সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার চালানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইনি বাধা দূর করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ সংশোধনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে নির্বাচনি বিধিতেও সংশোধনী আনা হতে পারে। আজ অথবা আগামীকালের মধ্যেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে অন্তর্বর্তী সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র আমার দেশকে নিশ্চিত করেছে।
সম্প্রতি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না—এমন মর্মে নির্বাচন কমিশনের পাঠানো এক চিঠিকে কেন্দ্র করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়। তবে গণভোট নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে সরকার অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। সরকারের ধারণা, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে তারেক রহমানের আহ্বান সারা দেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত যখন গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জোরদার প্রচার চলছিল, ঠিক সেই সময় রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে পাঠানো নির্বাচন কমিশনের চিঠি সরকারকে বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গণভোট সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করতে পারলেও ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষে প্রচার চালাতে পারবেন না। চিঠির অনুলিপি মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে পাঠানো হয় এবং নির্দেশনা অমান্য করলে শাস্তির হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
চিঠির বিষয়টি জানার পর রাতেই প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও গণভোটবিষয়ক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। ওই নির্দেশনার ফলে তার জন্যও ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারের পথ বন্ধ হয়ে যায়। তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বার্তা দেন। বিষয়টির সমাধান না হলে পদ ছাড়ার ইঙ্গিতও দেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য গতকাল শনিবার অধ্যাপক আলী রীয়াজ যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে সরকারের আরো কয়েকজন উপদেষ্টা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রচারে আইনি বাধা, গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারা সংশোধনসহ প্রয়োজনীয় আইনি দিকগুলো পর্যালোচনা করা হয়। যমুনা সূত্রে জানা গেছে, উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক করে আইনের প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনা হবে। এটা আজকালের মধ্যেই হতে পারে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বর্তমান গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ অনুযায়ী যেসব কার্য অপরাধ বা আচরণবিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য, গণভোটের ক্ষেত্রেও সেগুলো প্রযোজ্য হবে। একই সঙ্গে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের ৮৬ ধারায় সরকারি কর্মচারীদের সরকারি পদমর্যাদা ব্যবহার করে নির্বাচনি ফল প্রভাবিত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারের সুযোগ দিতে হলে অধ্যাদেশ সংশোধন অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
এদিকে গণভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনের চিঠিতে অসন্তুষ্টির মধ্যে বিষয়টি নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বক্তব্য সরকারকে আশাবাদী করেছে। গত শুক্রবার রংপুরে নির্বাচনি জনসভায় তিনি ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি জুলাই সনদের সম্মানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। গত ২২ জানুয়ারি সিলেট থেকে নির্বাচনি প্রচার শুরুর ৯ দিনের মাথায় শুক্রবার স্পষ্টভাবে প্রথম গণভোটে হ্যাঁ-এর পক্ষে রায় চাইলেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
রংপুরের কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত জনসভায় তারেক রহমান বলেন, অধিকার ফেরানোর জন্য আবু সাঈদ নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন, চট্টগ্রামে ওয়াসিম নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। এ রকম হাজারো মানুষ যারা নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন মানুষের ভোটের অধিকার, কথা বলার অধিকার, অর্থনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাতে হলে আমরা যে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছি সেই জুলাই সনদকেও আমাদের সম্মান করতে হবে। সে জন্যই আপনাদের সবাইকে অনুরোধ করব, ১২ তারিখে ধানের শীষে যেমন সিলটা দেবেন একই সঙ্গে আপনাকে যে দ্বিতীয় ব্যালট পেপারটি দেবে ‘হ্যাঁ’ ও ‘না’-এর, সেখানে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে দয়া করে আপনারা রায় দেবেন।
তারেক রহমানের এই বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছেন সরকারের সড়ক পরিবহন ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। আমার দেশকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচারের আহ্বান জানিয়েছিল। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। আমরা তার বক্তব্যকে স্বাগত জানাই। আমরা মনে করি তার এই আহ্বান ভোটারদের মাঝে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
তিনি আরো বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রীয় সংস্কারের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সেই সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নের পথ আরো সুগম হবে।