ভালো কাজের প্রলোভনে রাশিয়ায় গিয়ে নির্মাণ কোম্পানির বদলে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে তিন হাজার ডলার করে বিক্রি করা হয়েছে ৩০ বাংলাদেশি যুবককে। বাঁচার আকুতি জানানো সত্ত্বেও সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাসের চরম উদাসীনতা ও দায়সারা আশ্বাসের বলি হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে নিখোঁজ রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্তত ১৫ বাংলাদেশি তরুণ। এছাড়া অন্তত চার-পাঁচজন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এ অবস্থায় চরম উৎকণ্ঠা আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে ভুক্তভোগীদের পরিবারের।
পরিবারের দাবি, নির্মাণ কোম্পানির কাজের ভিসা থাকলেও রাশিয়া পৌঁছানোর পর তাদের একটি ড্রোন কোম্পানিতে পাঠানো হয়। এরপর সেখান থেকে তাদের ইউক্রেনে যুদ্ধের জন্য রাশিয়ান সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করা হয়। যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণে পাঠানো হবে এমন শঙ্কা টের পেলে ভুক্তভোগী তরুণরা সঙ্গে সঙ্গে পরিবারকে বিষয়টি জানিয়ে বলে, ফোন কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আর যোগাযোগ নাও হতে পারে। তারা যেন দ্রুত একটা ব্যবস্থা করে।
এরই পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি অবহিত করে ভুক্তভোগীদের পরিবার। মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক রাশিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাসে যোগাযোগ করলে দূতাবাস জানায়, কোম্পানির সঙ্গে তাদের যোগাযোগ হয়েছে, তাদের যুদ্ধে নেওয়া হবে না। ড্রোন কোম্পানির প্রশিক্ষণ শেষে তাদের আবার কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনা হবে।
এদিকে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো দূতাবাসের প্রতিবেদনে রাশিয়ান কোম্পানির সাফাই গেয়ে বলা হয়, ভুক্তভোগীদের বলা এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট কোম্পানির তথ্যের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধে নেওয়ার সত্যতা পেলে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দূতাবাসে একাধিক চিঠি চালাচালি হয়। কিন্তু নিখোঁজদের সন্ধান ও মিথ্যা আশ্বাসের সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম। এই ঘটনায় মন্ত্রণালয়ে তৈরি হয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘মন্ত্রণালয় যখন দূতাবাসকে অবগত করেছিল তখনই সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব দিলে এত বড় ঘটনা ঘটত না। এখন ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে উত্তর দেওয়ার মতো আমাদের কাছে কিছু নেই। কারণ, দূতাবাসের আশ্বাসে আমরা পরিবারগুলোকে বলেছি ‘তাদের যুদ্ধে নেবে না, নিরাপদে আছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রতারণার শিকার ওই যুবকদের উদ্ধারের দাবিতে গত ২৪ মে ইস্কাটনে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন পরিবারের সদস্যরা। এ সময় তারা জানান, ৩০ জনকে যুদ্ধে নেওয়ার জন্য প্রশিক্ষণে পাঠানো হচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করে যেন তাদের দেশে ফেরানো হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিস্তারিত জানার জন্য দূতাবাসে যোগাযোগ করা হয়।
আমার দেশ-এর কাছে আসা একাধিক ভিডিও ফুটেজ ও ছবিতে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে অন্তত ছয়জন রাশিয়ান আর্মির পোশাক পরিহিত। এদের মধ্যে গোপালগঞ্জের পলাশ শেখ, তিনি ড্রোন হামলায় আহত হয়ে ইউক্রেনে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত একটি এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। নারায়ণগঞ্জের আদনান হোসেন, ড্রোন হামলায় তার পেটের ভেতর স্পিন ঢুকে গেছে। চারটি অপারেশন হয়েছে। তিনিও হাসপাতালে আছেন। এরা সবাই ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধ করেছেন। ড্রোনের আঘাতে তাদের কেউ পঙ্গু হয়েছেন, আবার কাউকে হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা শেষে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া তাদের অনেকেই রয়েছেন নিখোঁজ।
তথ্যানুযায়ী, গত ৭ মে টিএস ওভারসিজ লি. (আরএল-১৭৫৫)-এর মাধ্যমে এলএলসি স্ট্রয়ট্রেস্ট নামক একটি কোম্পানিতে নির্মাণশ্রমিকের ভিসায় রাশিয়ায় যান ওই ৩০ বাংলাদেশি। কিন্তু রাশিয়া পৌঁছার পর তাদের সংশ্লিষ্ট কোম্পানিতে না পাঠিয়ে এলএলসি প্রো টেকনোলজি নামক একটি ড্রোন কোম্পানিতে পাঠানো হয়।
ভুক্তভোগী রিপন হোসেনের মা রিনা বেগম বলেন, নির্মাণকাজের ভিসা নিয়ে গত মে মাসের ৭ তারিখ রিপন ও তার বন্ধুসহ ৩০ জন রাশিয়ার উদ্দেশে রওনা হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর তিন-চারদিন কথা হয়েছে। এরপর আর কোনো কথা হয়নি। কারণ, এরপরই ওদের কাজের কথা বলে যুদ্ধের ট্রেনিংয়ে নিয়ে গেছে। এখন ওরা সবাই যুদ্ধে, কোনো যোগাযোগ নেই আমাদের সঙ্গে। অথচ আমরা সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রণালয়ে জানিয়েছিলাম, কিন্তু কোনো ফল পাইনি।
ইউক্রেনে রাশিয়া নিয়ন্ত্রিত এলাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পলাশ শেখ আমার দেশকে অডিও বার্তায় বলেন, আমাদের বেশির ভাগই নিখোঁজ। আমাদের সামনে অনেকে ড্রোন হামলার শিকার হয়েছে। আমি মে মাসের ২৮ তারিখে ড্রোন হামলায় আহত হই। এরপর প্রায় দুই সপ্তাহ আমাকে বাংকারে রাখে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমাকে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসে।
তিনি বলেন, আমি বাঁচতে চাই। সুস্থ হলে আমাকে আবার ক্যাম্পে নিয়ে যাবে। আমরা কেউ স্বেচ্ছায় যুদ্ধে আসেনি। আমরা কনস্ট্রাকশনের কাজে এসেছিলাম। কিন্তু এখানে আসার পর আমাদের সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে যুদ্ধের জন্য জোর করে স্বাক্ষর আদায় করা হয়। কাগজে কী লেখা আছে আমরা ভাষা বুঝি না। স্বাক্ষর দিতে রাজি না হওয়ায় অনেক টর্চার করেছে আমাদের।
ঝিনাইদহের রাজন এক ভিডিও বার্তায় বলেন, ড্রোন হামলায় আমার দুই পায়ের অবস্থা খুবই খারাপ। আমি এখন চিকিৎসাধীন আছি। একটু সুস্থ হলে আবার ফ্রন্টলাইনে যুদ্ধে নিয়ে যাবে। আমাদের বাঁচান। আমি আপনাদের কাছে প্রাণভিক্ষা চাচ্ছি।
ড্রোন হামলার পর নিখোঁজ ১৫ তরুণ
এদিকে ফ্রন্টলাইনের যুদ্ধে গিয়ে ড্রোন হামলার শিকার হয়ে নিখোঁজ ১৫ জনের পরিচয় পেয়েছে আমার দেশ। তাদের মধ্যে রয়েছেন—টাঙ্গাইল জেলার আমিনুল ইসলাম, পাসপোর্ট নম্বর এ১৪৮০৮৮১৭; শ্রী পবিত্র চন্দ, পাসপোর্ট নম্বর এ০৮২১০৯৫০; জামালপুর জেলার সাব্বির হোসাইন, পাসপোর্ট নম্বর এ০৭৬৫৯৮৪৬; গোপালপুরের নজরুল ইসলাম, পাসপোর্ট নম্বর এ১৮১২২৬৭৭; ভোলার কাজী রেজাউল করিম, পাসপোর্ট নম্বর এ১৭৫২৮৫৫৫; যশোরের মনিরামপুর উপজেলার তরিকুল ইসলাম মিন্টু, পাসপোর্ট নম্বর এ০০৮৭০০৭২; লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার মেহেদি হাসান, পাসপোর্ট নম্বর এ১৮১২২৬৭৮; নাজমুল আলম, পাসপোর্ট নম্বর এ১৮১২২৬৭৭; চাঁদপুরের ওয়াসিম আকরাম, পাসপোর্ট নম্বর এ১৮২৮১৯২৩; আরিফ হোসেন পাটোয়ারি, পাসপোর্ট নম্বর এ০২১২০৬৪২; ঢাকা জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার সোহেল, পাসপোর্ট নম্বর এ১৮৫২৫৪১৪; সাঈদ মোল্যা, পাসপোর্ট নম্বর এ০৫৬১৮৪১৬; জামালপুর জেলার আরিফ হোসেন, পাসপোর্ট নম্বর এ১৮৪৫৬৮১৬; মফিজ, পাসপোর্ট নম্বর এ১৯০০০৩১৯; নারায়ণগঞ্জ জেলার রবিন মিয়া, পাসপোর্ট নম্বর এ১৯৩৫১১০৯।
মস্কোর বাংলাদেশ রাষ্ট্রদূতের বক্তব্য
মো. নজরুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘বিভিন্ন অফিসিয়াল বৈঠকে বিষয়টি আমরা নিয়মিতভাবে তুলে যাচ্ছি। অতীতে আমরা কনস্যুলার এক্সেস চেয়েছি, রিসেন্টলিও আমরা কনস্যুলার এক্সেস চেয়ে আবেদন পুনর্ব্যক্ত করেছি। সরকারিভাবে কোনো বাংলাদেশি যাতে ইচ্ছা থাকলেও এই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে না পারে সেজন্য বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ দেশগুলোর তালিকাতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য অফিসিয়ালি আবেদন জানিয়েছি।’
অভিবাসন বিশেষজ্ঞের মত
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির আমার দেশকে বলেন, রাশিয়ার শ্রমবাজার অনেক ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে বাংলাদেশি শ্রমিক পাঠানো নিয়ে সরকারকে আরো ভাবতে হবে। কারণ, রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হয়ে ইউক্রেনে আমাদের অনেক তরুণ যুদ্ধ করছেন। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো গুরুত্ব দিতে হবে। অনেকে আবার টাকার জন্য স্বেচ্ছায় যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু ওই ৩০ জন যুবক যদি শুরুতে বাঁচার আকুতি জানিয়ে থাকেন তাহলে দূতাবাস কেন ফিরিয়ে আনতে পারল না? এতে তাদের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। ১৫ যুবক নিখোঁজের বিষয়টিতে অবশ্যই কারো না কারো গাফিলতি রয়েছে। এটি নিয়ে পররাষ্ট্র ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আলাদা তদন্ত করে দেখা জরুরি।
প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর আমার দেশকে বলেন, আমরা এ বিষয়টি খুবই গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। অভিযুক্ত তিন এজেন্সিকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। এছাড়া দূতাবাসকে বলা হয়েছে বিষয়টি নিয়ে সব সময় যেন খোঁজখবর রাখে এবং আমাদের রিপোর্ট করে। তবে এ ঘটনায় দূতাবাস কর্মকর্তা এবং মন্ত্রণালয়ের কারো গাফিলতি আছে কি না সে বিষয়েও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।