হোম > আমার দেশ স্পেশাল > বিশেষ প্রতিবেদন

আওয়ামী আমলের পুরোনো পোশাকে ফিরতে চায় পুলিশ

ওয়াসিম সিদ্দিকী

আওয়ামী লীগ শাসনামলের পোশাকে ফিরতে চায় পুলিশ। বাহিনীর ৯০ ভাগেরও বেশি সদস্য ওই পোশাকের পক্ষে তাদের মতামত জানিয়েছেন বলে দাবি করছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। সব ইউনিটের মতামত নিয়ে ইতোমধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। তবে মন্ত্রণালয় এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত দেয়নি। এ অবস্থায় বাংলাদেশ পুলিশের পোশাক বা ইউনিফর্ম নিয়ে আলোচনা এসে দাঁড়িয়েছে অচলাবস্থায়। পুলিশ আওয়ামী আমলের পোশাকে ফিরে যাবে, নাকি সম্পূর্ণ নতুন রঙ ও ডিজাইনের ইউনিফর্ম চালু হবে—এই প্রশ্নের স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে পাওয়া যায়নি। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

নতুন সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তী আমলের পোশাকের পরিবর্তন চেয়ে বিবৃতি দেয় পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এই পুলিশ বাহিনীর সদস্যরাই আওয়ামী আমলের পোশাক পরিবর্তনে মতামত দিয়েছিলেন। তবে ড. ইউনূস সরকারের সময়কার পোশাকের রঙ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা ছিল। কিন্তু আবার সেই পোশাকেই কেন ফিরে যেতে চায় বাহিনী, সে বিষয়ে অত্যন্ত সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নিতে চান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বাহিনীর সদস্যদের মনোভাব পরিবর্তনের কারণও ভাবাচ্ছে সংশ্লিষ্ট অনেক দায়িত্বশীলকে। তবে নতুন সরকার গঠনের পর বাহিনীর সদস্যদের দাবির প্রেক্ষাপটে নতুন করে পোশাক পরিবর্তনের সেই দাবিকে আমলে নেয় পুলিশ সদর দপ্তর। বাহিনীর সব ইউনিট থেকে পাওয়া মতামত থেকে জানা যাচ্ছে, ৯০ ভাগেরও বেশি পুলিশ সদস্য আগের সেই পোশাকে (আওয়ামী আমলের পোশাক) ফিরতে চান।

মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের সূত্র বলছে, আগের পোশাকে ফিরে গেলে জুলাই অভ্যুত্থানের রক্তের দাগ লেগে রয়েছে অভিযোগ তুলে সমালোচনা হতে পারে বলে সরকার ও মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। এই পোশাককে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে সরকারের বিপক্ষে যেন কোনো কার্ড না খেলা যায়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানা গেছে। অর্থাৎ পোশাক নিয়ে এক ধরনের সিদ্ধান্তহীনতা রয়েছে। পোশাকের রঙ ও ডিজাইন যাতে সর্বাধুনিক হয়, সে বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে বিবেচনায় রয়েছে। পাশাপাশি আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য এবং আরামদায়ক কাপড় ব্যবহারের বিষয়টি সরকার ও মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারক পর্যায়ে বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

পরিবর্তনের সূচনা ও বিতর্কের বিস্তার

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলো পুলিশ বাহিনীর ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করে। সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অসংখ্য ছবি ও ভিডিওতে পুলিশের ইউনিফর্ম পরিহিত সদস্যদের উপস্থিতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ওই সময়ের দৃশ্যগুলো ভাইরাল হওয়ার পর ইউনিফর্মটি এক ধরনের প্রতীকী অর্থ পেয়ে যায়—যা অনেকের কাছে অস্বস্তিকর স্মৃতির প্রতিনিধিত্ব করে।

এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইউনিফর্ম পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। লক্ষ্য ছিল—পুরোনো বিতর্ক থেকে বেরিয়ে নতুন পরিচয়ে পুলিশের ভাবমূর্তি পুনর্গঠন করা। কিন্তু সেই পরিবর্তন বেশিদিন টেকেনি। নতুন রঙ ও ডিজাইন নিয়ে শুরু থেকেই সমালোচনা তৈরি হয়, বিশেষ করে মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ইউনিফর্ম পরিবর্তন করা হলেও বছর না ঘুরতেই এটি আবার পরিবর্তনের দাবি উঠেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি সরকার গঠনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পরিবর্তন করা পোশাক আবার পরিবর্তনের দাবি ওঠে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ইউনিফর্মের রঙ, কাপড়ের গুণগত মান, ডিজাইন ও ব্যবহারিক সুবিধা— সব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা চলছে। গত এক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বারের মতো পোশাক বদলানোর এই তোড়জোড়ে বাহিনীটির সদস্যদের মধ্যে কৌতূহল ও অস্বস্তিÑউভয়ই বিরাজ করছে।

পুরোনো পোশাকেই আস্থা ৯০ ভাগের

পুলিশ সদর দপ্তর দেশের সব ইউনিট থেকে মতামত সংগ্রহ করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এই মতামতে বিস্ময়কর চিত্র উঠে এসেছে। বাহিনীর ৯০ শতাংশের বেশি সদস্য জানিয়েছেন, তারা জুলাই-পূর্ববর্তী অর্থাৎ নীল-জলপাই মিশ্রিত সাবেক পোশাকেই ফিরে যেতে চান। তাদের যুক্তি হলোÑপুরোনো পোশাকেই পুলিশকে সাধারণ মানুষ চেনে এবং বাহিনীর সদস্যদের মধ্যেও এতে এক ধরনের পেশাদার আভিজাত্য কাজ করে। অন্তর্বর্তী আমলে প্রবর্তিত পোশাকের রঙ নিয়ে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের ‘হীনম্মন্যতা’ তৈরি হয়েছিল, যা তাদের মনোবল কমিয়ে দিয়েছিল। তাছাড়া আগের পোশাকের কাপড়ের মান ও ডিজাইনের সঙ্গে সদস্যরা দীর্ঘকাল অভ্যস্ত ছিলেন। তবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাবনা ভিন্ন।

উচ্চপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, পুরোনো পোশাকে ফিরে গেলে জুলাই অভ্যুত্থানের সেই স্মৃতি ও ‘রক্তের দাগ’ নতুন করে আলোচনায় আসতে পারে। বিরোধীপক্ষ এটিকে ইস্যু করে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার সুযোগ নিতে পারে—এই আশঙ্কা থেকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে বিলম্ব করছে মন্ত্রণালয়।

আধুনিকায়ন বনাম ঐতিহ্য

বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে। মূলত চারটি বিষয় মাথায় রেখে নতুন রূপরেখা সাজানো হচ্ছে। এগুলো হলোÑ রঙ হালকা ছাই (Light Grey), নেভি ব্লু (Navy Blue) অথবা পুরোনো শেডের আধুনিক সংস্করণ। কাপড়ের মান রিপস্টপ (Ripstop) ফেব্রিক, যা টেকসই এবং গরম আবহাওয়ায় ঘাম শোষণে সক্ষম। কৌশলগত সুবিধা বডি ক্যামেরা মাউন্ট করার হুক এবং আধুনিক সমর সরঞ্জাম রাখার পকেট। নিরাপত্তা ব্যাজ কিউআর কোড সংবলিত নেমপ্লেট, যাতে ভুয়া পুলিশ শনাক্ত করা সহজ হয়।

ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে পুলিশের পোশাক নিয়ে সাধারণ মানুষের কৌতূহল আকাশচুম্বী। ইউটিউবের বিভিন্ন বিশ্লেষণী ভিডিওতে প্রস্তাবিত পোশাকের ডামি বা নমুনা দেখিয়ে জনমত যাচাই করা হচ্ছে। সেখানে সাধারণ নাগরিকদের মন্তব্য মিশ্র। কেউ কেউ বলছেন, ‘পোশাকের চেয়ে পুলিশের ব্যবহার পরিবর্তন বেশি জরুরি।’

অনেকে মনে করছেন, পুলিশের পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিজিটাল আইডেন্টিফিকেশন জরুরি, যাতে পোশাক পরে কেউ নাশকতা করতে না পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের পর রাজপথে নাশকতা ও ছদ্মবেশে অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে। পুলিশের পোশাকের ব্যাপারে সিদ্ধান্তহীনতার সুযোগ নিয়ে দুষ্কৃতকারীরা পুরোনো ইউনিফর্ম ব্যবহার করে স্পর্শকাতর এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে—এমন শঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছে না প্রশাসন।

ঢাকা ও বিভিন্ন মেট্রোপলিটন এলাকায় পুলিশ সদস্যদের ভাষ্যমতে, তারা এখন এক ধরনের পরিচয় সংকটে ভুগছেন। রাজপথে মানুষ তাদের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকায়।

মন্ত্রণালয় আধুনিক পুলিশ বাহিনীর পোশাক নিয়ে পর্যালোচনা করছে। পাশাপাশি বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে আরামদায়ক কাপড় খুঁজছে। সরকারের ইচ্ছা এমন একটি ইউনিফর্ম দেওয়া যা ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার সেতু তৈরি করবে। কিন্তু কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতের ছাপ থাকবে না বলে জানা গেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে বলেন, মন্ত্রণালয় পোশাকের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে। পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

জামায়াত ও কওমি দ্বন্দ্বের সিলসিলা

দিল্লির ‘আতিথেয়তায়’ দিল মজেছে হাসিনার, ছাড়তে নারাজ ভারত

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালিতে অচলাবস্থা

আবু সাঈদ ভেবেছিলেন সামনে মানুষ, তবে ‘তারা ছিল অমানুষ’

ডিআরআরও এবং পিআইওদের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি

হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আওয়ামী সিন্ডিকেটের হাতে

মার্কিন টার্গেটে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র রেল সেতু

শীর্ষ ২০ খেলাপি কোম্পানির ১১টিই এস আলমের

বাংলাদেশকে জ্বালানি ও প্রযুক্তি খাতে সহযোগিতায় প্রস্তুত ইরান

ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার