ভারতের গঙ্গা থেকে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় ২০২৪ সালে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার পানির গভীরতা (ওয়াটার লেভেল) নেমে যায় ৪.৫ মিটারের (মিন সি লেভেল) নিচে। বাধ্য হয়ে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের পাম্প বন্ধ রাখতে হয় কর্মকর্তাদের। ভারত থেকে পানি না পাওয়ায় পাম্প বন্ধ রাখা হলেও দেশের মানুষকে জানানো হয়েছিল পাম্প বিকল হয়ে গেছে।
সে সময় তিনটি পাম্পের দুটিই সচল ছিল। এরপরও ভারতকে খুশি রাখতে এবং তাদের তাঁবেদারি করে দেশের মানুষকে মিথ্যা বলেছিল মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার।
পদ্মায় পানি না থাকায় সে সময় কৃষকরা কোটি কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হন। এমনকি জিকে প্রজেক্টের ওপর নির্ভরশীল চার জেলার অধিকাংশ উপজেলার মানুষ ব্যবহারের সাধারণ পানিও পাননি। পানি ওঠেনি সাধারণ টিউবওয়েলেও । দৈনন্দিন কাজে পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। তাদের পানির প্রয়োজন মেটানোর একমাত্র মাধ্যম ছিল ডিপ টিউবওয়েল। এরপরও দেশের মানুষকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিল তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকার। শুষ্ক মৌসুমে ১৯৯৬ সালের ফারাক্কা চুক্তির পর থেকে ৩০ বছরে ২৩ বার পর্যাপ্ত পানি পায়নি বাংলাদেশ।
মিথ্যাচারের এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে। এসব বিষয়ে কথা বলেন জিকে প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জাহেদুল ইসলাম, জিকে পাম্প হাউসে কর্মরত উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান, উপসহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক/বিদ্যুৎ) আব্দুল মাজেদ, উপসহকারী প্রকৌশলী ইমন হাসান, পানি ব্যবস্থাপনা ফেডারেশনের সভাপতি শাফায়েত হোসেনসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
জিকে সেচ প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী জাহেদুল ও পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের মতে, মিন সি লেভেল (এমএসএল) থেকে ৪.৫ মিটারের উপর ওয়াটার লেভেল থাকলে পাম্প চালানো সম্ভব হয়। কারণ পদ্মাপাড় থেকে প্রায় ০.৭০ থেকে ১.২০ কিলোমিটার দূর থেকে পাম্প পানি টেনে নিয়ে আসে। সেজন্য পাম্পের ৩.৯৬ মিটার ওয়াটার লেভেলে পানি তোলার সক্ষমতা থাকলেও এ দূরত্বের কারণে তা সম্ভব হয় না। ঝুঁকি নিয়ে চালু রাখলেও পাম্প প্রচুর ভাইব্রেট করে যান্ত্রিক ত্রুটির আশঙ্কা থাকে ।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) হাইড্রোলজি জোনের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পদ্মার ওয়াটার লেভেল কমতে শুরু করে। যা ৪.৫০-এর নিচে দ্রুতই নেমে যায় । ফারাক্কা বাঁধ থেকে পানি কম ছাড়ায় ওয়াটার লেভেল কমতে কমতে এ বছর সর্বনিম্ন ২.৯৯ মিটারে নেমে যায়। সেজন্য ১৯ ফেব্রুয়ারি পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। এরপর ওয়াটার লেভেল ৪.৫০-এর উপর ওঠে মে মাসের শেষ সপ্তাহে। এ সময়ে ভারত থেকে পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ায় ওয়াটার লেভেল কমে যায়। ফলে সচল দুটি পাম্পের একটিও চালানো সম্ভব হয়নি।
ওয়াটার লেভেল কম থাকার পর যখন পাম্প বন্ধ করা হয়, তখন গণমাধ্যমের বরাতে দেশের মানুষকে জানানো হয়, সবকটি পাম্প বিকল হয়ে গেছে। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় অবস্থিত পাউবোর জিকে প্রকল্পের প্রধান পাম্প হাউসের নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান সে সময় সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, তিনটি পাম্পই বিকল হয়ে আছে। কৃষক প্রতিনিধিদের জানিয়ে দেওয়া হয়, ‘আপনারা (কৃষক) আপনাদের মতো চালিয়ে (সেচ) নেন’।
এ বিষয়ে কুষ্টিয়া পানি উন্নয়ন সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও জিকে প্রকল্পের পিডি জাহিদুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ২০২৪ সালে ওয়াটার লেভেল ৪.৫ মিটারের নিচে থাকায় পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু তখন আমি শুনেছি, যান্ত্রিক ত্রুটি দেখিয়ে পাম্প বন্ধ রাখা হয়েছিল। এটা তো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না, ছিল ইনস্ট্রাকটেড রিপোর্ট (নির্দেশনা মোতাবেক দেওয়া প্রতিবেদন)। এটা তখন অ্যাকচুয়াল রিপোর্ট ছিল না। কাদের নির্দেশনা ছিলÑ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হায়ার অফিসিয়াল যখন বলে, এটা বলা যাবে না আমাদের। যেহেতু চুক্তি আছে (ফারাক্কা চুক্তি), চুক্তির কারণে অনেক কিছু বলা যাবে না।’
২০২৪ সালের সে সময় সবকটি পাম্প নষ্ট হওয়ার কথা বলা হলেও তখন সচল ছিল দুটি পাম্প। পাম্প ভালো থাকলেও কেন দেশের মানুষকে এ মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়, জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের কাছে সাক্ষাৎকারের সময় চাওয়া হয়। প্রথমে তিনি আমার দেশ-এর মুখোমুখি হতে চাননি। নির্দিষ্ট দিন উল্লেখ করে সময় চাইলে তিনি জানান, তিনি সে সময় সেখানে থাকবেন না। পরে প্রতিবেদক ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া গিয়ে পিডির সাক্ষাৎকার নিয়ে জানতে পারেন ভেড়ামারায় পাম্প হাউসের অফিসে রয়েছেন প্রকৌশলী মিজান। এরপর পিডির মাধ্যমে তার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হয়। সেখানে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে তিনি প্রতিবেদককে কল করে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের নম্বর দিয়ে বলেন, তার সঙ্গে যোগাযোগ করে অফিসে পৌঁছানোর জন্য। সেখানে গিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানকে পাওয়া যায়নি। তাকে পাওয়া না গেলেও প্রতিবেদকের অপেক্ষায় ছিলেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান, উপসহকারী প্রকৌশলী (যান্ত্রিক/বিদ্যুৎ) আব্দুল মাজেদ ও উপসহকারী প্রকৌশলী ইমন হাসানসহ পাম্প হাউসে কর্মরত কয়েকজন প্রকৌশলী। উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান পাম্প হাউস ঘুরিয়ে দেখান। এরপর নিয়ন্ত্রণকক্ষে যাওয়ার পর প্রতিবেদক কথা বলেন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে।
পদ্মায় ওয়াটার লেভেল কম থাকার পর পাম্প বন্ধ থাকা এবং দেশবাসী ও কৃষকের পাম্প নষ্ট হওয়ার কথা জানানোর বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে তারা বলেন, এটা তো ওই সময় ‘সিক্রেট’ ছিল, এখন ‘ওপেন সিক্রেট’। যে গভর্নমেন্ট যেভাবে চায় আর কী।
কার নির্দেশনায় এ মিথ্যা তথ্য দেশের মানুষকে জানানো হয়েছিলÑজানতে চাইলে পাশ থেকে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান হেসে বলেন, ‘এটা আপনি বললেও আমরা বলতাম। আমরা তো তাঁবেদারি করি।’ এ সময় উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল মাজেদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি এবং উপস্থিত অন্যরা হাসছিলেন, কোনো মন্তব্য করেননি। পরে বলেন, আমাদের সিনিয়ররা যদি কোনো কমেন্টস করেন, সেটা নিয়ে আমাদের কথা বলার কোনো যৌক্তিকতা নেই। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষই ভালো বলতে পারবেন এসব বিষয়ে। আমরা টেকনিক্যাল বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারি।
২০২৪ সালের ওই সময়ে পাম্পের কোনো কারিগরি ত্রুটি ছিল না, কিন্তু পর্যাপ্ত পানি ফারাক্কা থেকে না পাওয়ায় পাম্প বন্ধ ছিল এটা সঠিক কি না, জানতে চাইলে তিনি চুপ থাকেন। কোনো উত্তর দিচ্ছিলেন না। পরে ‘নীরবতাই সম্মতির লক্ষণ’ বললে উপস্থিত সবাই হাসতে থাকেন। এ সময় তাদের মধ্য থেকে একজন বলেন, ‘আমাদের আসলে উত্তর দেওয়া সম্ভব না’।
তবে এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ‘কত এমপি-মন্ত্রী ফোন দিয়ে পানির কথা বলত। এরপর আমরা পানি নেই বলে জানাতাম। কিন্তু দেশের মানুষকে বলতে হইছে পাম্প নষ্ট। তারাই (মন্ত্রী-এমপিরা) বলে দিত, এটা বলার দরকার নাই, পানি নাই কেন। আমরা ভারতের তাঁবেদারি করে চলি না! সবাই জানে। পাম্প দুটি ঠিকই ছিল, কিন্তু ভারত থেকে তখন পানি কম আসায় আমরা পাম্প চালাতে পারিনি। বলা হইছে যে পাম্প নষ্ট, আসলে পাম্প ভালোই ছিল। পাম্প তো আর সব একসঙ্গে নষ্ট ছিল না। একটা পাম্প তখন সম্ভবত নষ্ট ছিল। তখন আওয়ামী মন্ত্রীরা বলতে বাধ্য করেছেন, পানি আছে, আপনাদের পাম্প নষ্ট এটা জানান।’
এরপর হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আমরা বললাম পাম্প নষ্ট, কিন্তু তিন মাস পর পানি আসছে। এরপর ঠিক করা ছাড়াই চালু হয়ে গেছে।’
পরবর্তী সময়ে আবারও নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাকে পাওয়া যায়। হোয়াটসঅ্যাপে কল করে তার কাছে জানতে চাওয়া হয়, সে সময় কয়টি মেশিন ভালো ছিল? তিনি জানান, ২০২৪ সালের ওই সময় ৩ নম্বর আর ১ নম্বর দুটি পাম্প ভালো ছিল, কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি ছিল না, কিন্তু তখন তো আপনাকে দিয়ে বলানো হয়েছিল, মেশিন নষ্ট হয়ে গেছে। কারা আপনাকে বাধ্য করেছিল কথাটি বলতেÑপ্রশ্নের জবাবে তিনি আমার দেশকে বলেন, যান্ত্রিক ত্রুটি এবং পানির লেভেল দুটি সমস্যাই ছিল। যান্ত্রিক ত্রুটিটা আমাদের নিজস্ব প্রকৌশলীদের মাধ্যমে মেরামত হয় এবং তখন পানির লেভেল কম থাকার কারণে পাম্প বন্ধ ছিল। পরে যখন পানির লেভেল বাড়ে, তখন আমরা মে মাসে গিয়ে পাম্পটা চালু করতে পারি। তাছাড়া কিছুদিন আগে ১ নম্বর পাম্প চালু অবস্থায় ওভার ভোল্টেজের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইলেকট্রনিকস পার্টসের কিছু সমস্যা হয়, যেগুলো আমাদের খুঁজে বের করতে হয়েছিল। ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালেও ওই পাম্পের ইলেকট্রিক্যাল সমস্যাগুলো আমরা নিজেরা সলভ (সমাধান) করার চেষ্টা করি। সেটা সলভ করার পরও পানির লেভেল কম থাকায় পাম্প চালু করা যায়নি। পরে যখন পানির লেভেল চলে আসে, তখন আমরা পাম্পটা চালু করতে পেরেছিলাম।
আপনি মাত্রই বললেন, সে সময় দুটি পাম্প ভালো ছিল আর একটা নষ্ট ছিল। তখন একসঙ্গে দুটি ভালো পাম্পেই কি যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিয়েছিলÑএ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দুটি পাম্পের মধ্যে হয়তো একটায় যান্ত্রিক সমস্যা ছিল, যা আমরা মেরামত করেছিলাম, কিন্তু মূল বিষয় হলো পানির লেভেলও কম ছিল। পাম্প ভালো থাকুক বা যান্ত্রিক ত্রুটি থাকুক, পানির লেভেল কম থাকলে তো আমরা পাম্প চালাতে পারব না। পানির লেভেল কম থাকায় পানি তোলা সম্ভব হয়নি।
শুষ্ক মৌসুমে ২৩ বার পর্যাপ্ত পানি পায়নি বাংলাদেশ
চার জেলার ১৩ উপজেলায় সেচ প্রকল্প চালু রাখতে হলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে ওয়াটার লেভেল প্রয়োজন ৪.৫ মিটার এমএসএল। কিন্তু চুক্তির পর থেকে ৩০ বছরে ২৩ বারই পর্যাপ্ত পানি পায়নি বাংলাদেশ। প্রতিবারই পদ্মার ওয়াটার লেভেল নেমে গিয়েছিল ৪.৫ মিটারের (এমএসএল) নিচে। চুক্তির বছর ১৯৯৬ সালেও ওয়াটার লেভেল নেমেছিল ৩.৮৩ মিটারে। চুক্তির শেষ বছর ২০২৬ সালে ওয়াটার লেভেল ছিল ৩.৯০ মিটার।
এছাড়া ১৯৯৭ সালে ওয়াটার লেভেল সর্বনিম্ন ছিল ৪.২৫মিটার, ৯৮ সালে ৪.৩১, ৯৯ সালে ৪.১৩, ২০০০ সালে ৪.৪২, ২০০১ সালে ৩.৭৯, ২০০২ সালে ৪.৩৫, ২০০৬ সালে ৩.৭৭, ২০০৮ সালে ৪.৪৫, ২০১০ সালে ৩.৮২, ২০১১ সালে ৪.৩৯, ২০১২ সালে ৪.২৪, ২০১৫ সালে ৪.০৩, ২০১৬ সালে ৩.৩৭, ২০১৭ সালে ৩.৯০, ২০১৮ সালে ৩.৬১, ২০১৯ সালে ৩.৭০, ২০২১ সালে ৩.২৭, ২০২২ সালে ৪.০৬, ২০২৩ সালে ৩.৭০, ২০২৪ সালে ২.৯৯ মিটার এবং ২০২৫ সালে ৩.৩৫ মিটার এমএসএল ।
পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া) আয়োজিত ‘গঙ্গা পানিচুক্তি : পুনঃআলোচনার বিষয়াবলী’ শীর্ষক সেমিনারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ও সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ২০০৮-২০১৬ সালের মধ্যে ২৭টি সংকটকালীন সময়ে ১৫ বারই বাংলাদেশ ন্যূনতম পানিপ্রবাহ পায়নি।
আসিফ নজরুল বলেন, গঙ্গা অববাহিকার ৭০ শতাংশ ভারতের উত্তরপ্রদেশ, বিহার ও পশ্চিমবঙ্গে অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশ কাঠামোগতভাবেই একটি নিম্ন-অববাহিকা দেশ। উজানে ভারতের সেচ প্রকল্পের ব্যাপক সম্প্রসারণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহে চরম তারতম্য দেখা দেয়। ১৯৭৭ সালের চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ন্যূনতম পানিপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা না থাকাকে একটি মৌলিক কাঠামোগত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
প্রকল্পের পরিধি ও নির্ভরশীলতা
প্রকৌশলী জাহিদুল ইসলাম আমার দেশকে জানান, জিকে সেচ প্রকল্প কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ১৩টি উপজেলার কৃষিনির্ভর বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি। ১৯৫৪-৫৫ সালের দিকে শুরু হওয়া এ বৃহৎ প্রকল্পের আওতায় প্রাথমিকভাবে প্রায় এক লাখ ১৬ হাজার হেক্টর জমি চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও বর্তমানে সেচযোগ্য এলাকার পরিমাণ প্রায় ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর। বিগত ২০-২৫ বছরের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, সর্বোচ্চ ৭৬ হাজার হেক্টর জমিতে সরাসরি পানি পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে। তবে এ প্রকল্পের পরোক্ষ সুবিধা আরো অনেক বিস্তৃত। এ অঞ্চলের এক লাখ ৯৭ হাজার হেক্টর কমান্ড এলাকার প্রতিটি ইঞ্চি জমি পরোক্ষভাবে এ প্রকল্পের পানির সুবিধা পেয়ে থাকে। প্রকল্পের অধীনে গঠিত বিভিন্ন পানি ব্যবস্থাপনা দল (ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট গ্রুপ), অ্যাসোসিয়েশন এবং ফেডারেশনের মাধ্যমে কৃষকরা সংঘবদ্ধভাবে এ সেচ সুবিধা ভোগ করেন। তাদের মাধ্যমে একরপ্রতি ২০০ টাকা হারে প্রতি মৌসুমে পানি দেওয়া হয়।
পাম্প বন্ধ থাকলে যে ক্ষতি
এ গুরুত্বপূর্ণ সেচ প্রকল্পটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও এ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে চরম বিপর্যয় নেমে আসে। প্রকৌশলী জাহেদুল ইসলাম জানান, শুষ্ক মৌসুমে যদি মাত্র ১৫ দিনের জন্যও জিকে প্রকল্পের পাম্পগুলো বন্ধ রাখা হয়, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যায়। এর ফলে সাধারণ মানুষের ব্যবহার্য কোনো টিউবওয়েলে আর পানি ওঠে না এবং দৈনন্দিন কাজের জন্য পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। এছাড়া ব্যক্তিগত উদ্যোগে সেচ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত শ্যালো মেশিনগুলোও পানি তুলতে ব্যর্থ হয়। তখন পানির একমাত্র উৎস থাকে ডিপ টিউবওয়েল। এছাড়াও প্রকল্পের সেচের পানি চুইয়ে যাওয়ার ফলে আশপাশের বনাঞ্চল ও গাছপালা সারা বছর যে প্রয়োজনীয় আর্দ্রতা পায়, পাম্প কিছুদিন বন্ধ থাকলে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। প্রকৌশলী জাহেদুল বলেন, তখন আমাদের ওপর খুব চাপ সৃষ্টি করেন স্থানীয়রা। তারা অনুরোধ করেন, ফসলের ক্ষেতে পানি না দেওয়া গেলেও অন্তত যেন ক্যানেলে পানি দেওয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, শুষ্ক মৌসুমে এক বছর পানি না থাকলেই ভয়াবহ ক্ষতির সম্মুখীন হবে এসব অঞ্চল। জিকে প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর হওয়ায় এ এলাকাটি প্রাকৃতিকভাবেই চরম খরাপ্রবণ ও শুষ্ক। এখানকার মাটির পানি ধারণক্ষমতা অত্যন্ত কম এবং পানির সংকট হলেই মাটির মরুকরণের দিকে ধাবিত হওয়ার তীব্র প্রবণতা দেখা যায়। যদি কোনো শুষ্ক মৌসুমে পুরো এক বছর এ সেচ প্রকল্পে পানি সরবরাহ না থাকে, তবে এ অঞ্চলের মাটি সম্পূর্ণ আর্দ্রতাহীন হয়ে পড়বে। এখানে কোনো ধরনের খাদ্য, ফসল বা শস্য উৎপাদন করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। দীর্ঘ সময় পানি না থাকলে কেবল সেচই নয়, পানের পানিরও তীব্র হাহাকার দেখা দেবে। ফলে এ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য, সবুজ বনায়ন ও সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্য চরম হুমকির মুখে পড়বে। এটি থেকে বাঁচতে আমরা এখন যে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছি, আমরা ২.৫ মিটার থেকেই পানি তুলতে পারব। আর পদ্মা ব্যারাজ সম্পন্ন হলে আমাদের আর সমস্যা হবে না।
কৃষকরা সাধারণত পানির নিশ্চয়তার ওপর নির্ভর করেই তাদের জমিতে ফসল চাষের পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নেন। হঠাৎ পানি বন্ধ হয়ে গেলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি ও কৃষকের চরম লোকসান হয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সেচ ব্যাহত হওয়ার কারণে কৃষকদের এ বিশাল অর্থনৈতিক লোকসানের বিপরীতে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সরকারি সুযোগ বা নিয়ম নেই।
পানি ব্যবস্থাপনা ফেডারেশনের সভাপতি শাফায়েত হোসেন আমার দেশকে বলেন, ‘আমি কৃষকদের একজন প্রতিনিধি। ২০২৪ সালের ওই সময় আমাদের বোরোর সিজন ছিল। ওই সময় মাঠে আমরা কোনো ফসল উৎপাদন করতে পারিনি, টিউবওয়েলেও পানি পাইনি, পানির জন্য হাহাকার ছিল, সব শুকিয়ে গিয়েছিল। প্রয়োজন সেরেছি শুধু ডিপ টিউবওয়েলের পানি দিয়ে। ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছিল এবং কৃষকের কোটি কোটি টাকার লোকসান হয়েছিল। কৃষকদের কাছে ক্ষমা চেয়েছি। আমাদের কৃষক ভাইদের লোকসানের ক্ষতিপূরণের জন্য অনেক কথা বলেছি বিভিন্ন সেমিনারে, কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।’