মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম শ্রমবাজার ইরাকে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে নানা অনিয়ম ও কারসাজির প্রমাণ পাওয়া গেছে ইরাকস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) আমির আব্দুল্লাহ মো. মঞ্জুরুল করিমের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কর্মীর চাহিদাপত্র গোপনে ওভারসিজ অ্যামপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মে (ওইপি) পাঠানোর দুই ঘণ্টার মধ্যে তা বাতিল করেন তিনি। বিষয়টি সামনে আসার পর এখন নিজের কারসাজি ও অনিয়ম ঢাকতে সার্ভারের ‘নিখুঁত’ ভুলকে দায়ী করছেন এই লেবার কাউন্সেলর। সার্ভার ‘ইরর’ হওয়ার দোহাই দিয়ে দায়মুক্তিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। তবে তার এই দুর্বল যুক্তি ও সন্দেহজনক ভূমিকায় দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, দানা বাঁধছে রহস্যের।
পাশাপাশি এত বড় ঘটনার পেছনে কি সত্যিই প্রযুক্তিগত ত্রুটি, নাকি এর আড়ালে রয়েছে অন্য কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট কারসাজি—এমন প্রশ্ন তুলেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে আলাদাভাবে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করার দাবি জানান তারা।
আমার দেশ-এর অনুসন্ধানে চাহিদাপত্র বাতিল করার পেছনে দূতাবাসের এই কর্মকর্তার চালাকির স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। এই প্রতিবেদকের হাতে আসা বিভিন্ন নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা যায়, গত দুই তারিখ মঙ্গলবার রাত নয়টার দিকে এ.এস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম এজেন্সি (আরএল-১৬২৭) নামক রিক্রুটিং এজেন্সির পাঁচ হাজার চারশ কর্মী চাহিদাপত্র লেবার কাউন্সেলর কর্তৃক সত্যায়ন করে ওইপিতে পাঠানো হয়। যার মধ্যে চারশ নারী কর্মীর চাহিদা রয়েছে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এসব চাহিদাপত্র ইরাকের ‘আল ওয়াহা’ কোম্পানি থেকে বের করা হয়েছে, এর সবই পরিচ্ছন্নতা কর্মীর জন্য। প্রত্যেকের মাসিক বেতন ৪শ (ইউএসডি) ডলার বা ৭৫ হাজার টাকা প্রায়। কিন্তু চাহিদাপত্রগুলো ওইপিতে পাঠানোর পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে অদৃশ্য কারণে পাঁচ হাজার তিনশ ৯৯টি চাহিদাপত্র বাতিল করে মাত্র একটি চাহিদাপত্র রাখা হয়। সূত্রমতে, সব বাতিল করতে গেলে বিএমইটি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে চিঠির মাধ্যমে অবগত করাতে হতো। আর তা করলে এত বড় অনিয়ম সবার নজরে চলে আসবে। এজন্য ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি সংশ্লিষ্ট বিধানের ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়েছেন। বুঝাতে চেয়েছেন এটি স্রেফ ‘ভুল’।
অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যেক ডিমান্ডের জন্য পাঁচ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। অর্থাৎ ৫৪০০ চাহিদাপত্র অন্তত ২ কোটি ৭০ লাখ টাকার বিনিময়ে ওইপিতে পাঠানো হয়েছে। যদিও লেবার কাউন্সেলর আমির আব্দুল্লাহ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, সার্ভার ‘ইরর’ সমস্যার জন্য এমন ভুল হয়েছে। পরবর্তীতে তা সংশোধন করা হয়েছে। কিন্তু ৫৪শ চাহিদাপত্রের মধ্যে চারশ নারী ও পাঁচ হাজার পুরুষ শনাক্তে সার্ভার এত ‘নিখুঁত’ ভুল কিভাবে করলো? এ বিষয়ে জানতে চাইলে এর সন্তোষজনক জবাব তিনি দিতে পারেননি। তবে এ.এস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম এজেন্সি কর্তৃপক্ষ জানায়, আমির আব্দুল্লাহর সঙ্গে তাদের কোনো কথা হয়নি। তারা এসব বিষয়ে কিছুই জানে না। ইরাকস্থ তাদের আইনজীবী বিভিন্ন সময়ে এই লেবার কাউন্সেলরের সাথে যোগাযোগ করেন।
এদিকে, চাহিদাপত্র বাতিল বা সংশোধনের কারণ খুঁজতে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রের সঙ্গে কথা বললে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা জানান, ঘটনার দিন লেবার কাউন্সেলর আমির আব্দুল্লাহ যেসব চাহিদাপত্র ওইপি করেন সে সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সঙ্গে সঙ্গে জেনে যায়। কর্তৃপক্ষের কাছে প্রথমে তিনি বিষয়টি অস্বীকার করলেও পরবর্তী সময়ে তা স্বীকার করেন। যার ফলে তিনি নিজের এই অনিয়ম থেকে রক্ষা পেতে দুই ঘণ্টার মধ্যে তা বাতিল করে দেন। তারা জানান, ‘ধরা পড়ায় এবার বিষয়টি জানা গেছে; কিন্তু এর আগেও তিনি এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন কিনা তা তো কেউ জানে না। এজন্য তার আমলে যতগুলো চাহিদাপত্র ওইপি করা হয়েছে সেগুলোর খোঁজ নেওয়া হোক।’
বিভিন্ন নথিপত্রের তথ্যমতে, গত বছরের অক্টোবরের ২৮ তারিখ থেকে এ বছরের জুনের দুই তারিখ পর্যন্ত ইরাকস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে বিভিন্ন খাতে কাজের জন্য ১৫ হাজার ৩৮৭ জন কর্মীর চাহিদাপত্র সত্যায়ন করে ওইপিতে পাঠানো হয়েছে। তার মধ্যে মার্চের ৯ তারিখে এ.এস ট্রাভেলসের ২৫শ কর্মী চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে এবং এগুলোও ইরাকের ‘আল ওয়াহা’ কোম্পানি থেকে বের করা হয়েছিল।
একাধিক রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের সাথে কথা বললে তারা জানান, ইরাক শ্রমবাজারে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে চাহিদাপত্রসহ সবকিছু ঠিক থাকলেও তিনি হয়রানি করেন। এজেন্সি কর্তৃক কোম্পানির কর্মী চাহিদাপত্র বের করার আলোকে তদন্ত এবং তা সত্যায়ন করে ‘ওভারসিজ অ্যামপ্লয়মেন্ট প্ল্যাটফর্মে’ (ওইপি) পাঠাতে স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেন। তারা জানান, সবকিছু নির্ভর করে লেবার কাউন্সেলরের মর্জির ওপর। তার যদি ইচ্ছা হয় তাহলে দ্রুত ওইপিতে পাঠিয়ে দেন, আর না হলে একটার পর একটা কাগজ সংকটের অজুহাত দেখান।
তথ্যমতে, সবশেষ ২০১৮ সালের শেষের দিকে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইরাক সরকার। ফলে বৈধ পথে দেশটিতে সাত বছর জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ ছিল। এই অচলাবস্থা কাটাতে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নতুন করে বাংলাদেশ-ইরাক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সে অনুযায়ী গত বছরের সেপ্টেম্বরে দেশটিতে আবার কর্মী যাওয়া শুরু হয়।
এ.এস ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম এজেন্সির মালিক বাশার আহমদ আমার দেশকে বলেন, ‘পাঁচ হাজার চারশ চাহিদাপত্র ওইপিতে কখন এসেছে সে সম্পর্কে কিছুই আমি জানি না। এখন আপনি বলার পর চেক করে দেখি একটা চাহিদাপত্র আছে।’ তিনি বলেন, আমি লেবার কাউন্সেলরের সঙ্গে যোগাযোগ করি না। ইরাকস্থ আমার আইনজীবী এসব নিয়ে তার সঙ্গে কথাবার্তা বলেন।
তিনি বলেন, আমাদের সব কাগজপত্র ঠিক থাকলেও চাহিদাপত্র ওইপিতে পাঠানো নির্ভর করে লেবার কাউন্সেলর আমির আব্দুল্লাহর মর্জির উপর। মন ভালো হলে তা দ্রুত দিয়ে দেন। আর না হলে একটার পর একটা কাগজের কথা বলেন।
ইরাকস্থ বাংলাদেশের দূতাবাসের কাউন্সেলর (শ্রম) আমির আব্দুল্লাহ মো. মঞ্জুরুল করিম বলেন, ‘৫,৪০০ কর্মী চাহিদাপত্র ওইপি পাঠানোর ঘটনা ছিল ভুল। সার্ভার ‘ইরর’ হওয়ায় এটা হয়েছে। পরে মন্ত্রণালয় থেকে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তা সমাধান করা হয়।’ সার্ভার নারী-পুরুষ চিনে এত নিখুঁত ভুল কীভাবে করল এমন প্রশ্নে তিনি সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। এগুলোর পেছনে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকার লেনদেনের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কখনো অনিয়ম করে কিছু করিনি। কেউ যদি টাকা নিয়ে থাকে তা আমি জানি না।’
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির আমার দেশকে বলেন, এত বড় ভুল কেবল সার্ভারের উপর চাপিয়ে দিলে তো হয় না, দায়িত্বেরও একটা বিষয় আছে। এ ঘটনায় হেলা না করে যত দ্রুত সম্ভব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এতে করে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আলাদাভাবে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। আর এই কমিটি কেবল কাগজের মধ্যে থাকলে হবে না।
তিনি বলেন, আড়ালে টাকার লেনদেন হয়েছে কিনা তাও সামনে আনতে হবে। কারণ তিনি সার্ভারের ওপর দোষ চাপিয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া এই লেবার কাউন্সেলর কতদিন এখানে আছেন, এর আগে কতগুলো কাজ করছেন—সব বিষয় যাচাই করতে হবে।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর আমার দেশকে বলেন, শ্রমবাজার নিয়ে কেউ অনিয়ম করলে কোনো ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। সার্ভার এত নিখুঁতভাবে ভুল কীভাবে করল সে বিষয়ে আমরা খোঁজ-খবর নিচ্ছি। সরকার শ্রমবাজার নিয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। শ্রমবাজার সম্প্রসারণ ও অভিবাসন ব্যয় কমাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আপনি যেটা বলছেন তা খুব গুরুত্ব দিয়ে আমরা দেখব। অপরাধ প্রমাণিত হলে যে বা যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।