হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

‘কম খাইয়াও তো চলতে পারতাছি না’

এমরানা আহমেদ

সকাল থেকে রিকশার প্যাডেল ঘুরিয়েও দিনশেষে হাতে থাকে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া, সন্তানের পড়াশোনা—সব সামলানো কঠিন। কেউ আবার গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দিনের উপার্জনের বড় অংশ হারাচ্ছেন। দোকানে লোকসান হওয়ায় ব্যবসা ছেড়ে কেউ এখন দৈনিক মজুরির কাজ করছেন, আবার পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় কমে গেছে ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার বিক্রিও।

গত ১৪ আগস্ট দুপুরে মৌচাক মার্কেট এলাকায় কথা হয় প্যাডেলচালিত রিকশাচালক ইব্রাহিম মিঞার (৪৫) সঙ্গে। ফার্মগেট থেকে দুই যাত্রী নিয়ে মৌচাকে আসতে যানজটে তার প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। যাত্রী নামিয়ে সড়কের পাশে একটি ভ্রাম্যমাণ দোকানে দুপুরের খাবার সারছিলেন তিনি। ডাল ও আলুভর্তা দিয়ে এক প্লেট ভাতই ছিল তার দুপুরের খাবার।

ইব্রাহিম বলেন, ইনকাম তো নেই। দুই ছেলে স্কুলে পড়ে। সংসার চালাতে হয়। সহযোগিতা করার মতো কেউ নেই। কম টাকায় খাওয়ার চেষ্টা করি। কখনো কখনো না খেয়েও থাকি। বড় মাছ, গরুর মাংস কবে খেয়েছি মনে নেই।

আগের তুলনায় আয় কমে যাওয়ার কথাও জানান তিনি। তার ভাষ্য, একসময় রিকশার জমা দেওয়ার পর দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা হাতে থাকত। এখন ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি থাকে না।

মতিঝিলের রিকশাচালক আব্দুল করিমের জীবন আরো কঠিন। সকাল থেকে কখনো ১২, কখনো ১৬ ঘণ্টা রিকশা চালান। ভাড়া বাসায় থাকার সামর্থ্য না থাকায় অনেক সময় রিকশাতেই রাত কাটে। দুই সন্তান গ্রামের স্কুলে পড়ে। নিজের কষ্টের জীবন সন্তানদের দিতে চান না বলে সামান্য হলেও টাকা জমানোর চেষ্টা করেন তিনি।

গ্যাসের লাইনে সিএনজিচালকদের আহাজারি

শুধু রিকশাচালকরাই নন, জ্বালানি সংকটসহ বিভিন্ন কারণে চাপে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালকরাও। লালমাটিয়ার একটি সিএনজি স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রইদুল (৩৮)। সকাল সাড়ে ৭টায় লাইনে দাঁড়ালেও দুপুর ১২টার পরও তার গাড়িতে গ্যাস ওঠেনি। ফলে দিনের বড় একটি অংশই হারিয়ে যাচ্ছে গ্যাসের অপেক্ষায়।

রইদুল বলেন, ‘কখন গ্যাস পামু, কখন রাস্তায় নামুম, আর কখন রোজগার হইব—জানি না। এমন চললে সংসার চালামু ক্যামনে? একদিন বাজার করতে পারি, আরেকদিন পারি না। আয় কমছে, কিন্তু খরচ বাড়ছে অনেক। গ্যাস না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াইয়া থাকলে গাড়ি চালানোর সময়ই থাকে না।’

হাজারীবাগে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে থাকেন রইদুল। গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জ। প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকায় থাকেন। ১২ বছর ধরে সিএনজি চালাচ্ছেন। এর আগে মুদি দোকান করতেন; লোকসানের পর অটোরিকশা চালানো শুরু করেন।

তার মাসিক ব্যয়ের মধ্যে বাসাভাড়া ৫,০০০, বিদ্যুৎ বিল প্রায় ১,৫০০ এবং গ্যাসের জন্য ১,১০০ টাকা দিতে হয়। এর বাইরে রয়েছে খাবার, সন্তানের পড়াশোনা, চিকিৎসা ও অন্যান্য খরচ। নিজের অটোরিকশা না থাকায় মহাজনের গাড়ি চালান। প্রতিদিন নির্দিষ্ট টাকা জমা দেওয়ার কথা থাকলেও গ্যাস সংকটের কারণে তা নিয়মিত দিতে পারছেন না। ফলে গ্যারেজ মালিকের কাছে তার দেনা বাড়ছে।

ব্যবসা ছেড়ে হাজিরার কাজে

জীবিকার সংকটে পড়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও। তেজকুনিপাড়ার একটি রেস্তোরাঁয় দৈনিক ৪০০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন জিল্লুর রহমান (৫৫)। মাত্র আট মাস আগেও কারওয়ান বাজারের মাছের আড়তে তার খাবারের দোকান ছিল। লোকসানের কারণে সেটি বন্ধ করে এখন হাজিরার কাজ করছেন।

পরিবার নিয়ে তেজকুনিপাড়ায় দুই কক্ষের একটি বাসায় থাকেন জিল্লুর। পাঁচ ছেলের মধ্যে তিনজন আলাদা সংসার করছেন। ছোট দুই ছেলে মাছের আড়তে কাজ করে পরিবারকে সহায়তা করেন। এর মধ্যেই ঋণ করে ১৬ বছর বয়সি মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। ফলে সীমিত আয়ে সংসারের ব্যয় সামলানো তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

মনিপুরিপাড়ায় ভ্রাম্যমাণভাবে ফল, আদা ও রসুন বিক্রি করেন আরিফ ইসলাম (৫০)। প্রতিদিন ভোরে কারওয়ান বাজার থেকে পণ্য কিনে বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে বিক্রি করেন। তবে পণ্যের দাম বাড়ায় বিক্রি কমে গেছে। আরিফ বলেন, দাম কম থাকতে মানুষ বেশি কিনত। দাম বাড়ার পর এখন কম কিনছে।

অনিশ্চিত শ্রমবাজারে বড় জনগোষ্ঠী

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের কর্মজীবীদের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। ২০১৭ সালের জরিপে দেখা যায়, দেশের মোট ৬ কোটি ৮ লাখ লোক কর্মজীবীর প্রায় ৮৫ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এ খাতে কাজের নিশ্চয়তা, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা কিংবা স্থায়ী আয় অনেক ক্ষেত্রেই নেই।

দেশের কৃষি, শিল্প ও সেবা—তিন খাতেই বিপুলসংখ্যক মানুষ অনানুষ্ঠানিক কাজে যুক্ত। কৃষিতে প্রায় ২ কোটি ৩০ লাখ, শিল্পে ১ কোটি ১১ লাখ এবং সেবা খাতে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ মানুষ এ ধরনের কাজে নিয়োজিত ছিলেন ওই জরিপের হিসাবে। আয় কমে যাওয়া কিংবা নিত্যপণ্যের দাম বাড়ার সরাসরি প্রভাব পড়ে এই জনগোষ্ঠীর ওপর। নির্দিষ্ট মাসিক বেতন না থাকায় বাজারদরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তাদের আয় বাড়ে না। বরং কাজ কমে গেলে বা জ্বালানি সংকটে কর্মঘণ্টা নষ্ট হলে আয় আরো কমে যায়।

বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার বলেন, দেশের শ্রমজীবী ও নিম্নআয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি শোষণ ও বৈষম্যের শিকার। অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হলেও তাদের জীবনযাত্রার সংকট যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। তার মতে, একদিকে শ্রমিক-কর্মচারীদের আয় প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না, অন্যদিকে নিত্যপণ্যসহ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। এতে নিম্নআয়ের মানুষের জীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে। শিল্প ও অর্থনীতির বড় অংশ শ্রমজীবী মানুষের ওপর নির্ভরশীল হলেও তাদের জীবনমান ও নিরাপত্তায় যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

তাসলিমা আখতার আরো বলেন, দেশে শিল্পায়নের বিস্তারে সঙ্গে শ্রমিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কারখানার সংস্কার, বয়লার ও সিলিন্ডার বিস্ফোরণ এবং অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলে শ্রমিক ও মালিক উভয়েই লাভবান হতে পারবে। এ ব্যাপারে কারখানা পরিদর্শন অধিদপ্তর, শিল্প মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

অর্থ নয়ছয়ের সুযোগ কম আগ্রহ নেই কর্মকর্তাদের

বগুড়ায় ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি, যুবককে ছুরিকাঘাত

গাজায় তিন বছরে নিহত ৭৩৪৭০, আহত ১৭৪৫৪০

মাত্র ১৫ মিনিটেই মার্কিন হামলার জবাব দিয়েছে ইরান: জেনারেল আকরামিনিয়া

ভারি বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টি নিয়ে যা জানাল আবহাওয়া অধিদপ্তর

খাল থেকে ‘কুমির’ নয়, আসে কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার

কুমিল্লা সার্কিট হাউসে কক্ষজুড়ে উইপোকা, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

স্বাভাবিক ছন্দে আদ্-দ্বীন বাড়ছে রোগীর চাপ

বলিভিয়ায় সামরিক স্থাপনায় বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১৫

তুরস্কের বিনিয়োগ ব্যাংক ও দুই সহযোগী প্রতিষ্ঠানে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা