হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

বালাম বই নিয়ে উধাও আওয়ামীপন্থি কাজিরা, ভোগান্তি সেবাপ্রার্থীদের

গাজী শাহনেওয়াজ

আমার দেশ গ্রাফিক্স

বিয়ে ও তালাক নিবন্ধনের গুরুত্বপূর্ণ নথি ‘বালাম বই’ নিয়ে উধাও হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাজিরা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আত্মগোপনে যাওয়া কয়েকজন কাজির বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী ও নতুন দায়িত্বপ্রাপ্ত কাজিরা। তাদের এমন কর্মকাণ্ডে বিয়ে বা তালাকের সনদের কপি তুলতে গিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ। আইন মন্ত্রণালয় বলছে, বালাম বই নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ফৌজদারি অপরাধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মগবাজার ও টাঙ্গাইল সদরসহ দেশের বিভিন্ন কাজি অফিসে পুরোনো বালাম বই পাওয়া যাচ্ছে না। ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনে বিগত সরকারের প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন কাজি আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর এ সংকট আরো প্রকট হয়েছে। নতুন দায়িত্ব পাওয়া বা ভারপ্রাপ্ত কাজিরা পুরোনো নথি খুঁজতে গিয়ে সংশ্লিষ্ট বছরের বালাম বই পাচ্ছেন না। ফলে বিয়ে বা তালাকের সার্টিফায়েড কপি, কাবিননামা কিংবা বিদেশে ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় ইংরেজি কপি দিতে পারছেন না তারা।

আইন মন্ত্রণালয় বলছে, এ ধরনের ঘটনা তাদের কাছে নতুন। বালাম বই নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ফৌজদারি অপরাধ। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিবন্ধন অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানান, নিকাহনামার বইয়ে কাটাছেঁড়া, তথ্য গোপন বা অনিয়মের অভিযোগ তারা মাঝেমধ্যে পেয়ে থাকেন। তবে বালাম বই নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ খুবই অস্বাভাবিক।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ৫,৫৭৮টি নিবন্ধিত কাজির পদ রয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৫০০টি পদ শূন্য। ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত বহু কাজি আত্মগোপনে চলে যান। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর ঢাকার কলাবাগান, খিলগাঁও ও নোয়াখালীর সেনবাগসহ মাত্র চারটি স্থানে নতুন কাজি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

দায়িত্ব হস্তান্তরে জবাবদিহি

নিকাহ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব হস্তান্তরসংক্রান্ত আইনের ১৬ ধারায় রেকর্ডপত্রের নিরাপত্তা ও যথার্থতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। দায়িত্ব হস্তান্তরের সময় সংশ্লিষ্ট দুপক্ষকে যৌথভাবে প্রত্যয়নপত্র প্রস্তুত করে রেজিস্ট্রার বা সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে পাঠানোর বিধান রয়েছে। পরে রেজিস্ট্রার বা সাব-রেজিস্ট্রার তা সরকারের কাছে পাঠাবেন।

আইনের ৩৯ ধারায় নিকাহ রেজিস্ট্রারকে সংশ্লিষ্ট জেলা রেজিস্ট্রারের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে দায়িত্ব পালনের কথা বলা হয়েছে। আর ১১ ধারায় অসদাচরণ, বিধান লঙ্ঘন ও তথ্যের মিথ্যা বর্ণনাসহ বিভিন্ন বিষয়কে নৈতিক স্খলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের জেলা রেজিস্ট্রার রমজান খান আমার দেশকে বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের সুপারিশের ভিত্তিতে কাজি নিয়োগ দেওয়া হয়। তবে বালাম বইসহ গুরুত্বপূর্ণ নথি কাজিদের কাছেই সংরক্ষিত থাকে। তার মতে, আগের বছরের বালাম বই নতুন বছর শুরুর আগেই জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয়ে জমা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে এ ধরনের ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। এতে কাজিদের জবাবদিহিও বাড়ত।

দেশের কাজি অফিসগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও দেখভালের দায়িত্ব আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বিচার বিভাগের। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারাও কাজিদের কার্যক্রমে বিভিন্ন অনিয়মের কথা জানান। শাখাটির একজন কর্মকর্তা সিলেট অঞ্চলের একটি ঘটনার উদাহরণ দেন, যেখানে এক নারী দাবি করেন, তার স্বামী জীবিত অবস্থায় তাকে তালাক দেননি। কিন্তু স্বামীর মৃত্যুর পর তার পরিবারের সদস্যরা কাজি অফিসের সঙ্গে যোগসাজশ করে স্বামীর মৃত্যুর আগে স্ত্রীকে তালাক দিয়েছেনÑএমন একটি তালাকনামা হাজির করেন। ওই নারী বিষয়টি নিয়ে কাজি অফিসে আবেদন করেন।

পরে সংশ্লিষ্ট এলাকার সাব-রেজিস্ট্রারের তদন্ত প্রতিবেদনে পোস্ট অফিসের মাধ্যমে তালাকসংক্রান্ত কোনো চিঠি আদান-প্রদান হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি পর্যালোচনা করে কয়েকটি আইনের ব্যাখ্যাসহ জেলা রেজিস্ট্রারের মাধ্যমে পুনঃতদন্তের নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সংশ্লিষ্ট কাজি নিজেই ওই নারীর স্বামীর পরিবারের বিরুদ্ধে তাকে ফাঁসিয়ে এ কাজ করানোর অভিযোগে মামলা করেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে।

কাজিদের দেখভালের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিনিয়র সহকারী সচিব আবদুল ওয়াহাবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। আমার দেশকে তিনি বলেন, কোনো তথ্য অফিসিয়ালি জানাতে হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে।

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের সচিব লিয়াকত আলী মোল্লা আমার দেশকে বলেন, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তার দপ্তরে আসেনি। তবে বিষয়টিতে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি বলেন, বালাম বই নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ফৌজদারি অপরাধ। সংশ্লিষ্ট অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।

নিবন্ধন অফিসের আইআরও ও সদ্য বিদায়ী ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার মুনশী মোকলেছুর রহমান আমার দেশকে বলেন, দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এ ধরনের কোনো অভিযোগ পাননি। তবে মগবাজার কাজি অফিসে (৩৫ নম্বর ওয়ার্ড) নিকাহনামার কপি নিতে প্রতিনিয়ত ভুক্তভোগীদের ভিড় বাড়ছে। ইতিমধ্যে তিনজন ভুক্তভোগীর অভিযোগসংক্রান্ত আবেদন এ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন কামরুল রহমান, মাসুদুর রহমান ও জাহেদা হোসেন।

মাসুদুর রহমান আমার দেশকে জানান, ২০১৬ সালের ১০ জুন তার স্বজনের বিয়ে নিবন্ধিত হয়। বিদেশে ব্যবহারের জন্য কাবিননামার ইংরেজি কপি তুলতে গিয়ে জানতে পারেন, তৎকালীন যুবলীগ নেতা ও নিয়োগপ্রাপ্ত কাজি পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনটি বালাম বই (প্রতিটিতে ১০০ পাতা) সঙ্গে নিয়ে গেছেন।

আরেক ভুক্তভোগী কামরুল রহমান আমার দেশকে জানান, ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটির ১৯ নম্বর ওয়ার্ডে সম্পাদিত একটি দলিলের সার্টিফায়েড কপির জন্য গত ২৩ জুলাই আবেদন করলেও বালাম বই না থাকায় বর্তমান কাজি তা সরবরাহ করতে পারছেন না। একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানান জাহেদা হোসেন। তিনি বলেন, তার মেয়ের বিবাহের কাবিননামা তুলতে গিয়ে শোনেন বালাম বই নিয়ে কাজি উধাও।

মগবাজার কাজি অফিসের মাওলানা সেলিম রেজা এ বিষয়ে আমার দেশকে বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাবেক কাজি সাগর আহমেদ শাহীন পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি অনেকগুলো বালাম বই সঙ্গে নিয়ে যান। নিখোঁজ বালাম বইগুলোর কোনো তালিকা নতুন দায়িত্বপ্রাপ্তদের দেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিদিন সেবাগ্রহীতারা বিয়ে বা তালাকের সনদের জন্য এলে তল্লাশি চালিয়ে বোঝা যাচ্ছে, কোনো কোনো বালাম বই নেই।

তিনি আরো বলেন, অনেক বালাম বইয়ে গুরুতর জালিয়াতি দেখা গেছে। কোথাও একটি পৃষ্ঠা কেটে অন্য পৃষ্ঠা লাগানো হয়েছে। আবার কোথাও তালাকের ক্ষেত্রে শুধু স্বাক্ষর নিয়ে রাখা হয়েছে, কিন্তু বিস্তারিত তথ্য রেজিস্ট্রি করা হয়নি। ফলে অসম্পূর্ণ বা অর্ধসংরক্ষিত তথ্যের ভিত্তিতে কাউকে নিকাহ বা তালাকের সনদ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তবে সাবেক কাজি সাগর আহমেদ শাহীন বালাম বই নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। আমার দেশকে তিনি বলেন, কোনো বালাম বই তিনি নিয়ে যাননি। সব বই কার্যালয়েই রেখে এসেছেন। তাকে হেয় করার উদ্দেশে এসব অভিযোগ করা হচ্ছে।

তিনি লালবাগ থানা ছাত্রলীগের সভাপতি ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জানিয়ে বলেন, রাজনৈতিক কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তবে বালাম বই নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি কোনো অপরাধ করেননি, চাকরিসংক্রান্ত বিষয়টি বর্তমানে হাইকোর্টে বিচারাধীন বলেও জানান। তিনি দাবি করেন, বর্তমান আইনমন্ত্রীকে টাকা দিয়ে তাকে হয়রানি করা হচ্ছে।

এদিকে বালাম বই গায়েব ও নথিতে অনিয়মের কারণে ভোগান্তিতে পড়া সাধারণ মানুষ এ সমস্যার একটি স্থায়ী প্রশাসনিক সমাধান দাবি জানান। তাদের প্রত্যাশা, নিখোঁজ বালাম বই উদ্ধার, নথির নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে নিকাহ রেজিস্ট্রারদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।

ভারতজুড়ে বোমা হামলার হুমকি, আতঙ্কে নয়াদিল্লি

সাপের কামড়ে মৃত্যু, ঝাড়ফুঁকে জীবিত করার চেষ্টা

পোল্যান্ডে বাংলাদেশিদের সামাজিকমাধ্যম ব্যবহারে জরুরি নির্দেশনা

প্রধানমন্ত্রীর জনকল্যাণমূলক কা‌জকে স্বাগত জা‌নি‌য়ে ছাত্রদলের শোভাযাত্রা

নতুন আয়ের ব্যবস্থা আনছে এক্স

নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতালের ৫০০ শয্যার নতুন ভবন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলায় নিহত ৫

নালা খুঁড়তে গিয়ে স্বর্ণের ভান্ডার পেলেন শিক্ষার্থী

দুর্গাপুরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র সব সময়ই থাকে তালাবদ্ধ

হরমুজ নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে: আরাগচি