স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আরো তিন বছর (২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত) সময় পাচ্ছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন নীতি কমিটি (ইউএন-সিডিপি) এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) বর্ধিত সময়সীমার এই আবেদন ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আগামী অধিবেশনে এটি অনুমোদন পেতে পারে।
সম্প্রতি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে জাতীয় উত্তরণ তদারকি ও সমন্বয় কমিটির দ্বিতীয় সভায় এমন তথ্য উপস্থাপন করা হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
কমিটির সভাপতি ও অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা, ইনভেস্ট বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী, অর্থ সচিবসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
জানা গেছে, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পর বৈশ্বিক বাজারে বাণিজ্য সুরক্ষার সমীকরণ আরো বদলে যাবে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে শুল্ক-সুবিধা সংকুচিত হওয়ার এই ক্রান্তিকালে দেশি শিল্প খাতকে বিদেশি পণ্যের অন্যায্য প্রতিযোগিতা ও তীব্র প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করতে এখন থেকেই নেওয়া হচ্ছে বিশেষ প্রস্তুতি। এ লক্ষ্যে এলডিসি উত্তরণে নতুন রোডম্যাপ তৈরি করেছে সরকার।
সভার শুরুতে ‘ন্যাশনাল রোডম্যাপ ফর স্মুথ, সাসটেইনেবল অ্যান্ড ইরিভার্সিবল এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন (২০২৬-২৯)’ শীর্ষক চূড়ান্ত কর্মপরিকল্পনা এবং কূটনৈতিক অগ্রগতি তুলে ধরা হয়।
বৈঠকে জানানো হয়, এলডিসি থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়টি জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) ও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। তবে কেন পিছিয়ে দেওয়া হবে, সে বিষয়টির যৌক্তিকতা তুলে ধরার কথা জানায় সিডিপি ও সামাজিক পরিষদ।
সরকার তাদের জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী মন্দা, জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, যুদ্ধ, বেকারত্ব, রিজার্ভ সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার কারণে দেশের ম্যাক্রো ইকোনমি সংকটে রয়েছে। তবে এই অতিরিক্ত সময় কোনো অবস্থায়ই দীর্ঘসূত্রতা বা পিছিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি না হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই দেশের সব কাঠামোগত সংস্কার সুচারুভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এরপর নতুন করে আর কোনো সময় চাওয়া যাবে না।
জানা গেছে, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাদের বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়েই সংস্কার কার্যক্রম শেষ করা হবে। সে লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে একটি প্রতিযোগিতামূলক, উৎপাদনমুখী, উদ্ভাবনভিত্তিক শিল্প অর্থনীতিতে রূপান্তরের সুনির্দিষ্ট রূপকল্প সামনে রেখে একটি রোডম্যাপ করা হয়েছে। সেখানে ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ যে মূল লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে চায়, তার মধ্যে রয়েছে—সামষ্টিক অর্থনীতি এবং বাহ্যিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, শিল্প খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করা, তৈরি পোশাক বা আরএমজি খাতের ওপর একক নির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈশ্বিক মূল্য সংযোজন শৃঙ্খলের সঙ্গে দেশের বাণিজ্যব্যবস্থার গভীর ও টেকসই ইন্টিগ্রেশন নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা উত্তরণ-পরবর্তী সময়ে টিকিয়ে রাখতে এফটিএ, সিইপিএ বা পিটিএ চুক্তি চূড়ান্ত করা, ব্যবসা সহজীকরণ সূচকের দৃশ্যমান উন্নতি সাধন, দক্ষ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মী বাহিনী তৈরি এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, টেকসই উত্তরণ নিশ্চিত করতে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ স্বম্ভ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রথমত, সামষ্টিক অর্থনীতি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, ব্যাংকিং খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বৃদ্ধি করা। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য রূপান্তর ও রপ্তানি প্রতিযোগিতা জোরদার করতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা, জাতীয় মান অবকাঠামো শক্তিশালীকরণ এবং ট্রিপস বা মেধাস্বত্ব সুবিধা সুরক্ষিত করা। তৃতীয়ত, উৎপাদন সক্ষমতা ও শিল্প আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তির ব্যবহার, ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো বাস্তবায়ন এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করা। চতুর্থত, মানব পুঁজি ও ভবিষ্যৎ দক্ষতার বিকাশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা, ডিজিটাল ও গ্রিন স্কিল এবং ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া সহযোগিতা জোরদার করা। পঞ্চমত, সুশাসন ও অংশীদারত্ব নিশ্চিত করতে জাতীয় এলডিসি মনিটরিং কমিটির মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব সুদৃঢ় করা।
জানা গেছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জনের জন্য সরকার তিন ধাপের সংস্কার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে কুইক-উইন পদক্ষেপ হিসেবে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির সমন্বয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো, ব্যাংকিং খাতে ডিসট্রেসড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক কার্যকর করা এবং ১৪ দিনের মধ্যে ব্যবসা শুরুর লাইসেন্স প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে ইন্টিগ্রেটেড ওয়ান স্টপ সার্ভিস চালু করার কার্যক্রম চলছে।
দ্বিতীয় ধাপে ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়াতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্পূর্ণ অটোমেশন, নন-ট্যাক্স রেভিনিউ বৃদ্ধি এবং শিল্প অবকাঠামো উন্নয়নের অংশ হিসেবে ইটিপি ও এপিআই পার্কের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তৃতীয় ধাপে ২০২৬ থেকে জুন ২০২৯ সালের মধ্যে ওষুধ, চামড়া, পাট, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং এবং আইসিটিসহ উচ্চ সম্ভাবনাময় খাতের রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিএসটিআইয়ের সেবাকে ২৪ ঘণ্টা চালুর ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
জানা গেছে, এই রোডম্যাপ বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি খাতের যৌথ মালিকানার ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নীতিগত পূর্বাভাস, সময়মতো অনুমোদন এবং কাস্টমস আধুনিকায়নের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্য সংগঠন ও চেম্বারগুলো প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন, ইএসজি ও শ্রম কমপ্লায়েন্স এবং কর্মসংস্থানের মানদণ্ড বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইতোমধ্যে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির বিষয়ে বাংলাদেশের অনুরোধের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন অর্জনের লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে।
গত জুলাই মাসে বাণিজ্যমন্ত্রীর নেতৃত্বে ঢাকায় কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে কর্মশালা করা হয়। পরে নিউ ইয়র্ক সফরকালে ইউএন-সিডিপির চেয়ারম্যান, জি-৭৭ ও চীন গ্রুপের চেয়ারপারসন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনা করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
এছাড়া জি-৭৭ এবং চীন গ্রুপের সঙ্গে অনুষ্ঠিত অনলাইন সভায় সংগঠনটি বাংলাদেশের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির অনুরোধের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে প্রস্তাবটি সহজভাবে গ্রহণের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ।
জানা গেছে, ২০২৯ সালের মধ্যে অর্জনের জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে বাস্তব জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ থেকে ৭ শতাংশে নেওয়া, মূল্যস্ফীতি ৯.১৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনা, কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের কম থেকে বাড়িয়ে অন্তত ৯ শতাংশ বা তার বেশি করা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আমদানির চার মাসের পরিবর্তে ছয় মাসের সমপরিমাণে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এছাড়াও ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণ বা এনপিএল অনুপাত ৩০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশের নিচে নামানো, নন-আরএমজি রপ্তানি অংশ ১৯ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার ২.৩ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৬ শতাংশে উন্নীত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নাধীন রয়েছে।
বলা হয়েছে, পুরো রোডম্যাপ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়নের ৪০ শতাংশ আসবে জাতীয় বাজেট বা এডিপি থেকে, ৩০ শতাংশ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে, ২৫ শতাংশ বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে এবং বাকি ৫ শতাংশ ব্লেন্ডেড ও গ্রিন ফাইন্যান্সের মাধ্যমে সংগৃহীত হবে। বিশ্বব্যাপী মন্দা, জ্বালানি মূল্য সংকট এবং ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতার মতো সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট কৌশল রোডম্যাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিবের নেতৃত্বে গঠিত পাবলিক-প্রাইভেট টাস্কফোর্স এবং এসএসজিপির মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি (সিডিপি) ও অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ ইতিবাচক সুপারিশ করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বিষয়টি উপস্থাপন করা হবে।
জি-৭৭ ও চীন গ্রুপসহ গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোর ইতিবাচক মনোভাবের কথা তুলে ধরে অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধির বিষয়ে তারা সংহতি প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রস্তাবটি সফলভাবে পাস হওয়ার আশা প্রকাশ করে তিনি জানান, সরকারের পক্ষ থেকে বসে না থেকে একটি সময়োপযোগী রোডম্যাপের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।