হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

ঈদের আগে শ্রমিক অসন্তোষের শঙ্কা

বেতন-বোনাস সংকটে ৩০০ শিল্পকারখানা

ওয়াসিম সিদ্দিকী

ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক (আরএমজি) ও নন-আরএমজি খাতের প্রায় ৩০০টি কারখানায় বেতন ও ঈদ বোনাস পরিশোধে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের পর্যবেক্ষণে গাজীপুর, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্প বেল্টকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

শিল্পাঞ্চলের ‘হটস্পট’

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, সম্ভাব্য শ্রমিক অসন্তোষের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কয়েকটি শিল্পঘন এলাকা চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে গাজীপুরে অন্তত ৬০টি এবং সাভার-আশুলিয়া এলাকায় প্রায় ৩০টি কারখানা ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায় রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রায় ২০টি কারখানায় বকেয়া বেতন ও বোনাস নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরসহ অন্যান্য শিল্প এলাকাতেও ঈদের আগে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বেতন-বোনাস ঘিরে শ্রমিকদের অসন্তোষ সৃষ্টি হলে তা দ্রুত সড়ক অবরোধ, কর্মবিরতি কিংবা কারখানায় ভাঙচুরের মতো পরিস্থিতিতে রূপ নিতে পারে। তাই ঈদকে সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শ্রম মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।

কেন এই অস্থিরতা?

শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে তৈরি করা নানা ধরনের নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার প্রভাবের ধারাবাহিকতায় দেশের শিল্প খাত দীর্ঘদিন ধরে চাপের মধ্যে রয়েছে। এরই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বিভিন্ন কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষ দেখা দেয় এবং বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। বর্তমানে দেশে ১০ হাজারের বেশি কারখানার মধ্যে প্রায় তিন হাজার তৈরি পোশাক (আরএমজি) এবং প্রায় সাত হাজার নন-আরএমজি কারখানা চালু থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই খাতে অর্ধকোটিরও বেশি শ্রমিক কাজ করছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেখ হাসিনার সময়ের অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি; যদিও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে লুটপাটকারী আওয়ামী সুবিধাভোগী অনেক কারখানার মালিক বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন। শত শত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বিদেশে টাকা পাচার করে বিদেশে বিলাসী জীবন কাটানো আওয়ামী দোসর সেসব কারখানা মালিকরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও ধুঁকতে থাকা তাদের কারখানাগুলোর শ্রমিকরা রয়েছেন অনটনের মধ্যে। ওই কারখানার শ্রমিকদের বেতন নিয়মিত দিতে না পারা, আন্তর্জাতিক বাজারে ওয়ার্ক অর্ডার বা ক্রয়াদেশ কমে যাওয়া, কাঁচামালের তীব্র সংকট এবং এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) জটিলতার কারণে কারখানা মালিকদের একটি অংশ আর্থিক দেউলিয়া হওয়ার পথে। পাশাপাশি কিছু ক্ষেত্রে মালিকপক্ষের ব্যাংক ঋণ প্রাপ্তিতে জটিলতা ও অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত প্রায় ১৯ মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৩৭৩টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ২৯৯টি তৈরি পোশাক কারখানা। অঞ্চলভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে গাজীপুর ও চট্টগ্রামে। বন্ধ হওয়া কারখানাগুলোর মধ্যে গাজীপুরে ১৩৪টি, চট্টগ্রামে ১১৩টি, আশুলিয়ায় ৬৮টি, নারায়ণগঞ্জে ৪৭টি, খুলনায় ৫টি, ময়মনসিংহে ২টি রয়েছে তালিকায়। এই কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার ফলে এক লাখ ৭৩ হাজার ৩৭৪ শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শুধু তৈরি পোশাক খাতেই বেকার হয়েছেন এক লাখ ৩৮ হাজার ৯৫৬ শ্রমিক। এই বিশাল সংখ্যক কর্মহারা মানুষের ক্ষোভ আর সচল কারখানার শ্রমিকদের বকেয়ার দাবি মিলেমিশে এক বিস্ফোরক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

শ্রম অসন্তোষের চিত্র

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত শিল্পাঞ্চলে প্রায় দুই হাজার ৭৩৯টি শ্রম অসন্তোষের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৫২১টি সড়ক বা মহাসড়ক অবরোধ, দুই হাজার ৪২টি কর্মবিরতি এবং ১১১টি কারখানায় ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।

চলতি বছরের ১ মার্চ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, জানুয়ারি মাসের বেতন এখনো পরিশোধ করেনি ৭৪৭টি কারখানা, এর মধ্যে ৩৫৭টি আরএমজি এবং ৩৯০টি নন-আরএমজি। এছাড়া গত বছরের ডিসেম্বর ও তার আগের মাসের বকেয়া রয়েছে আরো ১৪৯টি কারখানায়। এই বকেয়ার বোঝা মাথায় নিয়ে শ্রমিকরা ঈদ বোনাস ও মার্চ মাসের বেতন দাবি করছেন, যা মালিকদের জন্য গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গতবারের তিক্ত অভিজ্ঞতা

গত বছরের ঈদুল ফিতরেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। সে সময় প্রায় ২৮৭টি কারখানা বোনাস দিতে ব্যর্থ হয় এবং এক হাজার ৪৮০টি কারখানা মার্চ মাসের বেতন সময়মতো দিতে পারেনি। এর জেরে বেতন-বোনাস ও ছুটি ঘিরে ৯৫টি বড় ধরনের অসন্তোষ সৃষ্টি হয়, যার মধ্যে ৫৮ বার সড়ক অবরোধ এবং ১১টি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা করছে গোয়েন্দা সংস্থা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ ও খাত সংশ্লিষ্টরা।

আইন যা বলছে

বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, শ্রমিকদের মাসিক বেতন পরবর্তী মাসের সাত কর্মদিবসের মধ্যে পরিশোধ করতে হয়। এছাড়া এক বছরের বেশি সময় কর্মরত শ্রমিকদের জন্য অন্তত একটি মূল বেতনের সমপরিমাণ উৎসব বোনাস দেওয়ার বিধান রয়েছে।

এ বছর ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ ২০ বা ২১ মার্চ। সে হিসাবে ত্রিপক্ষীয় পরামর্শ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০ রমজানের মধ্যে বেতন ও বোনাস পরিশোধের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। তবে অর্ডার না থাকার অজুহাতে অনেক মালিকপক্ষ সেই সিদ্ধান্ত মানতে গড়িমসি করছে।

ষড়যন্ত্র ও উসকানির শঙ্কা

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেতন-বোনাস নিয়ে শ্রমিকদের এই যৌক্তিক দাবিকে পুঁজি করে কিছু ‘সুযোগসন্ধানী’ শ্রমিক সংগঠন ও স্বার্থান্বেষী মহল পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলতে পারে। বিশেষ করে আওয়ামী ও বামপন্থি সংশ্লিষ্ট শ্রমিক নেতারা উসকানি দিয়ে কারখানা ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও মহাসড়ক অবরোধের মাধ্যমে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করার একটি সুগভীর ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছে না প্রশাসন। এই সুযোগে চুরি ও ডাকাতির হাত থেকে কারখানা রক্ষা করতে সিসি ক্যামেরা ও নিজস্ব সিকিউরিটি জোরদার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াত সংশ্লিষ্ট শ্রমিক সংগঠনগুলোর নেতাদের কাছে পরিস্থিতি উত্তরণে সহায়তা ও পরামর্শ চাওয়া হয়েছে।

সংকট উত্তরণে ১০ দফা সুপারিশ

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা ও বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—বকেয়া বেতন দ্রুত পরিশোধ নিশ্চিত করা, সংকটাপন্ন কারখানাগুলোকে বেতন-বোনাস পরিশোধের শর্তে স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণ দেওয়া, উসকানিদাতাদের চিহ্নিত করে শাহবাগ, প্রেস ক্লাব, শ্রম ভবন ও গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোয় নজরদারি জোরদার করা, মালিক, শ্রমিক ও সরকারের সমন্বয়ে ‘ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট’ মিটিংয়ের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান করা, শিল্পাঞ্চলে পুলিশি টহল ও অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা, ঈদের আগে শ্রমিক ছাঁটাই নিরুৎসাহিত করা, অর্ডার বাতিল বা কমার অজুহাতে বেতন আটকে রাখার প্রবণতা বন্ধে মনিটরিং করা, বেতন না দিয়ে মালিকদের কারখানা বন্ধ করে পালিয়ে যাওয়া ঠেকানো, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন রাখা এবং উৎসবের দিনে কাজ করালে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা ও বিকল্প ছুটি নিশ্চিত করা।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে পরিচিত তৈরি পোশাক শিল্পসহ সব ধরনের কারখানার শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা জরুরি। শিল্পাঞ্চলে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক নেতাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিল্পাঞ্চলকে শান্ত রাখতে সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে।

নতুন সরকারের আমলেও পুরোনো চেহারায় শেয়ারবাজার

জ্বালানি নিয়ে সারা দেশে তুলকালাম, হাহাকার

নতুন নামে ফেনসিডিল ঢোকাচ্ছে ভারতীয় মাদক কারবারিরা

ছুটির দিনে ক্রেতামুখর মার্কেট, শপিংমল

দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ইরান

জ্বালানি তেল সংকটের আতঙ্কে পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন

ইরান ধ্বংসের পর ট্রাম্পের নিশানায় কিউবা

স্পিকার পদে আলোচনায় মঈন খান, ডেপুটিতে পার্থ

আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে নারী নির্যাতন

ড. ইউনূসের বিদায়ে স্বস্তিতে দিল্লি