বিদ্যুৎ খাতের মিটার ও ট্রান্সফরমারসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কেনাকাটা এখনো পতিত আওয়ামী সরকারের আমলের সিন্ডিকেটের হাতেই। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী সরকারের আমলে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটই বিদ্যুৎ খাতের পুরো কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করছে। আর এ সিন্ডিকেটের নেপথ্যে রয়েছেন সাবেক বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বোন শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি।
তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন অকুলিন টেক বিডি লিমিটেডসহ চিহ্নিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আওয়ামী সরকারের আমলে এ খাতের সরঞ্জামাদি কেনা হয়। হাজার কোটি টাকার প্রিপেইড মিটার প্রকল্পটিও একইভাবে এখনো একই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ বিদ্যুৎ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তার দাবি, বিদ্যুৎ বিভাগ কেনাকাটায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তি ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রভাবের কাছে। সরকারি ও বেসরকারি ১৭ প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিরগুলোর তালিকাভুক্ত হলেও আওয়ামী লীগ ও অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ বছরে শুধু সিন্ডিকেটভুক্ত দু-তিনটি প্রতিষ্ঠানই প্রিপেইড মিটারসহ বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জামাদি সরবরাহ করার সুযোগ পেয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, ‘অকুলিন টেক বিডি’ প্রথমে ডিপিডিসির আট লাখ ৫০ হাজার প্রিপেইড মিটার প্রকল্পে নজর দেয়। অকুলিন কাজ পাবে তা প্রায় পূর্বঘোষিত ছিল। তাদের কাজ দেওয়ার বিষয় নিশ্চিত করেই ডিপিডিসিকে দিয়ে দরপত্র করানো হয়। ডিপিডিসি, নেসকো, ডেসকো, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি), বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) থেকে শুরু করে প্রায় সব সংস্থা এ প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ অনুযায়ী মিটার সরবরাহের ক্ষেত্রে এএমআই প্রকল্প তৈরি করে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে সব প্রি-পেইড মিটার এ প্রতিষ্ঠান থেকে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় বলে জানান তারা। এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ অকুলিন বিডি লিমিটেড সরাসরি কিংবা তাদের পছন্দের কোম্পানির মাধ্যমে করেছে বলেও অভিযোগ বেসরকারি খাতের কয়েকজন উদ্যোক্তার।
ঘুরেফিরে আওয়ামী সিন্ডিকেট
প্রিপেইড মিটার কেনাকাটায় আওয়ামী সিন্ডিকেটের চিত্র তুলে ধরে মিটার প্রস্তুতকারী দেশি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, পতিত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে কিছু মিটার উন্মুক্ত দরপত্র এবং কিছু মিটার কেনা হয়েছে ডিপিএম বা সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি অনুসরণ করে। উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতেও ঠিকাদার বাছাইয়ের কাজ পলাতক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুই চূড়ান্ত করে দিতেন। দরদামের বিষয়টিও তিনিই ঠিক করে দিতেন। পাতানো দরপত্রের মাধ্যমে ঘুরেফিরে তার নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের অন্তর্ভূক্ত কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকেই সরবরাহের কাজ দেওয়া হতো।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রিপেইড মিটার সরবরাহে সবার চেয়ে এগিয়ে ‘অকুলিন টেক বিডি’। শেখ রেহানার পুত্র রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০১৯ সালে চীনের একটি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে নেসকোতে মিটার সরবরাহের ১০৭ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয় এ প্রতিষ্ঠানটিকে। একই ধারাবাহিকতায় তারা ২০২১ সালে ৯২ কোটি টাকার মিটার সরবরাহের কাজও বাগিয়ে নেয়। এ দুটি অভিজ্ঞতার সনদ দেখিয়ে অকুলিন টেক বিডিকে দেশের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা পল্লীবিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (আরইবি) মিটার সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়।
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম অরুণ বলেন, ‘২০১৯ সালের দিকে দেশের বিদ্যুৎ খাতে অকুলিন টেক বিডি লিমিটেড নামে নতুন এক কোম্পানির আবির্ভাবের কথা আমরা জানতে পারি। শেখ রেহানার ছেলে ববির সঙ্গে বন্ধুত্বের সুবাদে শাদাব সাজিদ ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে এ কোম্পানির কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে এটি বিদ্যুৎ ও আইটি খাতে বিশাল অঙ্কের প্রকল্প হাতিয়ে নেয়। গার্মেন্টস ব্যবসা থেকে বিদ্যুৎ এবং আইটি খাতে এসেই তারা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার বিপুল অঙ্কের টাকার কাজ বাগিয়ে নেয়।’
জালিয়াতির নাম ‘এএমআই’ টেকনিক
বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দরপত্র আহ্বান করার সময় হঠাৎ করেই ‘অ্যাডভান্স মিটারিং ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ (এএমআই) নামে একটি শর্ত যোগ করে দেয়। এর মাধ্যমে নতুন করে সাড়ে আট লাখ মিটার কেনার কথা রয়েছে। দরপত্র আহ্বানের আগেই এ চিহ্নিত ওই প্রতিষ্ঠানের নামে এ টেকনিক সংযুক্ত করে মিটার তৈরির কাজ সম্পন্ন করা হয়। পরবর্তী সময়ে শুধু আনুষ্ঠানিকতার জন্য দরপত্র আহ্বান হয়। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এটিকে ‘জালিয়াতির এএমআই টেকনিক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, অকুলিন বিডি ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠান যাতে দরপত্রে অংশ নিতে না পারে, সেজন্যই চিহ্নিত সিন্ডিকেট এমন আয়োজন করে।
ডিপিডিসির এএমআই প্রকল্পে যত অনিয়ম
ডিপিডিসির কেনাকাটায়ও অকুলিন টেক বিডি লিমিটেডের অনুকূলে রেখে দরপত্র জমা দেওয়ার শর্ত তৈরি করা হয়। নানান ছলচাতুরীর মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠানের জন্য ওই প্রতিষ্ঠান থেকে মিটার কেনা হয়।
ডিপিডিসির এক কর্মকর্তা জানান, ডিপিডিসি মিটার প্রকল্পে ইউরোপিয়ান ল্যান্ডিস অ্যান্ড গিয়ারের অত্যাধুনিক মিটার সরবরাহের কথা থাকলেও এগুলো মূলত চীনে প্রস্তুত হয়। মিটার কমিউনিকেশনের ‘নিক কার্ড’ সরবরাহ করা হয় ভারত থেকে। পুরো প্রকল্প তদারকি করেছে ল্যান্ডিস অ্যান্ড গিয়ারের কয়েকজন ভারতীয় প্রতিনিধি। তিনটি প্যাকেজে দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রতিটিতেই ঘুরেফিরে তিন কোম্পানি থেকে মিটার কেনা হয়। দফায় দফায় প্রকল্পের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়।
নেসকো এএমআই প্রকল্প
নেসকোতে ১২ লাখ প্রিপেইড মিটার প্রকল্প অকুলিন টেক বিডি প্রথম প্যাকেজ থেকেই কবজা করে নেয়। অকুলিনের প্রভাবে মিটার প্রকল্পে যোগ হয় ডেটা সেন্টার। টেন্ডার দলিল প্রস্তুত হয় অকুলিনের প্রেসক্রিপশনে। উচ্চমূল্যে মিটার, সিস্টেম, ডেটা সেন্টার, এমনকি মিটারপ্রতি ওরাকল লাইসেন্স কেনা হয় অকুলিন থেকে। তিনটি প্যাকেজেই কাজ পায় মিটার কোম্পানি শেনঝেন স্টার ও ওয়াশিয়ন। এরপরের প্যাকেজগুলোতে পূর্বশর্ত দেওয়া হয়ে থাকে, নেসকোর সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্ত হতে হবে। আদতে সে সিস্টেম কার্যকরই হয়নি। অকুলিনের সরবরাহ করা মিটার ডেটা ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারে আজ অবধি একটি মিটারও অনলাইন হয়নি। তারা না পেরে বেঙ্গালুরু ভিত্তিক একটি কোম্পানিকে সিস্টেম চালানোর কাজ দেয়। তাতেও কোনো কাজ হয়নি। দুই মিটার কোম্পানির দুই সিস্টেমে বর্তমানে মিটারগুলো চলছে। এসকিউ ও অকুলিন টেকের ছায়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া আর কোনো প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করতে পারেনি বা কাজ পায়নি। গ্রাহকরা অভিযোগ করে আসছেন, তাদের সরবরাহ করা মিটারে বিল বেশি আসে। মিটারগুলো স্মার্ট নয়। প্রায় হাজার কোটি বা তারও বেশি টাকা ব্যয়ের পরও কার্যত কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। নথিপত্র পর্যালোচনা করলেই চরম অনিয়মের বিষয়টি প্রমাণ পাওয়া যাবে।
বিউবো এএমআই প্রকল্প
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) এএমআই প্রকল্পটিও অকুলিন বিডি হাতিয়ে নিতে সব আয়োজন শেষ করে। তবে সরকার পরিবর্তনের পর বিউবো প্রকল্পটি বাতিল করে বলে জানান কর্মকর্তারা।
ডেসকো এএমআই প্রকল্প ডেসকোতে এএমআই প্রকল্প করা হয় অকুলিনের জন্য। সেই সঙ্গে এমআইসি আপগ্রেডেশনের প্রকল্প দেওয়া হয় অকুলিনকে। অকুলিন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছে শেনঝেন স্টার ও এসকিউ গ্রুপের ওয়াশিয়ন নামের দুটি কোম্পানি। স্মার্ট প্রিপেইড মিটার কেনার প্রকল্পগুলো তাদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে বণ্টন হয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কর্মকর্তা। সেনজেন স্টারের বাংলাদেশের স্থানীয় প্রতিনিধি (এজেন্ট) পলাতক প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা নসরুল হামিদের স্ত্রীর ভাই মাহবুব রহমান ওরফে তরুণ।
বিদ্যুৎ খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য মিটার কেনা ও অনিয়মের বিষয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আত্মগোপনে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে ফোন করে ও ম্যাসেজ দিয়েও জবাব পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ইতিপূর্বে আমার দেশকে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেছেন, অতীতে প্রিপেইড মিটার ক্রয় নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন অভিযোগের কারণে প্রিপেইড মিটার প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকও একপর্যায়ে অর্থায়নও বন্ধ করে দিয়েছিল। এসব কারণে আমরা উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সব ধরনের কেনাকাটার সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম।
অকুলিন টেক বিডির বক্তব্য
অকুলিন টেক বিডি লিমিটেডের এক্সিকিউটিভি ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. হাছান ইমাম বলেন, ‘আরইবির যে কাজ আমরা পেয়েছি, সেটিতে কোনো অনিয়ম হয়নি। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই আমরা দরপত্রে কোয়ালিফায়েড হয়ে কার্যাদেশ পেয়েছি। এরপরও এ বিষয়ে বেশকিছু অভিযোগ ওঠে। আরইবি ও সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠান তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পায়নি। ফলে আমাদের আবার কাজ করার সুযোগ দেয়। বর্তমানে আমাদের কাজের প্রায় ৯০ ভাগ শেষ হয়েছে।’ সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজের বিষয়েও সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। মূলত প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে কারিগরি ও আইটি সাপোর্ট দেওয়াই তাদের দায়িত্ব। এর বাইরে তাদের কোনো কাজ নেই বলেও জানান তিনি।