সার আমদানির ক্ষেত্রে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মারপ্যাঁচে পড়েছে বর্তমান বিএনপি সরকারও। দেশে কত হেক্টর জমিতে চাষাবাদ হচ্ছে, তা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই আমলাদের পরামর্শে চলতি বছরে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে এক লাখ টন সার কম কেনা হচ্ছে। অথচ বিগত কয়েক বছর ধরে দেশে প্রতি অর্থবছরে গড়ে ২৭ লাখ টন শুধু ইউরিয়া সারই কেনা হতো। এরপরও বোরো মৌসুমে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের তীব্র সংকটে পড়তে হতো কৃষকদের। এমন পরিস্থিতিতেও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই), কৃষিবিদ ও কৃষকদের মাঠপর্যায়ের চাহিদা আমলে নেওয়া হচ্ছে না বলে কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্ভরযোগ্য সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ প্রসঙ্গে ডিএই-এর সরেজমিন
উইংয়ের পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল আমার দেশকে বলেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিগত সিদ্ধান্তের আলোকেই ইউরিয়াসহ সব ধরনের সার কেনা হয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয় মূল সমন্বয়টি করে থাকে। এতে ডিএই-এর খুব বেশি ভূমিকা থাকে না। এমনকি অনেক সময় কৃষকের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী সার কেনা সম্ভব হয় না। তবে তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, কৃষিই খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার প্রধান চালিকাশক্তি। সার্বিক পরিস্থিতি ও চাহিদা বিবেচনা করেই সরকার সার আমদানি করে। চলতি অর্থবছরে যে পরিমাণ সারই কেনা হোক না কেন, কোনো সংকট হবে না বলে আশা করা যাচ্ছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, কয়েক বছর ধরে প্রতি অর্থবছর ২৭ লাখ টন ইউরিয়া সার কেনা হচ্ছিল। কিন্তু চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা কমিয়ে ২৬.২০ লাখ টন নির্ধারণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডিএপি সারের বরাদ্দও কমানো হয়েছে। অথচ বিগত বোরো মৌসুমেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের জন্য কৃষকদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, সার সংকটের কারণে অতীতে দেশে একাধিক অনাকাঙ্ক্ষিত ও সহিংস ঘটনা ঘটেছে। ২০০১-০৬ মেয়াদে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কানসাটে সার সংকটের জেরে স্থানীয় কৃষকদের আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর আগে ১৯৯৫ সালে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামেও সার সংকটে আন্দোলনরত কৃষকদের ওপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণে বেশ কয়েকজন নিহত হন।
বিগত ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার পূর্ববর্তী এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সারের পর্যাপ্ত আমদানি বজায় রাখার চেষ্টা করত। ফলে নানাবিধ সংকট থাকলেও সার নিয়ে বড় ধরনের অসন্তোষ কম ছিল। জুলাই বিপ্লবের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার তৃতীয় মেয়াদে (প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসন আমল ব্যতীত) ক্ষমতা গ্রহণ করে। সরকার কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, সাধারণ পরিবারের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ এবং ধর্মীয় উপাসনালয়ের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও ধর্মগুরুদের জন্য মাসিক বেতন-ভাতার মতো বেশকিছু ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে।
তবে কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আমলাদের ভুল পরামর্শে সারের ঘাটতি তৈরি হলে সরকারের এসব ইতিবাচক পদক্ষেপের সাফল্য ম্লান হয়ে যেতে পারে।
ইতোমধ্যেই সার বরাদ্দের এই কাটছাঁটের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকেরা সোচ্চার হতে শুরু করেছেন। হাওড়বেষ্টিত কিশোরগঞ্জ জেলা থেকে স্থানীয় কৃষি অফিসের মাধ্যমে গত ২৩ মে ঢাকার খামারবাড়ির সরেজমিন উইংয়ের পরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, বিগত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খরিপ-২ ও রবি মৌসুমে ডিএপি সারের সংকট দেখা দেওয়ায় কয়েকটি উপজেলায় পুলিশি পাহারায় সার বিতরণ করতে হয়েছিল। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য জেলা থেকে ৫৯ হাজার ৯৪ টন ইউরিয়া এবং ৩১ হাজার ৮০১ টন ডিএপি সারের চাহিদা পাঠানো হলেও বরাদ্দ মিলেছে যথাক্রমে ৫৩ হাজার ১৩০ টন ও ২৪ হাজর ৭০০ টন। অর্থাৎ, চাহিদার চেয়ে ২০৫২ টন ইউরিয়া এবং ১,০০০ টন ডিএপি সার কম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ে বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে আশঙ্কায় দ্রুত বরাদ্দ বাড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিশোরগঞ্জের মতো সুনামগঞ্জসহ দেশের আরো কয়েকটি জেলা থেকেও একই ধরনের ক্ষোভ ও শঙ্কা জানিয়ে ডিএই-তে চিঠি পাঠানো হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগ আমলে নেওয়া হচ্ছে না বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ডিএই-এর একাধিক কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন। তারা আমার দেশকে বলেন, আমন ও আউশ ফসলে ইউরিয়া কম লাগলেও বোরো ধানে ইউরিয়া ও ডিএপি সারের ব্যাপক চাহিদা থাকে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের পরামর্শ উপেক্ষা করে শুধুমাত্র আমলাদের কথায় এই সংবেদনশীল ইস্যুতে সার কম আমদানির সিদ্ধান্ত বর্তমান সরকারের জন্য বুমেরাং হতে পারে।
সার্বিক পরিস্থিতি তদারকি করতে ইতোমধ্যে সরকার দেশের সার উৎপাদন, আমদানি, সরবরাহ, বিতরণ ও মূল্য পরিস্থিতি পর্যালোচনার জন্য কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের সভাপতিত্বে ১৫ সদস্যের ‘জাতীয় সার সমন্বয় ও পরামর্শক কমিটি’ গঠন করেছে। গত ২২ জুন জারি করা আদেশের আলোকে এই কমিটি ডিলার নিয়োগ পদ্ধতি পর্যালোচনা ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ করবে। পূর্বের প্রজ্ঞাপন বাতিল করে এই নতুন আদেশ অবিলম্বে কার্যকর করা হয়েছে।
বিশিষ্ট কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. মো. জাহাঙ্গীর আলম এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, বিগত বোরো মৌসুমে সার সংকটের কারণে কৃষকদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে এবং প্রায় ২০০-২৫০ টন খাদ্য উৎপাদন কম হয়েছে। এবারও যদি যথাসময়ে ও প্রয়োজন অনুযায়ী সার আমদানি না করা হয়, তবে খাদ্য উৎপাদন আরো কমবে এবং দেশ সংকটে পড়বে। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিসিআইসি সার আমদানির দায়িত্ব পেলেও প্রতি বছরই তারা লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়।
তিনি আরো বলেন, সরকারের উচিত আমলাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে যে পেশার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বাস্তবসম্মত পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া। অন্যথায় আসন্ন আমন মৌসুমেও সারের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
এদিকে সার্বিক বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের সাড়া মেলেনি। হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, দেশে বছরে তিন মৌসুমে বোরো, আমন ও আউশ ধানের চাষ হয়ে থাকে। এর মধ্যে বোরো ধানের আবাদ হয় প্রায় ৪৮-৫০ লাখ হেক্টর জমিতে এবং উৎপাদন হয় প্রায় দুই কোটি ১০ লাখ টন, যা দেশের মোট ধান উৎপাদনের সবচেয়ে বড় অংশ। অন্যদিকে, আমন ধানের চাষ হয় ৫৭-৫৮ লাখ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে উৎপাদন হয় প্রায় এক কোটি ৫৫ লাখ থেকে এক কোটি ৬৬ লাখ টন ধান। এছাড়া আউশ ধানের আবাদ হয় প্রায় ১০-১১ লাখ হেক্টর জমিতে এবং উৎপাদন হয় প্রায় ৩০ লাখ টন।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জাত ও আবহাওয়া ভেদে প্রতি হেক্টরে ধানের গড় ফলন ৪.৫ থেকে ৮ টন পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে বন্যা, অনাবৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রতিবছর উৎপাদনে কিছুটা তারতম্য দেখা দিতে পারে।