যাত্রীদের ‘পকেট কাটার’ অভিযোগ
গণপরিহনের ভাড়া নির্ধারণ করে থাকে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি-হ্রাসের ওপর ভিত্তি করে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি এ পর্যন্ত কেবল নন-এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে আসছে। সড়ক-মহাসড়কে এসি বাস সমানতালে চললেও এর ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হয় না। এ সুযোগে এসি বাস কোম্পানিগুলো নিজেদের ইচ্ছামতো ভাড়া ঠিক করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ঈদযাত্রার সময় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করলেও দেখার যেন কেউ নেই! সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসি বাসের ভাড়া ঠিক করার দায়িত্বও বিআরটিএর। তারা যতদিন পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন না করবে, ততদিন নৈরাজ্য চলতেই থাকবে।
ঢাকা মহানগরসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং দূরপাল্লায় নন-এসি বাসের পাশাপাশি চলাচল করছে এসি বাস। সার্বিক বিবেচনায় এসি বাসের সংখ্যা নেহাত কম নয়। বরাবরই নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বিআরটিএ নন-এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে আসছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি-হ্রাসসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ভাড়া বাড়িয়ে-কমিয়ে সমন্বয়ও করে আসছে সংস্থাটি। কিন্তু এসি বাসের ক্ষেত্রে বিআরটিএর সব সময় উদাসীন থাকার অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। এ সুযোগে এসি বাসগুলো ইচ্ছামাফিক ভাড়া আদায় করে আসছে।
ঢাকা-বরিশাল নন-এসি বাসের ভাড়া কোম্পানিভেদে যেখানে অনলাইনে ৫৯০ থেকে ৬২০ টাকায় মিলছে, এসি বাসের ক্ষেত্রে সেখানে এক হাজার ২০০ থেকে এক হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। ঢাকা থেকে কক্সবাজার নন-এসি বাসের টিকিট অনলাইনে ৯০০ থেকে এক হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, এসি বাসের ক্ষেত্রে তা নেওয়া হচ্ছে এক হাজার ১০০ থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত। কাউন্টার থেকে ঈদযাত্রায় সময় নন-এসি বাসে যেমন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেশি আদায়ের অভিযোগ রয়েছে, তেমনি এসি বাসের ক্ষেত্রে এ হার আরো বেশি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে গত ২৯ মার্চ সচিবালয়ের সড়ক নিরাপত্তা জোরদারসংক্রান্ত সভা শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়ার বিষয়ে যেখানে অভিযোগ পাওয়া গেছে, সেখানে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
পরে ২১ এপ্রিল সচিবালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান জানান, ঈদুল আজহার আগেই এসি বাসের ভাড়া বিআরটিএ থেকে নির্ধারণ করা হবে। এ লক্ষ্যে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ ও বাস মালিক সমিতির আলোচনা চলছে।
এদিকে, গত ১৫ এপ্রিল সচিবালয়ে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের যুগ্ম সচিব আব্দুস সোবহানের সভাপতিত্বে এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণসম্পর্কিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ঈদুল আজহার আগেই এসি বাসের ভাড়া চূড়ান্ত করার বিষয়ে সরকারের নির্দেশনার কথা জানানো হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণের লক্ষ্যে বিভিন্ন রুটের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন ভাড়ার একটি প্রস্তাব তৈরি করে এক সপ্তাহের মধ্যে দাখিল করতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণসম্পর্কিত সভার কার্যবিবরণী গত ২৬ এপ্রিল তৈরি হয়। কার্যবিবরণী অনুযায়ী, মালিক সমিতির দেওয়া প্রস্তাবের ওপর ভিত্তি করেই পরে মূল কমিটির সভায় চূড়ান্ত ভাড়ার হার নির্ধারণ করা হবে। কিন্তু ঈদুল আজহা কড়া নাড়লেও এখন পর্যন্ত এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়নি। ফলে এবারের ঈদযাত্রায়ও এসি বাসে আগের মতো ইচ্ছামাফিক ভাড়া আদায় করা হবে ।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক আমার দেশকে বলেন, বিভিন্ন কোম্পানির বিভিন্ন মডেলের এসি বাস চলাচল করছে। একেক মডেলের বাসের ভাড়া একেক হারে নির্ধারণ হয়ে থাকে। তবে বিআরটিএ নির্ধারণ করে না দেওয়ায় এসব বাসের মালিকরা ইচ্ছামতো ভাড়া আদায় করে থাকেন। এটি দেখার কেউ নেই। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ঈদের সময় আরো বেশি ভাড়া আদায় করার অভিযোগ আমরা পাই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে বিভিন্ন কোম্পানির প্রায় ১২ ধরন বা মডেলের এসি বাস চলাচল করে। এপ্রিলে সচিবালয়ে এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণসম্পর্কিত সভায় পরিবহন মালিকরা ভাড়া নির্ধারণের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা ও জটিলতার কথা তুলে ধরেন। ভাড়া নির্ধারণ করতে হলে জ্বালানি তেল, মবিল ও রক্ষণাবেক্ষণ খরচসহ কস্ট অ্যানালাইসিস করে বিবেচনায় নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম আমার দেশকে বলেন, মন্ত্রী বলেছিলেন এসি বাসের যে ভাড়া বর্তমানে নেওয়া হচ্ছে, সেটির একটি তালিকা দেওয়ার জন্য। তার চেয়ে বেশি বা কম ভাড়া যাতে কেউ না নিতে পারে। এটি একটি ফরম্যাট আকারে স্টাবলিস্ট করার জন্য ঈদের পর আবার বসে আলোচনা করবেন।
তিনি বলেন, বিআরটিএকে আমরা প্রস্তাব করেছি—এসি বাসের ভাড়া রেগুলেটেড করা যাবে না। বর্তমানে যেভাবে ভাড়া নেওয়া হয়, সেটি বহাল রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি আমরা সরকারের কাছেও উপস্থাপন করব। এসি বাসে ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ভাড়া যৌক্তিক হারেই নেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গত বৃহস্পতিবার সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের মোবাইল নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। বুধ ও বৃহস্পতিবার বিআরটিএ চেয়ারম্যান হাবীবুর রহমানের সরকারি নম্বরে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি। হোয়াটসঅ্যাপে বিষয়টি জানিয়ে কথা বলতে চাইলেও সাড়া পাওয়া যায়নি।
সচিবালয়ে আগের সভায় বিআরটিএর পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছিলেন। বৃহস্পতিবার তার সরকারি নম্বরে কল করেও বন্ধ পাওয়া পাওয়া যায়। পরে শুক্রবার তার আরেকটি মোবাইল নম্বরে কল করে এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণের বিষয়ে অগ্রগতি জানতে চাইলে তিনি বিআরটিএ চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলতে বলেন। পরে বিআরটিএ চেয়ারম্যানকে কল করা হলেও তিনি ধরেননি। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে হালনাগাদ তথ্য পাওয়া যায়নি।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল হক আমার দেশকে বলেন, মালিকরা নিজেদের মতো করে ভাড়া ঠিক করছেন। এটি দেখার কেউ নেই। এর দায় বিআরটিএর। তারা অভিভাবক হয়েছে কিন্তু যে কাজ করার কথা, তা তারা করছে না।
তিনি বলেন, ঈদের সময় সরকারের সব সংস্থা গায়-গতরে নেমে কোনোরকমে ঠেকা কাজ করে। সারা বছর যার যা দায়িত্ব, তা ঠিকভাবে পালন করে না। সে কারণে ঈদযাত্রায় সাময়িক স্বস্তি মিললেও স্থায়ী সামাধান মিলছে না। বিআরটিএর কাজই হচ্ছে ভাড়া ঠিক করে দেওয়া, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে কেউ বেশি বা কম নিচ্ছে কি না, এসব দেখা। তারা সেটি না করে সরকারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে। এর সুযোগ নিচ্ছে এসি বাস কোম্পানিসহ অন্য পরিবহন কোম্পানিগুলো। বিআরটিএকে নিজেদের কাজটা ঠিক করে করতে বাধ্য করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান আমার দেশকে বলেন, নন-এসি বাসের ভাড়া বিআরটিএ ঠিক করে দেয়। কিন্তু ঈদযাত্রার সময় বেশি ভাড়া আদায় করা হয়, সেটি বিআরটিএ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এসি বাসে তো ভাড়াই ঠিক করে দেওয়া হয়নি, তা নিয়ন্ত্রণ করবে কীভাবে? ফলে একেক রুটে বিভিন্ন মডেলের অনেকগুলো কোম্পানির এসি বাস চলছে। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো করে বিভিন্ন কায়দায় ভাড়া বাড়িয়ে নিচ্ছে। এখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, শৃঙ্খলা নেই।
তিনি বলেন, বিআরটিএকে এসি বাসের মডেলভিত্তিক ভাড়া যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করে দিতে হবে। হুন্দাই কোম্পানির বাসের ভাড়া আরএম কোম্পানির বাসের থেকে ভিন্ন হবে, তা আবার ভলভো কোম্পানির বাসের ভাড়া থেকে ভিন্ন হবে। অর্থাৎ একেক মডেলের বাসের ভাড়া একেক রকম হবে। কেননা, মডেলভেদে বাসের বিনিয়োগও ভিন্ন ভিন্ন। এসব বিবেচনা করে বিআরটিএর উচিত এসি বাসের ভাড়া ঠিক করে দেওয়া।
বিদ্যমান ব্যবস্থায় বাসের ভাড়া নির্ধারণ করলেও তা বাস্তবায়ন বা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে উল্লেখ করে ড. হাদিউজ্জামান বলেন, যেভাবে বাস চলছে, তাতে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ব্যক্তিমালিকানায় অসংখ্য কোম্পানির বাস চলছে। নির্দিষ্ট কয়েকটি কোম্পানির আওতায় যদি বাসগুলো চলত, তাহলে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো।