাযাত্রা করে যাওয়ার সময় দুর্গ থেকে এক ক্রোশপথে প্রচুর পরিমাণে টাকা-পয়সা ছড়িয়ে যেতেন। এক বড় জামাতে মুসলমানরা তাদের নামাজ পড়ত এবং আনন্দ-আবেগে একে অন্যকে উৎসাহের সঙ্গে অভিবাদন জানাত।’

নতুন সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করা হলো ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ। ঈদের আমেজকে বাড়িয়ে তুলতে নতুন কাপড় পরিধান করার প্রচলন মুসলিম শাসনাধীন বাংলাতেও ছিল। ঈদের দিন মুসলিম নারী-পুরুষ ছেলেমেয়ে সবাই সুন্দর পোশাক পরিধান করত। এটাই ইসলামের আদর্শ এবং নির্দেশনা।

ঈদকে কেন্দ্র করে ঈদগাহের আশপাশে বিভিন্ন মেলার আয়োজন করা হতো। হাজার হাজার লোকের সমাগম হতো সেসব মেলায়। সেখানে থাকত খাওয়া-দাওয়ার অপূর্ব সব আয়োজন।

তাওয়ারিখ-ই-ঢাকা গ্রন্থের প্রণেতা মুনশী রহমান আলী তায়েশ বলেন, ‘(বর্তমান ঢাকার ধাণমন্ডি) ঈদগাহে বাংলার নাজিম ও সুবেদারগণ তাদের পরিবারস্থ লোকজন ও শহরবাসীদের সঙ্গে নিয়ে দুই ঈদের নামাজ আদায় করতেন। বর্তমানে এ ইদগাহ শহরের এলাকা থেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে রায়-বাজারে অবস্থিত।’

আগে এ এলাকা শহরের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আজকাল এটি অত্যন্ত ভগ্নাবস্থায় আছে এবং আশপাশের মুসলমান এবং শহরের অধিকাংশ লোক ওখানে ঈদের নামাজ আদায় করেন। শহরের মুসলমান মৎস্য ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর ওখানে একটি মেলার আয়োজন করেন। এতে হাজার হাজার লোকের সমাগম হয় এবং খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা চলে।

যে কারণে ঈদ হারিয়েছিল উৎসবের রঙ

এখানে একটা বিষয় মনে রাখা জরুরি। উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে ঈদ উৎসব আয়োজনে মুসলিমদের মধ্যে উদ্দীপনার অভাব দেখা দিয়েছিল। আগের মতো জাঁকজমকের সঙ্গে ঈদের আয়োজন করা তাদের পক্ষে আর সম্ভব ছিল না। এক পেছনে মোটা দাগে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা যায়।

বাংলা সাহিত্যে প্রথম ঈদকবিতা ও ঈদসংখ্যা

মহিমান্বিত চাঁদরাত