হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

ভিআইপিদের নিরাপত্তা দিলেও কষ্টের জীবন পুলিশের

আল-আমিন

রাজধানীর মিন্টো রোডের মন্ত্রীপাড়ার ৮ নম্বর বাড়ি। বাসিন্দা প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির। গত সোমবার দুপুরে ওই বাসায় গিয়ে দেখা যায়, গেটের সামনে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কনস্টেবল সাদিকুল ইসলাম আকাশের দিকে উদাস দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। মনে হচ্ছিল, কিছু একটা ভাবছেন। বাসার সামনে যাওয়ার পরই পরিচয় জানতে চাইলেন। পরে বাসার বিষয়ে কথা বললেন।

সাদিকুলের মতো ভিআইপি (ভেরি ইম্পর্টেন্ট পারসন) প্রটেকশনে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের অনেকের এভাবেই সময় কাটে। ভিআইপিদের তারা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে রাখলেও তাদের অনেকের কষ্টগাথা ও বঞ্চনার খোঁজ কেউ রাখে না। ক্ষমতার চৌহদ্দিতে থেকে কোনো কোনো সদস্য অবশ্য ছোটখাটো তদবির করে ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করেন।

ভিআইপিদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও চলাচলের সময় সুরক্ষার জন্য ঢাকায় এক হাজার ৬৯১ জন পুলিশ নিয়োজিত। তারা ৪৯ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ছাড়াও অন্য ভিআইপিদের নিরাপত্তা দিচ্ছেন। ভিআইপিদের বাসায় রোস্টার করে চারজন, অফিসে একজন এবং গাড়িবহরে পাঁচজন করে পুলিশ প্রটেকশনের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এছাড়াও পুলিশের বিশেষ ব্রাঞ্চ (এসবি) থেকে ভিআইপিদের একজন গানম্যান দেওয়া হয়। ওই গানম্যান পুলিশের গাড়িতেই থাকেন। আবার কেউ আলাদা গাড়িতে থাকেন।

পুলিশের প্রটোকল বিভাগের তালিকা অনুযায়ী ভিআইপিরা হলেনÑরাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, প্রধান বিচারপতি ও উচ্চ আদালতের বিচারপতি, বিরোধী দলের নেতা, প্রধান নির্বাচন কমিশনার, মন্ত্রিপরিষদের সদস্য, দুদক চেয়ারম্যান প্রমুখ। এছাড়াও সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ প্রজ্ঞাপন জারি করে যেকোনো ব্যক্তিকে ভিআইপি মর্যাদা দিতে পারে। যেমন সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে ভিআইপি মর্যাদা দিয়েছে সরকার। তার সঙ্গে পাঁচজন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানা গেছে। এছাড়াও ৩৮টি কেপিআইভুক্ত (কি পয়েন্ট ইনস্টলেশন) স্থাপনায় পালাক্রমে পাঁচজন করে সদস্য দায়িত্ব পালন করে থাকেন। রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এবং বিদেশি অতিথিদের বাংলাদেশে সফরের সময় বিশেষ নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করে প্রটেকশন পুলিশ। দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে তারা দায়িত্ব পালন করেন। আর বিদেশি দূতাবাসগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য নিযুক্ত রয়েছে চ্যান্সারি পুলিশ।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) সূত্রে জানা গেছে, ডিএমপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে ভিভিআইপি ও ভিআইপিদের নিরাপত্তা দেওয়া। প্রত্যেক দিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তারা এ কর্মযজ্ঞ করে থাকে। ঢাকায় ভিআইপিদের নিরাপত্তা দিতে চলতি মাসে এক হাজার ৬৯১ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ভিআইপির তুলনায় ফোর্সের ঘাটতি রয়েছে। নিরাপত্তায় মোট ফোর্স লাগবে দুই হাজার ৫৭৫ জন, কিন্তু আছে এক হাজার ৬৯১ জন। ফলে ফোর্স ঘাটতি রয়েছে ৮৯৬ জন। এ ঘাটতির জন্য পুলিশকে অনেক হিমশিম খেতে হয়। ঘাটতির কারণে অনেক সময় একটি প্রটেকশন টিম বা একাধিক পুলিশ সদস্যকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ে। দায়িত্ব পালনরত একাধিক প্রটেকশন পুলিশের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অতিরিক্ত দায়িত্ব ও কাজের চাপে তাদের মেজাজ দিনদিন খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। তাদের ধৈর্যশক্তি কমে যাচ্ছে।

জানা গেছে, বঙ্গভবনে দায়িত্ব পালন করেন ১৩৫ জন পুলিশ সদস্য। তারা বঙ্গভবনের গেট, মূল প্রবেশপথ, আশপাশের সড়কে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাসা গুলশানে ৪০ জন পুলিশ দায়িত্ব পালন করেন। সংসদের বিরোধী দলের নেতা ডা. শফিকুর রহমানের গাড়িবহরের প্রটেকশনে পাঁচজন পুলিশ সার্বক্ষণিক দায়িত্বে আছেন। যেসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বা ভিআইপি ঢাকার বাইরে যান, তখন তাদের প্রটেকশন দেন জেলার সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ। প্রটেকশনে দায়িত্ব পালনকারী পুলিশ সদস্যদের খাবার যায় পুলিশ মেস অথবা সংশ্লিষ্ট থানার কিচেন থেকে। সচিবালয়ের খাবার যায় রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে।

অধিকাংশের সময় কাটে মোবাইলে

মন্ত্রীপাড়ার বাসায় যারা ডিউটি করেন, তাদের অধিকাংশেরই সময় কাটে মোবাইল দেখে। সরেজমিন দেখা গেছে, এয়ারফোন দিয়ে কেউ মোবাইলে গান শুনছেন, কেউ ছবি দেখছেন কেউবা নাটক দেখছেন।

একাধিক পুলিশ সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভিআইপি এলাকা হওয়ায় গেটের সামনে কেউ আসেন না। শুধু মন্ত্রীর প্রবেশ ও দর্শনার্থীদের প্রবেশের জন্য তিনি গেট খোলেন। কারো সঙ্গে তাদের তেমন কথা হয় না। তাই সময় কাটাতে তারা মোবাইলে মগ্ন থাকেন। মাসে তাদের মোবাইল ডেটাই যায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকার।

অন্যদিকে সচিবালয়ের প্রটেকশন পুলিশে থাকা সদস্যদের সময় কাটে গল্পগুজব করে। সেখানে কাউকে মোবাইল ফোন নিয়েও ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।

খাবার ও টয়লেট সমস্যা

প্রটেকশন পুলিশের অন্যতম সমস্যা খাবার সরবরাহে দেরি হওয়া। অনেক সময় মেস থেকে খাবার সরবরাহ দেরিতে করা হয়। আবার মন্ত্রীর বের হওয়ার সময় হলে দ্রুত খেয়ে তাদের গাড়িতে উঠতে হয়। তাদের নির্দিষ্ট কোনো খাবারের জায়গাও নেই। অনেক সময় তারা অস্বাস্থ্যকর ও খোলা আকাশের নিচে খাবার খেয়ে থাকেন।

প্রটেকশন পুলিশের অন্যতম আরেকটি সমস্যা হলো টয়লেট। মন্ত্রী অফিস বা বাসা থেকে কোনো স্থানে গেলে প্রটেকশন পুলিশের সদস্যদের টয়লেট নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। বেসরকারি কোনো অফিসে পুলিশ সদস্যরা ঢুকলে সেখানে বাধার সম্মুখীন হন।

সন্ধ্যার পর দর্শনার্থীর চাপে হিমশিম

সন্ধ্যা বা রাত ৮টার দিকে সাধারণত বাসায় ঢোকেন মন্ত্রী ও উপদেষ্টারা। তবে ঢাকার বাইরে থাকলে বাসায় আসেন না। যেদিন তারা বাসায় থাকেন, ওইদিন বাসার সামনে দর্শনার্থীদের চাপ বাড়ে। বিভিন্ন তদবিরের জন্য মন্ত্রীর এলাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লোকজন আসে। এ সময় বাসার সামনে ভিড় বেড়ে যায়। অনেকেই বাসায় জোর করে ঢুকতে চান।

অনেকেই মন্ত্রীকে ফোন দিয়ে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ধরিয়ে দেন। এতে তারা বিড়ম্বনায় পড়েন। দর্শনার্থীদের সঙ্গে অনেক সময় দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের ঝামেলাও হয়। ওই পুলিশ সদস্য যখন একা সামলে উঠতে না পারেন, তখন মন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী ও বাসার কেয়ারটেকারকে ফোন করেন। এ সময় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়। কখনো কখনো বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন।

অনেক মন্ত্রী ঘুরেও তাকান না

মিন্টো রোডে দায়িত্ব পালন করা এক কনস্টেবল নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তার খাবার আসে পুলিশের একটি মেস থেকে। রোস্টার অনুযায়ী যখন তার ডিউটি পড়ে, তখন তার সেখানে খাবার আসে। প্রত্যেক দিন মন্ত্রী বাসায় আসেন আর যান। সব সময় স্যালুট দেন। শুধু একদিন তার দিকে তাকিয়ে দেখেছেন।

তিনি আরো জানান, মন্ত্রী কখনো কোনো খোঁজখবরও নেন না। তার বাড়ি কোথায়, সেটিও মন্ত্রী জানেন না। মন্ত্রীর বাসায় ভালো রান্নাবান্না হয়, সেগুলোও তারা কোনো সময় পান না।

ওই পুলিশ সদস্য আক্ষেপ করে বলেন, ‘একটানা ডিউটিতে মন একঘেঁয়ে হয়ে যায়। অনেক সময় গুনগুন করে গান গাইতে থাকি’।

ভিআইপি প্রকেটশনে গাড়ির সংকট

পুলিশের ভিআইপি প্রটেকশনে গাড়ির সংকট রয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এ সংকট বেড়েছে। জুলাই আন্দোলনে একাধিক থানা ও পুলিশের স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে একাধিক প্রটেকশন গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। তখন থেকেই মূলত গাড়ির সংকট রয়েছে।

দেখা গেছে, একটি প্রটেকশন গাড়ি এক মন্ত্রীকে বাসা বা অফিসে পৌঁছে দিয়ে দ্রুত আরেকজন মন্ত্রীকে রিসিভ করতে বাসা বা অফিসে যায়। এতে পুলিশকে সড়কে একস্থান থেকে আরেক স্থানে যেতে খুবই হিমশিম পেতে হয়।

এসব বিষয়ে ডিএমপির উপকমিশনার (প্রটেকশন) শাহরিয়ার আলম আমার দেশকে বলেন, ‘ভিআইপি প্রটেকশনে রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা। প্রটেকশন টিমের ঘাটতি ফোর্স পূরণ করার জন্য চেষ্টা চলছে।’

অন্তহীন ভোগান্তিতে চিকিৎসাসেবা ম্লান ঢামেক হাসপাতালে

বিনিয়োগ সহযোগিতাসহ ১৩ সমঝোতা স্মারক সই

অন্তহীন ভোগান্তিতে চিকিৎসাসেবা ম্লান ঢাকা মেডিকেল হাসপাতাল

কনডেম সেলে ইবাদত বন্দেগি করে দিন কাটে সেই মিন্নির

সমীক্ষা ছাড়াই বন্ধ বিমানবন্দর চালুর উদ্যোগ, উঠছে প্রশ্ন

ভূমির রাজস্ব কর নির্ধারণে রক্ষকই ভক্ষক

ব্রিটিশ রাজনীতি ও অর্থনীতিকে যেভাবে পঙ্গু করেছে ব্রেক্সিট

তারেক রহমানকে নিয়ে মালয়েশিয়া সরকারের ভিডিও ‘আমার বন্ধু মহাজাদু জানে’

তিস্তায় পানির চাপে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত

পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে এখনো ধোঁয়াশা