রাজধানীর মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি কলোনি সরকারি মাঠ ঘিরে প্রায় ১৫ ফুট উঁচু প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে শিশু-কিশোরদের বিনামূল্যে খেলাধুলার সুযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, মাঠে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) টেলিকম ও সফটওয়্যার প্রযুক্তি কমপ্লেক্স নির্মাণের উদ্যোগের আড়ালে মাঠটি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এক সময় এই মাঠে শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার পাশাপাশি রাজনৈতিক দলের জনসভা ও সরকারি টিকাদান কর্মসূচিসহ বিভিন্ন আয়োজন হতো। এখন সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত হয়ে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
গত সোমবার সরেজমিনে মাঠের পাশে একটি সাইনবোর্ড দেখা যায়। এতে বলা হয়েছে, মাঠে বিটিসিএল টেলিকম অ্যান্ড সফটওয়্যার টেকনোলজি কমপ্লেক্স প্রকল্পের কাজ চলছে। একই সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, মাঠে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রাচীর নির্মাণের কাজ চলছিল।
কাজের সঙ্গে যুক্ত রিমা কনস্ট্রাকশনের ম্যানেজার পরিচয় দেওয়া মো. লিটনের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়। তিনি বলেন, তার প্রতিষ্ঠানই প্রাচীর নির্মাণ করছে। মাঠে প্রবেশের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে আর সাধারণ কেউ ঢুকতে পারবে না। মাঠের মধ্যে বড় কমপ্লেক্স হবে। আর মাঠে বড় লিগগুলো খেলবে। এখানে আর সাধারণ মানুষ খেলতে পারবে না। খেলতে হলে টাকা দিয়ে খেলতে হবে, তা সে যেই হোক।’
কীভাবে এই কাজের দায়িত্ব পেয়েছে রিমা কনস্ট্রাকশন, জানতে চাইলে প্রাচীর নির্মণের কাজ পরিদর্শনে আসা প্রতিষ্ঠানটির প্রকৌশলী পরিচয় দেওয়া নুর হোসেন বলেন, ‘গত ছয় মাস আগে আমরা বিটিসিএল থেকে দরপত্র পেয়েছি। আমাদের কাজ প্রাচীর তুলে দেওয়া। বাকি কী হতে চলেছে, তা বিটিসিএলই বলতে পারবে।’
দরপত্র দেখতে চাইলে প্রতিবেদককে নুর হোসেন জানান, সেটি অফিসে রেখে এসেছেন। তিনি অফিসে যান না, মাঠেই থেকে কাজ করেন।’ এদিকে সেখানে উপস্থিত বিটিসিএলের ম্যানেজার পরিচয় দেওয়া মো. রাসেল রহমান বলেন, ‘প্রাচীর তুলছি, কোনো ব্যবসায়িক কারণ নেই। এখানে ট্রাক, ময়লা-আবর্জনা রাখত। সেগুলো বন্ধ করার জন্য।’
মাঠ ঘিরে ক্ষোভ
সরেজমিনে দেখা যায়, মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠটি ওই এলাকার অন্যতম বড় উন্মুক্ত স্থান ও খেলার মাঠ। এখানে স্থানীয় শিশু-কিশোরদের পাশাপাশি বিভিন্ন বয়সি মানুষ খেলাধুলা করতেন। মাঠটির চারপাশে উঁচু প্রাচীর নির্মাণের উদ্যোগে স্থানীয় বাসিন্দা, তরুণ ও পরিবেশকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
মাঠে ফুটবল খেলতে আসা তিতুমীর কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঢাকা শহরে কংক্রিটের স্থাপনা বাড়ার মধ্যে উন্মুক্ত মাঠ টিকিয়ে রাখা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। তাদের অভিযোগ, বিটিসিএল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে মাঠটি সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে দিচ্ছে।
মাঠে প্রাচীর নির্মাণের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীরা আদালতে রিটসহ আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। তাদের দাবি, মাঠের উন্মুক্ত পরিবেশ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষ ও শিশুদের খেলাধুলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাদের আশঙ্কা, উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘিরে মাঠে প্রবেশাধিকার সীমিত বা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
পরিবেশ আন্দোলনকর্মীরাও এর আগে মাঠটিকে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত না রেখে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহার এবং সেখানে বিশেষ কোনো কমপ্লেক্স তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
টিঅ্যন্ডটি মাঠের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল, ঢাকার অল্প কয়েকটি মাঠের মতো এখানেও শিশু-কিশোররা অবাধে খেলতে পারত। আশপাশের বস্তির প্রান্তিক পরিবারের ছেলেমেয়েরাও মাঠটিতে খেলার সুযোগ পেত। মাঠটি এভাবে ঘিরে ফেলার উদ্যোগে সেই সুযোগ হারানোর আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। ঢাকার বুকে এখনো যে মাঠগুলোতে প্রান্তিক শিশুরা বিনামূল্যে খেলতে পারে, তা রক্ষা না করে বরং ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে।
গাছ কাটা ও বাণিজ্যিক ব্যবহারের আশঙ্কা
পরিবেশবাদী সংগঠন সেইভ ফিউচার বাংলাদেশের প্রধান সমন্বয়ক নয়ন সরকার আমার দেশকে বলেন, মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠটি শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সি মানুষের জন্য উন্মুক্ত স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল। একসঙ্গে শত শত মানুষ এখানে খেলাধুলা করতেন। কেউ ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল বা হা-ডু-ডু খেলতেন, কেউ সাইকেল চালাতেন। শিশুরা খোলা মাঠে মাটি নিয়ে খেলত।
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি দেখলাম, মাঠটির চারপাশে উঁচু সীমানাপ্রাচীর তৈরি করা হচ্ছে। এমনকি এজন্য আম, অর্জুন ও কাঁঠাল গাছ কাটা হয়েছে। সীমানাপ্রাচীর দিয়ে এখন মাঠটিতে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এরপর দেখা যাবে, কোনো কোম্পানির দখলে দেওয়া হবে। তারপর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ স্মৃতি পার্কের মতো বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হবে।’
মাঠে বিটিসিএল কমপ্লেক্স নির্মাণের বিষয়েও তারা জানতে পেরেছেন বলে জানান নয়ন সরকার। তার ভাষ্য, বর্তমান সরকার মাঠ ও পার্ক সংরক্ষণ এবং নতুন মাঠ তৈরির প্রতিশ্রুতি দিলেও সরকারি মাঠে সাধারণ মানুষের অবাধ প্রবেশাধিকার কেড়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলতে চাই, কোনোভাবেই মহাখালী টিঅ্যান্ডটি মাঠ ধ্বংস করে ভবন নির্মাণ করা যাবে না এবং কোম্পানির দখলে দিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম করা যাবে না। মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ করে জনগণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। অন্যথায় আমরা টিঅ্যান্ডটি মাঠ রক্ষায় আন্দোলনের ডাক দেব।’
উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রকাশের দাবি
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও ক্রীড়ামন্ত্রী যখন এলাকাভিত্তিক ও ওয়ার্ডভিত্তিক খেলার মাঠ তৈরির ঘোষণা দিচ্ছেন, তখন এমন একটি সর্বজনীন মাঠ ধ্বংসের উদ্যোগ নিন্দনীয়। এ কাজ অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত।
তিনি বলেন, মাঠে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রয়োজন থাকলেও তা নিচু ও দৃশ্যমান হওয়া উচিত, যাতে বাইরে থেকে ভেতরের সবকিছু দেখা যায়। কিন্তু এখানে কী করা হচ্ছে, কেন প্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে কিংবা এর নকশা কী—তা সাধারণ মানুষ জানে না। এ নিয়ে কোনো আলোচনা বা পরামর্শও করা হয়নি।
অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খানের মতে, ঢাকার বিভিন্ন খেলার মাঠ একের পর এক দখল হয়ে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, মহাখালীর টিঅ্যান্ডটি মাঠ ঘিরে নেওয়া উদ্যোগও সে ধরনের আশঙ্কা তৈরি করছে। মাঠটিতে আগের মতো সবার অবাধ প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে সরকারের প্রধান ও ক্রীড়ামন্ত্রীর অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন।
তিনি আরো বলেন, মাঠে কোনো উন্নয়নকাজ করার আগে সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। এ বিষয়ে এলাকাবাসী, নগর পরিকল্পনাবিদ ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মতামত নেওয়াও জরুরি। সরকার নতুন খেলার মাঠ তৈরির কথা বললেও বিদ্যমান মাঠগুলো যদি সর্বজনীনভাবে ব্যবহার করা না যায়, বিশেষ করে প্রান্তিক ও বস্তিবাসী মানুষের খেলাধুলার সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়, তবে তা টেকসই উন্নয়নের লক্ষণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মাঠটি রক্ষায় অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান এই নগর পরিকল্পনাবিদ।